কাঁকিনাড়া-সহ গোটা বাংলা নিয়ে কেশরীকে নালিশ বিজেপির, রাজ্যে কি এমার্জেন্সি? প্রশ্ন তৃণমূলের
১৯ মে সপ্তম দফার ভোটগ্রহণের দিনে রাজ্যের ৯টি লোকসভা কেন্দ্রের সঙ্গে ভাটপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রেও ভোট হয়।
Dilip Ghosh Derek O'Brien

দিলীপ ঘোষ ও ডেরেক ও’ব্রায়েন। —ফাইল চিত্র।

ভোট মিটলেও অশান্তি মিটছে না বাংলায়। উত্তর ২৪ পরগনার ভাটপাড়া-কাঁকিনাড়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত তো বটেই। অশান্তি বা শাসানির খবর এসেছে ওই জেলারই বসিরহাট থেকে। বিজেপি কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন কোচবিহারের সিতাই এলাকায়। রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে মঙ্গলবার গোটা পরিস্থিতি জানিয়েছে বিজেপি। কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে, অন্তত ২৭ মে পর্যন্ত বাংলায় থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনী। আর কেন্দ্রের সেই ঘোষণার তীব্র বিরোধিতা করা নির্বাচন কমিশনকে তৃণমূলের প্রশ্ন, বাংলায় কি জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে?

ভাটপাড়া-কাঁকিনাড়ায় যে অশান্তি চলছে, তা আর রাজনৈতিক অশান্তির স্তরে নেই, কাঁকিনাড়ায় এখন ‘সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ’ শুরু হয়ে গিয়েছে— মঙ্গলবার এমনই গুরুতর অভিযোগ করেছেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ। এ দিন তিনি একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সাক্ষাৎ শেষে রাজভবন থেকে বেরিয়ে এসে দিলীপ ঘোষ জানান, ভাটপাড়া-কাঁকিনাড়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে রাজ্যপালকে তাঁরা অবহিত করেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক তথা কেন্দ্রীয় সরকারকে ভাটপাড়া-কাঁকিনাড়ার তথা গোটা বাংলার পরিস্থিতি যেন রাজ্যপাল জানান এবং প্রয়োজনে উপযুক্ত পদক্ষেপ করার পরামর্শ যেন দেন— রাজ্যপালের কাছে এমনই দাবি পেশ করা হয়েছে বলে দিলীপ ঘোষ জানান।

১৯ মে সপ্তম দফার ভোটগ্রহণের দিনে রাজ্যের ৯টি লোকসভা কেন্দ্রের সঙ্গে ভাটপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রেও ভোট হয়। দিনভর বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে প্রবল উত্তেজনা ছড়ায় ভাটপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রে। ওই এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক তথা তৃণমূল ছেড়ে ব্যারাকপুর লোকসভা আসনে এ বার বিজেপির প্রার্থী হিসেবে লড়া অর্জুন সিংহের ছেলে পবন সিংহ ভাটপাড়ার বিজেপি প্রার্থী। তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা কামারহাটির প্রাক্তন বিধায়ক মদন মিত্র। ভোটগ্রহণের দিন থেকেই অর্জুন এবং মদন পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলছেন। বোমা, গুলি, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরে ভাটপাড়া-কাঁকিনাড়া যে ভাবে সন্ত্রস্ত, তার দায় পরস্পরের ঘাড়ে ঠেলছে তৃণমূল আর বিজেপি।

কৈলাস বিজয়বর্গীয়র টুইট।

আরও পড়ুন: মুখে লাল কাপড় বাঁধা, হাতে পিস্তল, এলোপাথাড়ি বোমাবাজি-গুলি কাঁকিনাড়ায়​

বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয়ও এ দিন ভাটপাড়ার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক টুইটে কৈলাসের দাবি— ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনার সুনীল চৌধুরিকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশ দিয়েছেন অর্জুন সিংহকে গ্রেফতার করতে। টুইটে কৈলাস আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ব্যারাকপুরের বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিংহের এনকাউন্টার হয়ে যেতে পারে। অর্জুন সিংহের কিছু হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দায়ী থাকবেন— এমন কথাও কৈলাস লিখেছেন নিজের টুইটে।

শুধু ভাটপাড়া-কাঁকিনাড়া নিয়ে অবশ্য নয়, রাজ্য বিজেপি এ দিন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গোটা রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে। কোচবিহারের সিতাই ব্লকে সোমবার রাতে বিজেপি কর্মীদের উপরে তৃণমূল সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ। দলের বুথ সভাপতি জয়দেব বর্মণ বেশ কিছু দিন ধরে ঘরছাড়া ছিলেন বলে বিজেপি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সোমবারই তিনি বাড়ি ফেরেন এবং সেই রাতেই তাঁর বাড়িতে হামলা হয়। দুষ্কৃতীরা তাঁকে প্রথমে গুলি করে এবং পরে সেই অবস্থাতেই তুলে নিয়ে যায় বলে বিজেপির দাবি। পরে জয়দেব বর্মণকে উদ্ধার করে কোচবিহারের হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। কিন্তু জয়দেবের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে খবর।

উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটে মির্জাপুর-হরিশপুর এলাকা থেকেও অশান্তির খবর এসেছে। ওই ওয়ার্ডটির তৃণমূল কাউন্সিলর সুরজিৎ (বাদল) মিত্রের নির্দেশে সোমবার সন্ধ্যা থেকে সমস্ত স্ট্রিট লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে বিজেপির অভিযোগ। বিজেপির বসিরহাট সাংগঠনিক জেলা কমিটির সভাপতি গণেশ ঘোষ আনন্দবাজারকে বলেন, ‘‘এই ওয়ার্ডের সিংহভাগ বাসিন্দা বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন বুঝেই তৃণমূল কাউন্সিলর অস্থির হয়ে পড়েছেন। আমি শুনেছি তাঁর নির্দেশেই সোমবার সব স্ট্রিট লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শুনেছি যে, কাউন্সিলর বলেছেন, ভোটের ফলাফল প্রকাশের পরে যদি দেখা যায় এই ওয়ার্ডে তৃণমূল হেরেছে, তা হলে জেসিবি এনে পুরসভার তৈরি করা রাস্তা খুঁড়ে দেওয়া হবে।’’

আরও পড়ুন: ইভিএম কারচুপির অভিযোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রণব মুখোপাধ্যায়​

যে কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই সুরজিৎ মিত্র অবশ্য এ সব কথা নস্যাৎ করেছেন। তিনি আনন্দবাজারকে বলেন, ‘‘হারার ভয়ে কেউ কি কখনও লাইট নিভিয়ে দেয়? হারলে তো সব জায়গাতেই হারব, শুধু এই ওয়ার্ডে তো নয়। তা হলে শুধু আমার ওয়ার্ডে আলো নিভিয়ে দিয়ে আমার কী লাভ?’’ কাউন্সিলরের দাবি, ‘‘আলো জ্বালানোর দায়িত্ব যাঁর উপরে, সোমবার তিনি কাজে আসতে পারেননি। কিছু কিছু জায়গায় ফিউজও উড়ে গিয়েছিল। তাই আলো জ্বলেনি। কিন্তু সব সমস্যা মিটে গিয়েছে।’’

রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাওয়া এই রকম নানা অশান্তির খবরই রাজ্যপালের কাছে তুলে ধরেন দিলীপ ঘোষ, জয়প্রকাশ মজুমদার, রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়রা। দিলীপ বলেন, ‘‘পুলিশ-প্রশাসনের সামনেই সব কিছু ঘটছে, কিন্তু তাঁরা আটকাচ্ছেন না। পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা এই অশান্তি আটকাতে চান না।’’ দিলীপ এ দিন আরও বলেন যে, হেরে যাবে বুঝতে পেরে তৃণমূল এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যাতে মনে হয় যে, তৃণমূল ছাড়া এ রাজ্যকে কেউ সামলাতে পারবে না। রাজ্য প্রশাসনের উপরে কোনও ভরসা নেই বলেই তাঁরা রাজ্যপালের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে দিলীপ মন্তব্য করেন। প্রয়োজন হলে ২৭ মে-র পরেও যাতে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকে, সে আর্জিও রাজ্যপালকে জানিয়ে এসেছেন দিলীপরা।

আরও পড়ুন: অরুণাচলে জঙ্গিদের হাতে খুন বিধায়ক ও তাঁর ১০ সঙ্গী​

এই কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতির বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছে তৃণমূল। মঙ্গলবার যে ২১টি দলের প্রতিনিধিরা দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন, সেই দলে তৃণমূলের তরফে সামিল ছিলেন রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন। বাংলায় কেন কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন রাখা হচ্ছে? বাংলার জন্য আলাদা বিধি কেন, বাংলায় কি বিজেপি-আরএসএস জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে? কমিশনে গিয়ে তৃণমূলের তরফে এই রকম প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে তৃণমূল সূত্রেই জানানো হয়েছে।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত