সোমবার রাতে হায়দরাবাদের উপ্পল স্টেডিয়ামে যখন রাজস্থানের ব্যাটিং আক্রমণে গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন এক পেসার, তখন প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে নাগপুরের বাড়িতে টেলিভিশনের সামনে বসে দু’জন। এক জন অবরসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারি। অপর জন গৃহবধূ। চোখের সামনে নিজেদের সব পরিশ্রম সফল হতে দেখছিলেন তাঁরা। দেখছিলেন, কী ভাবে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন নাম হয়ে উঠেছেন তাঁদের সন্তান প্রফুল্ল হিঙ্গে।
এ বারের আইপিএল নিলামের সময় বাড়ির কাছের এক ছোট্ট মন্দিরে বসেছিলেন প্রফুল্ল। হাতে ছিল ফোন। সেখানেই নিলাম দেখছিলেন। সানরাইজ়ার্স হায়দরাবাদ তাঁকে ৩০ লক্ষ টাকায় কেনার পর মন্দিরের মেঝেতেই শুয়ে পড়েন প্রফুল্ল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেন। ফোন করেন দিদিকে। যে দিদির উদাহরণ দিয়ে তাঁকে শিক্ষকেরা বকুনি দিতেন, সেই দিদি তখন অফিস থেকে ফিরছেন। ফোন ধরতে পারেননি। তাই মেসেজ পাঠান প্রফুল্ল। কিছু ক্ষণ পরেই ভিডিয়ো কল দিদির। কাঁদছেন। ভাইয়ের সাফল্যে সামলাতে পারেননি আবেগ। ঠিক যেমনটা পারেননি তাঁর মা।
বাবা প্রকাশ হিঙ্গে একসময় পেসার ছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সরকারি চাকরি করেছেন। ছেলেকে প্রথম বার স্কুটারে চাপিয়ে মাঠে নামিয়ে দিয়েছিলেন। তার পর আর ওমুখো হননি। ছেলেকে একা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছিলেন। সেই পরীক্ষায় লেটার নম্বর পেয়ে পাশ করেছেন প্রফুল্ল।
সারারাত আলো জ্বলত হিঙ্গেদের বাড়িতে। এক ঘরে বসে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টান্ট হওয়ার প্রস্তুতি নিতেন প্রফুল্লের দিদি। অন্য ঘরে বল নিয়ে সারারাত স্বপ্ন দেখতেন প্রফুল্ল। ভোর ৪টেয় উঠে মাঠে ছুটতেন তিনি। তাঁর দিদি তখনও বই নিয়ে বসে। শিক্ষকেরা অন্যদের বলতেন, প্রফুল্লের মতো হতে যেয়ো না। তা হলে জীবন নষ্ট। পড়াশোনায় ভাল দিদির উদাহরণ দিয়ে প্রফুল্লকে বকতেন। তাতেও তাঁকে টলানো যায়নি। ভাগ্যিস যায়নি। না হলে সোমবার রাতের ওই স্পেল কী ভাবে দেখতে পেতেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।
অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটে ৩৬ উইকেট নিয়েছেন প্রফুল্ল। তার পরেই কোভিডের কারণে খেলায় বিরতি। কোভিডের পর যান চেন্নাইয়ের এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে। সেখান থেকে ব্রিসবেনে ১৫দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ সারেন। মাঝে চোটে ছ’মাস বল করতে পারেননি। কিন্তু চোট সারিয়ে আরও ভাল ভাবে ফিরে আসেন। তামিলনাড়ুর বিরুদ্ধে রঞ্জির এক ম্যাচে ৫ উইকেট নেওয়ায় তাঁকে ট্রায়ালে ডাকেন হায়দরাবাদের বোলিং কোচ বরুণ অ্যারন। সেখানেও নজর কাড়েন।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সাফল্য প্রফুল্লের সামনে আইপিএল খেলার সুযোগ করে দেয়। বিদর্ভের হয়ে রঞ্জি ট্রফিতে ১০ ম্যাচে ২৭ উইকেট নিয়েছেন ২৬.৬৭ গড়ে। ম্যাচের আগে প্রফুল্ল বলেছিলেন, ‘‘সুযোগ পেলে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। প্রথম লক্ষ্য থাকবে দলকে ম্যাচ জেতানো। ট্রফি জেতানোর চেষ্টাও করব।’’ যিনি প্রফুল্লকে আবিষ্কার করেছেন, হায়দরাবাদের সেই বোলিং কোচ অ্যারন বলেন, ‘‘প্রতিভাবান বোলার। পরিশ্রম করতে পারে। ওকে আমরা প্রথম দেখেছিলাম একটা শিবিরে। ট্রায়াল দিতে এসেই নজর কেড়েছিল। তখনও আইপিএল খেলার জায়গায় ছিল না। এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’’
অ্যারন ভুল বলেননি। প্রফুল্লের প্রস্তুতি এত দিন আইপিএলে অপরাজিত থাকা রাজস্থান রয়্যালসের ব্যাটিং লাইন আপকেই নাড়িয়ে দিল। শুধু কি তাই? প্রফুল্লের বোলিং নাড়িয়ে দিয়েছে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদেরও। দ্বিতীয়, চতুর্থ এবং ষষ্ঠ বলে উইকেট নিয়েছেন। ক্রিকেট জনতা উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে উঠেছে। ঠিক করে বসার আগেই আবার লাফাতে হয়েছে। প্রফুল্ল হায়দরাবাদ সমর্থকদের বেশ কয়েক ক্যালোরি খরচ করিয়ে দেন প্রথম ম্যাচেই। অথচ ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে অভিজ্ঞতা বলতে মাত্র এক ম্যাচের। সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফির সেই ম্যাচে অন্ধ্রপ্রদেশের বিরুদ্ধে ৪ ওভার বল করে ২৩ রান দিয়ে ১ উইকেট নিয়েছিলেন।
গত ১১ এপ্রিল পঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে অভিষেক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল প্রফুল্লের। তাঁকে ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসাবে নামানোর কথা টসের সময় জানিয়েছিলেন ঈশান কিশন। শেষ পর্যন্ত যদিও খেলা হয়নি। রাজস্থানের বিরুদ্ধে সুযোগ পেয়েই নিজেকে প্রমাণ করে দিলেন। প্রফুল্ল ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছেন ২০২৪ সাল থেকে। এর মধ্যেই বিদর্ভের হয়ে রঞ্জি ট্রফি এবং বিজয় হজারে ট্রফি জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। প্রথম থেকেই সাফল্য তাঁকে অনুসরণ করতে শুরু করেছে!
আরও পড়ুন:
স্পেলের দ্বিতীয় বলেই বৈভব সূর্যবংশীকে করেন আউট করেন প্রফুল্ল। সেটাকেই সেরা উইকেট বেছেছেন। বলেছেন, “বৈভব ছন্দে ছিল। তাই প্রথম উইকেটটাই সেরা। দু’-একজনকে বলেওছিলাম যে, প্রথম বলেই বৈভবকে বাউন্সার বা কোনও কঠিন বল করব। প্রথম বলেই ওর উইকেট নিতে চেয়েছিলাম। আমাদের বোলিং কোচ বরুণ ভাইও (অ্যারন) অনেক সাহায্য করেছেন। যাঁরাই আমার পাশে থেকেছেন তাঁদের সকলকে ধন্যবাদ।”
অতীতে চোট-আঘাতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে প্রফুল্লকে। এখন সে সব সারিয়ে সুস্থ তিনি। বলেছেন, “এখন পুরো ফিট। এমআরএফ অ্যাকাডেমিতে থাকার সময় নবীন স্যর, ফিজ়িয়ো আমার খেয়াল রেখেছিলেন। এই পর্যায়ে পৌঁছনোর পিছনে ওঁদেরও হাত রয়েছে।”
প্রফুল্লকে কী পরামর্শ দিয়েছিলেন অ্যারন। খেলা শেষে সাংবাদিক বৈঠকে এসে হায়দরাবাদের বোলিং কোচ বলেন, “ওকে বলেছিলাম, মাঠে নেমে খেলা উপভোগ করতে। না হলে আমি কিন্তু রেগে যাব। তার পর দেখলাম, ও শুধু নিজে নয়, গোটা স্টেডিয়াম ওর বোলিং উপভোগ করছে।” বৈভবকে আউট করার নেপথ্যে অ্যারনেরও মস্তিষ্ক ছিল। তিনি বলেন, “প্রফুল্ল বলছিল রাউন্ড দ্য উইকেট বল করবে। আমি বলেছিলাম, ওভার দ্য উইকেটই কর। তুই ওকে আউট করতে পারবি। তোর লেংথ বল ও সামলাতে পারবে না। সেটাই হয়েছে।”
প্রফুল্লের মায়ের ক্রিকেট সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না। শুরুতে ছেলে অনুশীলনে যাওয়ার আগে টিফিন তৈরি করে দিতেন। ঘর সামলানো ছিল তাঁর কাজ। ধীরে ধীরে ফোনে প্রফুল্লের খেলার খোঁজ নেওয়া শুরু করেন। মাকে খেলার ভিডিয়ো পাঠাতেন প্রফুল্ল। সেই ভিডিয়ো দেখেই ক্রিকেটের সঙ্গে পরিচিতি তাঁর মায়ের। সোমবার যখন ছেলে ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন নাম হয়ে উঠছে তখন টেলিভিশনের পর্দাতেই চোখ ছিল তাঁর। চোখের সামনে স্বপ্ন সত্যি হতে দেখছিলেন নাগপুরের এক গৃহবধূ।