তিন মায়ের কান্না, ‘বিচার চাই’, রায়গঞ্জে মেরুকরণের ভোটে তৃণমূল কই?
সাংবাদিক পরিচয় দিতেই ঝর্না ডুকরে কেঁদে উঠে বলেন,‘‘আপনারা তো বার বার আসছেন। কিন্তু বিচার পাইলাম কই!’’
Daribhit

দাঁড়িভিটে নিজেদের দোকানে তাপস বর্মনের মা মঞ্জু বর্মন। ছবি: প্রতিবেদক

টিনে ঘেরা,উপরে জং-ধরা টিনের চাল। রাস্তা থেকে আঙুল দিয়ে ঘরটা দেখিয়ে দিয়ে আমার ক্ষুদে গাইড বৈদ্যনাথ বলল, ‘‘ওটাই রাজেশদার বাড়ি।’’

রাজেশ সরকার। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ছাত্রদের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছিল দুই ছাত্রের। তাঁদেরই একজন রাজেশ। ইসলামপুর থেকে আইটিআই পাশ করে চাকরির চেষ্টা করছিলেন তিনি। রাজেশ সেদিন ছিলেন নিজের পুরনো স্কুল, দাড়িভিট উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ছাত্র বিক্ষোভে।

বৈদ্যনাথই নিয়ে গেল ঘরের ভিতর। নিকোনো মাটির মেঝে। একটাই ঘর। সেখানেই এক পাশে পাতা তক্তপোষের উপর বসেছিলেন ঝর্না সরকার। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই ঝর্না ডুকরে কেঁদে উঠে বলেন,‘‘আপনারা তো বার বার আসছেন। কিন্তু বিচার পাইলাম কই!’’

একটু আগে একই কথা শুনে এসেছি তাপসের মা মঞ্জু বর্মণের কাছ থেকেও। দাড়িভিট স্কুলের গলির ঠিক উল্টোদিকে মধু সুইটস্। মিষ্টির দোকানের সঙ্গেই খাওয়ার হোটেল। দোকানের পিছনেই তাপসদের বাড়ি। ইসলামপুর কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র তাপস সেদিন দোকানের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মঞ্জু বলেন, ‘‘সেদিন দোকান বন্ধ ছিল। সামনে প্লাস্টারের কাজ হচ্ছিল। গন্ডগোল শুনে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিল তাপস। হঠাৎই পুলিশের গাড়ি থেকে চালানো গুলি এসে লাগে তাপসের বুকে। শুধু আমি নই। সেদিন সবাই দেখেছিল গুলি চালিয়েছিল পুলিশ।’’কথা বলতে বলতে হঠাতই উত্তেজিত স্বরে তিনি বলেন, ‘‘কানাই আর রব্বানি(বিধায়ক কানাইয়ালাল আগরওয়াল এবং মন্ত্রী গোলাম রব্বানি) এসেছিল। ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে। মেয়েকে চাকরি দিতে। বলে কি না, আরএসএস আর বিজেপি গুলি চালিয়েছে! আমরা তো ক্ষতিপূরণ চাইনি। আমরা চেয়েছি বিচার।’’

রাজেশের মায়ের মুখেও একই কথা। চোখের জল মুছতে মুছতে বলে ওঠেন,‘‘ভোট দিলাম ওরে। ছেলেটারে মাইর‌্যা ফ্যালাইলো। ক্ষতিপূরণ দিয়া কী করব? হয় বিচার দিক না হলে ছেলে ফেরত দিক।’’

দাড়িভিট হাইস্কুলে গন্ডগোলের সেই দিন। —ফাইল চিত্র 

আরও পড়ুন: ঘৃণা ভাষণ: যোগী-মায়াবতীকে নির্বাচন কমিশনের শাস্তি, নিষেধাজ্ঞা জারি প্রচারে

সেই বিচারের দাবিতেই এবার বিজেপিকেই ভোট দিতে চান দাড়িভিটের আরও এক মা সরস্বতী সরকার। দাড়িভিট স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র বিপ্লবেরও সেদিন তাপস-রাজেশের সঙ্গে গুলি লেগেছিল। বাঁ পা ফুঁড়ে বেরিয়ে যায় সেই বুলেট। এখনও ভাল করে হাঁটতে পারে না সে। মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে এল চাঁচের বেড়ার ঘর থেকে। গুলি খাওয়া পা নিয়েই এ বার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। তার কথায়,‘‘ওই দিনের পর থেকে আমাকে কেউ দেখতে আসেনি। বিদ্যার্থী পরিষদের দাদারাই আমার চিকিৎসা করিয়েছে।’’

দাড়িভিটের তিন মায়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সাধারণ মানুষ দাবি করেছিল সিবিআই তদন্তের। প্রত্যাশা ছিল একবার হলেও মুখ্যমন্ত্রী আসবেন। ঝর্নার গলায় উষ্মা, ‘‘দিদি,শুভেন্দু তো আশে পাশে সব জায়গায় এসেছে। এক বারও তো আমাদের কাছে আসেনি। আমরা তো দিদিকেই ভোট দিয়েছিলাম।’’

দাড়িভিট হাই স্কুল। ছবি: প্রতিবেদক

আরও পড়ুন: ‘যেমন ভোট পাব, তেমন কাজ’! উন্নয়নের ‘এবিসিডি’ ফর্মুলা দিয়ে বিতর্কে মেনকা

ইসলামপুরের অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা সৌরভ মজুমদারের দাবি, ‘‘দাড়িভিটের ঘটনার প্রভাব পড়বে গোটা জেলার ভোটে।’’ ইসলামপুরের বিদায়ী বিধায়ক এবং রায়গঞ্জের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী কানাইয়ালাল আগরওয়াল যদিও সেই দাবিকে মাছি তাড়ানোর ঢঙে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘‘দাড়িভিট গ্রামটুকু ছাড়া ছাত্র মৃত্যুর ঘটনা রেখাপাতও করবে না কোথাও।’’ কে ঠিক, আঁচ পেতে দাড়িভিট ছেড়ে রওনা দিলাম জেলার বাকি অংশের দিকে।

রাস্তাতেই চোখে পড়ল সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরনে একটা বন্ধ দোকানের সামনে জনা কুড়ি মানুষের সঙ্গে বসে আছেন রায়গঞ্জের বিদায়ী সাংসদ মহম্মদ সেলিম। ২০১৪ সালে ফোটো ফিনিশে কংগ্রেস প্রার্থী দীপা দাসমুন্সিকে হারিয়ে সেলিমসংসদে যান। প্রার্থীর সামনে দাঁড়ানো ভিড়ে একটু জায়গা করে নিলাম সেলিমের বক্তব্য শোনার জন্য। মিনিট দশেকের পাড়া বৈঠকে তাঁর বক্তব্য খুব পরিষ্কার—রায়গঞ্জের মানুষের কথা, সমস্যার কথা কেউ যদি সংসদে তুলে ধরেন তা তিনিই তুলে ধরেছেন এবং সুযোগ পেলে আবার সেই কাজই করবেন। ততক্ষণে স্থানীয়দের কাছ থেকে জেনে নিয়েছি, জায়গাটার নাম  করণদীঘি বিধানসভার ভবানীপুর।

বৈঠক শেষে মহম্মদ সেলিমকে প্রশ্ন করলাম,এবার আপনার লড়াই কার সঙ্গে? তাঁর জবাব, ‘‘বিজেপির সঙ্গে।’’ তৃণমূল নয়? মহম্মদ সেলিমের সোজা সাপটা জবাব, ‘‘আপনি লিখে নিন,কানাইয়ালাল নিজের বিধানসভা ক্ষেত্র ইসলামপুরেই চতুর্থ স্থানে থাকবে।’’খোস মেজাজে হাসতে হাসতে অন্য গ্রামে পাড়া বৈঠক করতে বাইকের পিছনে সওয়ার হলেন সেলিম। যাওয়ার আগে আক্ষেপের সুরে বলেন,‘‘কংগ্রেস এখানে প্রার্থী দিল বিজেপি বিরোধী ভোট কাটার জন্য। তা না হলে...” বাকিটা শোনা গেল না বাইকটা বেরিয়ে যাওয়ায়।

মাঠে আলু তুলছেন চাষিরা। ছবি: প্রতিবেদক

মনে বেশ কিছু প্রশ্ন নিয়েই হাজির হলাম গোয়ালপোখর থানার সামনে। সেখানে কথা হচ্ছিল এলাকার বাসিন্দা বিমল মূর্মূর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘‘বাকি প্রার্থীরা ভোটের প্রচার শুরু করেছেন নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে। আর মহম্মদ সেলিম গত তিন বছর ধরে প্রচার করছেন।”বিমলবাবুর কথার রেশ ধরে পাশে বসা মহম্মদ শোয়েব রেজা বলেন, ‘‘গ্রামে বিয়ের নিমন্ত্রণ থেকে শুরু করে পালা পার্বনে এলাকায় বাড়ি বাড়ি যান সেলিম।” সিপিএম প্রার্থীর জনসংযোগ যে বিজেপির বেশ মাথা ব্যথার কারণ তা বোঝা গেল হেমতাবাদের বিজেপি কর্মী মদন রায়ের কথাতেই। তাঁর অভিযোগ, ‘‘এলাকার সমস্ত সংখ্যালঘু ধর্মীয় নেতা এবং শিক্ষকদের দিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন সেলিম।’’ মদন রায়ের সঙ্গে কথা বলার আগেই কথা বলছিলাম তিলক সাঁতরা নামে গোয়াগাঁর এক কংগ্রেস কর্মীর সঙ্গে। তিনি বোঝাচ্ছিলেন, রায়গঞ্জ ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৪-র আগে পর্যন্ত টানা ছিল কংগ্রেসের দখলে। গত লোকসভাতেও দাঁত ফোটাতে পারেনি তৃণমূল। কিন্তু তিলকের কথায় আঁচ পেলাম গোটা জেলা জুড়ে প্রচ্ছন্ন একটা ধর্মীয় মেরুকরণের। সেই মেরুকরণের প্রমাণই মিলল বিজেপি কর্মী মদন রায়ের কথাতে।

বাইকে প্রচারের ফাঁকে মহম্মদ সেলিম। ছবি: প্রতিবেদক

পরিসংখ্যান বলে ২০১৪ সালে বিজেপির অভিনেতা প্রার্থী নিমু ভৌমিকই পেয়েছিলেন ২ লাখের উপর ভোট। ইসলামপুর বিধানসভায় এগিয়ে ছিলেন তিনি। তিলকের কথায় সেই মেরুকরণ আরও বেড়েছে। আর সেই মেরুকরণই যে কংগ্রেসের পথে প্রধান বাধা তা স্বীকার করছেন এলাকার কট্টর কংগ্রেস সমর্থক-কর্মীরা। রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোটের পরিমাণ প্রায় ৩৬ শতাংশ। সেই ভোট নিয়ে বিজেপি বিরোধীদের কাড়াকাড়ি যে আখেরে বিজেপির রাস্তা মসৃণ করবে তা মেনে নিচ্ছেন সবাই। প্রিয় পত্নী দীপা কতটা বিজেপি বিরোধী ভোট কংগ্রেসের ঝুলিতে ভরতে পারেন তার উপর অনেকাংশেই নির্ভর করছে সেলিমের ভবিষ্যৎ, মেনে নিচ্ছেন এলাকার বাম কর্মীরা। অন্যদিকে প্রায় ৩০ শতাংশ রাজবংশী ভোটেও যে বিজেপি থাবা বসিয়েছে তা অস্বীকার করতে পারলেন না তৃণমূলেরই এক জেলা নেতা।

 

ভোটের অঙ্ক শোনার আগে সকালেই ইসলামপুরে কানাইয়ালালের এক অনুগামী নেতার কাছে শুনেছিলাম,জেলার অনেক নেতাই নাকি খুশি হতে পারছেন না সদ্য কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়া কানহাইয়ালাল লোকসভায় প্রার্থী হওয়ায়। তৃণমূলের অন্দরে খবর,শুভেন্দু অধিকারির সুপারিশে টিকিট পেয়েছেন কানাইয়ালাল। তাই প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলার সাহস না পেলেও সবাই ভোটের ময়দানে আন্তরিক নাও হতে পারেন, আশঙ্কা কানাইয়া অনুগামীদের।

তৃণমূল নেতৃত্ব যখন দলের অন্দরের হিসেব নিকেশ নিয়ে ব্যস্ত তখন হেমতাবাদের এক স্কুল শিক্ষকের মন্তব্য, ‘‘দাদা পঞ্চায়েত ভোট পর্ব কেউ ভুলে যায়নি। মানুষ ভোট দিতে পারলে রাজনীতির অনেক অঙ্কই মিলবে না।’’

নির্বাচনী নির্ঘণ্ট

২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের ফল

  • সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছি না। রাহুল প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর দিকেই বসব।

  • author
    এইচ ডি দেবগৌড়া জেডিএস নেতা

আপনার মত