কল্যাণীতে পড়ন্ত বিকেলে মাথা নিচু করে বাউন্ডারির সাইড দিয়ে হেঁটে আসছিলেন অভিমন্যু ঈশ্বরন। কয়েক মিনিট আগেই চোট সারিয়ে প্রত্যাবর্তনেই শতরান করেছেন তাঁর সতীর্থ সুদীপ চট্টোপাধ্যায়। ক্ষণিকের মনঃসংযোগের অভাবে নিশ্চিত শতরান মাঠেই ফেলে এসেছেন অভিমন্যু। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, “শতরানটা মাঠে ফেলে আসায় কতটা খারাপ লাগছে?” হতাশ, বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে বলে দিলেন, “সম্পূর্ণ নিজের ভুলে আউট হয়েছি। কতটা খারাপ লাগছে তা বলে বোঝাতে পারব না।”
সার্ভিসেসের নির্বিষ বোলিংয়ের সামনে বাংলা প্রথম দিনের শেষে ৮৬ ওভারে ৩৪০-৪। ক্রিজ়ে সুদীপের সঙ্গে রয়েছেন সুমন্ত গুপ্ত (৩১)। স্বভাবতই দ্বিতীয় দিনে প্রতিপক্ষের উপরে ন্যূনতম ৫০০-৫৫০ রানের বোঝা চাপিয়ে দিতে চাইবেন সুদীপরা। বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্লের কথাতেও ম্যাচের শেষে তেমনই ইঙ্গিত পাওয়া গেল। ম্যাচ শুরুর আগে সদ্য প্রয়াত অজয় বর্মার স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়।
সবুজ, সতেজ উইকেটে টস জিতে বোলিং। এর থেকে ভাল একটা দলের জন্য আর কী বা হতে পারে? কিন্তু এই সার্ভিসেস দলের পেস আক্রমণ নখদন্তহীন সাপের মতোই। ফলে আদিত্য কুমার, জয়ন্ত গোয়াত, অমরজিৎ সিংহদের দিনের প্রথম দু’ ঘণ্টা নির্বিঘ্নেই সামলে দিলেন সুদীপরা। পিচে বাউন্স থাকলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি সার্ভিসেসের পেসাররা। তার পরে তো বাংলা খেলল নিজের মেজাজে। মনে করিয়ে দেওয়া যাক, ৫ ম্যাচে ১৯ পয়েন্ট নিয়ে সার্ভিসেস রয়েছে ‘সি’ গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানে। যদিও এই দলের বোলিং দেখে এক বারের জন্যও বোঝা যায়নি। তাদের প্রধান শক্তি স্পিন। সবুজ উইকেটে প্রথম দিনে স্পিনারদের সাহায্য পাওয়ার কথা নয়। বাস্তবে হলও সেটাই। ৪ ম্যাচে ২৬ উইকেট পাওয়া অর্জুন শর্মা ২৪ ওভার বল করে ৮৫ রান দিলেও তাঁর নামের পাশে কোনও উইকেট নেই। মোহিত অহলাওয়াত আদতে উইকেটকিপার, কদাচিৎ হাত ঘোরান। প্রথম দিনের শেষে তিনি স্পিনার হিসেবে একমাত্র উইকেট পেয়েছেন।
বাংলার প্রথম উইকেট পড়ল ১৫১ রানে, তাও অভিমন্যুর দোষে। আদিত্য কুমারের বল সামনের দিকে ব্লক করেছিলেন সুদীপ। বোলার ধরতে যাওয়ার সময়ে তার হাতে লেগে সেই বল নন স্ট্রাইকিং প্রান্তের উইকেটে লাগে। বল ডেড হয়ে গিয়েছে ভেবে ততক্ষণে ক্রিজ় ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন অভিমন্যু। ফলে জোরাল আবেদন ওঠে। মাঠের আম্পায়ার সরাসরি তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে সিদ্ধান্তের জন্য পাঠিয়ে দেন। তৃতীয় আম্পায়ার আউট দেন অভিমন্যুকে। নয়টি চার ও একটি ছক্কার সাহায্যে করা ১৫২ বলে ৮১ রানের ইনিংসেওখানেই ইতি ঘটে।
অভিমন্যু হতাশ করলেও প্রত্যাবর্তন স্মরণীয় করে রাখলেন অন্য ওপেনার সুদীপ। শতরানে পৌঁছে হেলমেট খুলে দু’হাত জড়ো করে আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে উদ্যাপন করেন। চলতি মরসুমে রঞ্জিতে প্রথম ম্যাচে উত্তরাখণ্ডের বিরুদ্ধে শতরান থেকে দু’ধাপ দূরেই ফিরতে হয়েছিল। পরের ম্যাচেই গুজরাতের বিরুদ্ধে খেলার সময়ে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পান। দ্বিতীয় ইনিংসে আর নামা হয়নি। সেই চোট সারিয়ে ফিরে বৃহস্পতিবার অপরাজিত রয়েছেন ১৪০ রানে। ইনিংস সাজিয়েছেন বারোটি চার ও একটি ছক্কায়। মাঝে এক বার প্রথম স্লিপে তাঁর ক্যাচ ছাড়েনসার্ভিসেসের ফিল্ডাররা।
অথচ এই সুদীপই ২০২২ সালে বঙ্গ ক্রিকেট কর্তাদের সঙ্গে মনোমালিন্যে ত্রিপুরায় চলে যান। দু’বছর পরে বাংলায় ফিরেই (২০২৪-’২৫ মরসুম) প্রথম ম্যাচে উত্তরপ্রদেশের বিরুদ্ধে দুরন্ত শতরান উপহার দিয়েছিলেন। চলতি মরসুমে প্রত্যাবর্তনেই স্মরণীয় ইনিংস নিয়ে সুদীপ আপ্লুত কণ্ঠে বললেন, “চোট সারিয়ে ফিরে শতরান পেয়ে দারুণ লাগছে। এই শতরানের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। তবে এখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় দিনে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।” আরও বললেন, “উত্তরাখণ্ডের বিরুদ্ধে মাত্র দু’রানের জন্য শতরান হাতছাড়া হয়। এ দিনও নব্বইয়ের ঘরে থাকার সময়ে কিছুটা চাপে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছি। দলের হয়ে অবদান রাখতে পেরে খুশি।”
যে মানুষটিকে নিয়ে দর্শকদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল, যার জন্য মঞ্চ সাজানো হয়েছিল সেই অনুষ্টুপ মজুমদার ফিরলেন মাত্র ২৭ রানে। পরিবারের সকলে প্রিয় রুকুর আর একটি ভাল ইনিংসের সাক্ষী থাকার জন্য কল্যণীতে উপস্থিত ছিলেন। যদিও মোহিত অহলাওয়াতের বল তাঁর ব্যাটের কানা ছুঁয়ে চলে যায় নকুলের হাতে।অনুষ্টুপ আউট হওয়ার পরে বাংলা যখন চাপে, তখন সুদীপের সঙ্গে দলের হাল ধরেন শাহবাজ় আহমেদ। ৮৮ বলে দু’জনের জুটিতে ওঠে ৭৩ রান। পাঁচটি চারের সাহায্যে শাহবাজ় ফেরেন ৩৮ রানে।
বড় রানের দিকে এগোলেও প্রথম দিনের শেষে প্রশ্নটা কিন্তু রয়েই যাচ্ছে, নিষ্প্রভ বোলিংয়ের বিরুদ্ধেও কি রান রেট আর একটু বাড়িয়ে নেওয়া যেত না? উত্তরটা ইতিবাচক না নেতিবাচক জানা যাবে আগামী কয়েক দিনেই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলা ৩৪০-৪ (সুদীপ অপরাজিত ১৪০, অভিমন্যু ৮১, জয়ন্ত ১-৪৬) বনাম সার্ভিসেস।
শূন্যতে ফিরলেন গিল, ব্যর্থ জাডেজাও: রাজকোটে রঞ্জি ট্রফিতে পঞ্জাব বনাম সৌরাষ্ট্র ম্যাচে ব্যর্থ হলেন শুভমন গিল ও রবীন্দ্র জাডেজা। শূন্য রানে আউট শুভমন। জাডেজার করলেন ৭ রান। এ দিন প্রথম ইনিংসে ১৭২ রানে অলআউট হয় সৌরাষ্ট্র। তিন নম্বরে নেমে সর্বাধিক ৮২ রান করেন জয় গোহিল। জবাবে ১৩৯ রানে অলআউট হয় পঞ্জাব। দ্বিতীয় ইনিংসে প্রথম দিনের শেষে সৌরাষ্ট্র করেছে ৬ ওভারে ২৪-৩। তারা এগিয়ে ৫৭ রানে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)