লাল-হলুদ নয়। কামারপুকুরে বোঁদের রং একেবারে সাদা। এই সাদা বোঁদেরই ভৌগলিক স্বীকৃতি (জিআই) চাইছে কামারপুকুর। এ বিষয়ে আবেদনের কথা ভাবছেন এলাকার ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের কর্তারা। 

কামারপুকুর পঞ্চায়েত প্রধান তপন মণ্ডল বলেন, “সমস্ত স্তরের দাবি অনুযায়ী সাদা বোঁদের জিআই পেতে কোথায়, কী ভাবে আবেদন করা হবে তা নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে প্রাথমিক কথা হয়ে গিয়েছে। খুব শীঘ্রই আমরা চূড়ান্ত প্রস্তাব পাঠানো ব্যবস্থা করব।”

কামারপুকুরে অনেকেই বলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ সাদা বোঁদে খেতে ভালবাসতেন। এখন যেখানে রামকৃষ্ণ মঠ, সেখানেই রামকৃষ্ণের জন্মভিটে। কথিত আছে, তাঁর বাড়ির পূর্ব দিকে ছিল সত্য ময়রার দোকান। সেখান থেকেই জিলিপি আর সাদা বোঁদে খেত ছোট্ট গদাই। 

সত্যকিঙ্কর মোদক ওরফে সত্য ময়রার উত্তরসূরি কাশীনাথ মোদক বলেন, ‘‘পূর্ব পুরুষদের কাছেই শুনেছি সেই কাহিনি। তবে জিলিপি নিয়ে ঠাকুরের কথা প্রচলিত আছে লোকমুখে। তিনি নাকি বলতেন, জিলিপির গাঁটে গাঁটে রস।’’ কিন্তু সাদা বোঁদে নিয়ে কামারপুকুরের আলাদা আবেগ। জিলিপি অন্যত্র পাওয়া গেলেও সাদা বোঁদে মেলে কেবল এখানেই। কাশীনাথই জানালেন, ১৯৪৭ সালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন কর্তৃপক্ষ ঠাকুরের জন্মভিটা অধিগ্রহণ করেন। গড়ে ওঠে তীর্থ ক্ষেত্র। আর সাদা বোঁদের খ্যাতিও ছড়িয়ে পড়ে দেশে বিদেশে, রামকৃষ্ণের ভক্তদের হাতে ধরে।

আরও পড়ুন: রংবেরঙের প্রজাপতি, মথও পাচার হয়ে যাচ্ছে সীমান্ত দিয়ে!

এখনও প্রতিবছর শীতের মরসুমে সাদা বোঁদের বিক্রি বেড়ে যায় অনেকখানি। ব্যবসায়ীরা জানালেন, নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বহু ভক্ত সমাগম হয় কামারপুকুর, জয়রামবাটীতে। তখন কামারপুকুরে ২ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ২০টি দোকানে প্রতিদিন ‘সাদা বন্দে’ বিক্রি হয় প্রায় ৮০-১০০ কুইন্টাল। তা ছাড়া, বছরের অন্য সময় সেই বিক্রি থাকে প্রতিদিন গড়ে ২০-৩০ কুইন্টাল। পাশাপাশি হুগলি এবং পাশের জেলা বর্ধমান, বাঁকুড়া, দুই মেদিনীপুর, হাওড়ায়ও এই মিষ্টির কদর রয়েছে। খানিকটা যায় রাজ্যের বিভিন্ন দোকানে। সম্প্রতি ও়ড়িশা, গুজরাত-সহ ভিন্‌ রাজ্যেও প্যাকেটজাত বোঁদে পাঠাচ্ছে এলাকার কিছু ব্যবসায়ী।

রামকৃষ্ণদেবের নামের সঙ্গে জড়িয়ে সাদা বোঁদের জিআই স্বীকৃতির দাবি নিয়ে কামারপুকুর মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী লোকত্তরানন্দ বলেছেন, “রামকৃষ্ণদেব যে সাদা বোঁদে খেতে ভালবাসতেন এ রকম কোনও নথি আমাদের নেই। বরং তিনি মুড়ি আর জিলিপি খেতেন খুব। তবে কামারপুকুরে সাদা বোঁদে যে বিশেষ তা মানতেই হয়। অনেক জায়গায় ভ্রমণ করেছি, কিন্তু কামারপুকুর ছাড়া সাদা বোঁদে জ্ঞানত কোথাও দেখিনি।”

আরও পড়ুন: হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধেই জয়ের কান্ডারি রচিত

কামারপুকুরের সাদা বোঁদে তৈরি হয় কী ভাবে?

সেখানেও রয়েছে বিশেষত্ব। এলাকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, অন্য বোঁদেতে মেশানো হয় রং। অনেকে সময়ই সে সব রঙে মিশে থাকে ক্ষতিকর পদার্থ। কিন্তু সাদা বোঁদে একেবারে নিরাপদ। কাশীনাথ মোদক জানালেন, আতপ চালের গুঁড়ো আর রমার বেসন (রম্ভা কলাইয়ের বেসন) মিশিয়ে তৈরি হয় ঘন তরল মিশ্রণ। তা ঝাঁঝরিতে ফেলে ছোট ছোট দানা করে ভেজে নেওয়া হয় ঘিয়ে। 

তার পর চিনির রসে ডুবিয়ে তুলে নিলেই তৈরি সাদা বোঁদে। ‘‘এক মাস পর্যন্ত রেখে দেওয়া যায় এই বোঁদে। তবে ঢেঁকিতে গুঁড়ো করা চাল না হলে স্বাদ হয় না,’’  জানালেন কাশীনাথ।