মহম্মদ শামি বল হাতে যে কাজটা শুরু করেছিলেন, ব্যাট হাতে তা শেষ করলেন ঋষভ পন্থ। এই দুই ক্রিকেটারের কাঁধে ভর করে চলতি আইপিএলে প্রথম জয় পেল লখনউ সুপার জায়ান্টস। আগের ম্যাচে ঘরের মাঠে দিল্লি ক্যাপিটালসের কাছে হারতে হয়েছিল সঞ্জীব গোয়েন্কার দলকে। এ বার হায়দরাবাদকে তাদের ঘরের মাঠে হারাল লখনউ।
প্রথমে ব্যাট করে ১৫৬ রানে অল আউট হয়ে যায় হায়দরাবাদ। শামি চার ওভারে মাত্র ৯ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন। লখনউয়ের জয়ের ভিত গড়ে দেন তিনি। যদিও সেই রান তাড়া করতে নেমেও একটা সময় চাপে পড়েছিল লখনউ। ঠিক সেই সময় অধিনায়কের ইনিংস খেললেন পন্থ। ৬৮ রানে অপরাজিত থেকে দলকে ৫ উইকেটে জিতিয়ে মাঠ ছাড়লেন তিনি।
টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেয় লখনউ। আগের ম্যাচে কেকেআরের বিরুদ্ধে পাওয়ার প্লে কাজে লাগিয়েছিল হায়দরাবাদ। পন্থ তা জানতেন। তাই শামির উপর দায়িত্ব দেন, হায়দরাবাদকে আটকে রাখার। নিরাশ করেননি শামি। প্রথম ওভারের শেষ বলেই অভিষেক শর্মাকে শূন্য রানে ফেরান শামি। বিশ্বকাপের পর এ বার আইপিএলেও শূন্য রানে আউট হলেন অভিষেক।
তৃতীয় ওভারে হায়দরাবাদকে দ্বিতীয় ধাক্কা দেন শামি। এ বার ৭ রানের মাথায় তাঁর শিকার হন ট্রেভিস হেড। দু’টি উইকেটের ক্ষেত্রেই বলের গতি কমিয়ে ব্যাটারদের ধোঁকা দেন শামি। অভিষেক ও হেড শট খেলতে যান। সেটা করতে গিয়ে ফাঁদে পড়েন তাঁরা।
সেই ধাক্কা সামলাতে না সামলাতে পরের ওভারে প্রিন্স যাদবের ভিতরে ঢুকে আসা বল সামলাতে না পেরে বোল্ড হন ঈশান কিশন। ১ রান করেন হায়দরাবাদের অধিনায়ক। লিয়াম লিভিংস্টোনও রান পাননি। ১৪ রান করে দিগ্বেশ রাঠীর বলে আউট হন তিনি। ২৬ রানে ৪ উইকেট হারায় হায়দরাবাদ। প্রথম ১০ ওভারে মাত্র ৩৫ রান হয়। একটি চার ও একটি ছক্কা মারতে পারে হায়দারাবাদ।
তার অন্যতম কারণ শামি। নতুন বল তাঁর কথা শুনল। তাঁর ২৪ বলের মধ্যে ১৮টি বলে রান করতে পারেনি হায়দরাবাদ। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, কতটা ভাল বল করেছেন তিনি। দেখে মনে হচ্ছিল, হায়দরাবাদ ১০০ রান করতেও সমস্যায় পড়বে। কিন্তু শামি সরতেই পাল্টা আক্রমণের পথে হাঁটেন ক্লাসেন ও নীতীশ।
কেকেআরের বিরুদ্ধেও এই দুই ব্যাটার হায়দরাবাদের ইনিংস ২২২ রানে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই ম্যাচেও ১০ ওভারের পর থেকে হাত খোলেন দুই ব্যাটার। পরের সাত ওভারে শুধু চার-ছক্কা হল। দু’জনেই হাত খুলে খেললেন। শামি বাদে লখনউয়ের চার বোলার প্রিন্স, এম সিদ্ধার্থ, দিগ্বেশ ও আবেশ খান রান দিলেন।
দুই ব্যাটারই অর্ধশতরান করেন। একটা সময় তাঁদের দেখে মনে হচ্ছিল, হায়দরাবাদের রান ১৮০ পর্যন্ত চলে যেতে পারে। ৬৩ বলে ১১৬ রানের জুটি গড়েন ক্লাসেন ও নীতীশ। সেই জুটি ভাঙেন সিদ্ধার্থ। ৩৩ বলে ৫৬ রান করে আউট হন নীতীশ। ক্লাসেন করেন ৪১ বলে ৬২ রান। সেই উইকেটের ক্ষেত্রে কৃতিত্ব প্রাপ্য পন্থের। আবেশের বলে রিভার্স স্কুপ খেলার চেষ্টা করেন ক্লাসেন। ডান দিকে ঝাঁপিয়ে এক হাতে ক্যাচ ধরেন পন্থ।
সেই জুটি ভাঙার পর আর বেশি ক্ষণ টিকতে পারেনি হায়দরাবাদ। ২০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৫৬ রানে শেষ হয় তাদের ইনিংস। শামি বাদে প্রিন্স ও আবেশ ২টি করে উইকেট নেন। ১টি করে উইকেট নেন দিগ্বেশ ও সিদ্ধার্থ।
আরও পড়ুন:
আগের ম্যাচে ওপেন করেছিলেন পন্থ। কিন্তু এই ম্যাচে মিচেল মার্শের সঙ্গে এডেন মার্করামকেই পাঠান তিনি। শুরুটা দুই ব্যাটার ভাল করেন। পাওয়ার প্লে কাজে লাগিয়ে বেশ কয়েকটি ভাল শট খেলেন। বেশি আক্রমণাত্মক দেখাচ্ছিল মার্করামকে। লখনউকে প্রথম ধাক্কা দেন ঈশান মালিঙ্গা। ১৪ রানের মাথায় মার্শকে ফেরান তিনি।
তিন নম্বরে নামেন পন্থ। শুরুতে তিনি ধরে খেললেও মার্করাম চালিয়ে খেলছিলেন। তাঁকে ফেরাতে না পারলে সমস্যায় পড়ত হায়দরাবাদ। এই ম্যাচে আবার নজর কাড়লেন শিবাঙ্গ কুমার। কেকেআরের বিরুদ্ধে ভাল বল করলেও উইকেট পাননি। এই ম্যাচে মার্করামকে ফেরান তিনি। ২৭ বলে ৪৫ রানের মাথায় আউট হন লখনউয়ের ব্যাটার।
পন্থ ও আয়ুষ বাদোনি রানের গতি বাড়াতে সমস্যায় পড়ছিলেন। একটা সময় ২০ বলে ২০ রান করে খেলছিলেন পন্থ। তার পর অবশ্য দু’টি চার মারেন তিনি। বাদোনি বড় রান করতে পারেননি। ১২ রানের মাথায় হর্ষ দুবের বলে স্টাম্প আউট হন তিনি।
আগের মরসুমে লখনউয়ের হয়ে তিন নম্বরে সফল হয়েছিলেন নিকোলাস পুরান। কিন্তু এ বার তাঁকে নীচে নামাচ্ছে লখনউ। হতে পারে, ফিনিশারের ভূমিকায় তাঁকে খেলানো হচ্ছে। লখনউয়ের সামনে লক্ষ্য খুব বেশি না থাকায় সময় নিতে পারছিলেন পন্থ ও পুরান।
কিন্তু নতুন ভূমিকায় এখনও সফল হতে পারেননি পুরান। শিবাঙ্গের বলে সুইপ মারার চেষ্টা করেন তিনি। বল ব্যাটে লাগে। কিন্তু উইকেটরক্ষক ঈশান তা ধরে ফেলেন। পুরান ভেবেছিলেন, বল বেরিয়ে গিয়েছে। তাই রান নিতে যান তিনি। মাত্র ১ রানের মাথায় রান আউট হয়ে যান পুরান।
দলকে জেতানোর দায়িত্ব এস পড়ে পন্থ ও আব্দুল সামাদের কাঁধে। কারণ, তার পরে আর ভরসা দেওয়ার মতো কেউ ছিলেন না। শেষ ৬ ওভারে জিততে দরকার ছিল ৪৯ রান। স্পিনারদের বিরুদ্ধে সমস্যা হচ্ছিল পন্থের। বেশ কয়েকটি সুযোগও দেন। কিন্তু উইকেটে পড়েছিলেন তিনি। স্পিনারদের ওভার শেষ হওয়ার অপেক্ষা করলেন। পেসারদের বিরুদ্ধে হাত খুললেন। জয়দেব উনাদকাটকে নিশানা করলেন লখনউয়ের অধিনায়ক।
পন্থের ব্যাটিং দেখে বোঝা গেল, অনেক পরিণত হয়েছেন তিনি। এখন আর রান না পেলে তাড়াহুড়ো করেন না। খারাপ বলের অপেক্ষা করেন। এই ম্যাচেও সেটাই করলেন। দৌড়ে রানের উপর নির্ভর করলেন। ধীরে ধীরে দলকে জয়ের পথে নিয়ে গেলেন। আগের পন্থ হলে হয়তো সংযম খুইয়ে আউট হতেন। কিন্তু এখন তিনি জানেন, অধিনায়ক হিসাবে তাঁর কাজ দলকে জেতানো। ঠিক সেটাই করলেন তিনি।
সামাদ ১৬ রান করে হর্ষের বলে আউট হন। তত ক্ষণে জয়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছে লখনউ। বাকি কাজ সারলেন পন্থ। শেষ ওভারে দরকার ছিল ৯ রান। উনাদকাটের প্রথম দুই বলে চার মেরে খেলার ফল নিশ্চিত করে দেন তিনি। ১ বল বাকি থাকতে ম্যাচ জিতল লখনউ। ৫০ বলে ৬৮ রান করে অপরাজিত থাকলেন পন্থ। অধিনায়কের ইনিংস মুখে হাসি ফোটাবে গোয়েন্কার।