বাঘের ডেরায় ঢুকে বাঘ দেখার রোমাঞ্চ আলাদা। মধ্যপ্রদেশের কানহা থেকে পান্না, মহারাষ্ট্রের তাডোবার খ্যাতি বাঘের জন্যই। আছে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনও। আবার ভারতে সিংহের ডেরা বলে পরিচিত গুজরাতের গির জাতীয় উদ্যান।
তবে বাঘ-সিংহ ছাড়া যদি হাতি দেখতে হয়, তা হলে কোথায় যাবেন? কেউ মজার ছলে বলতেই পারেন চিড়িয়াখানা। তবে খাঁচাবন্দি হাতি-বাঘ দর্শন আর তাদের ডেরায় ঢুকে তাদের দেখা পাওয়ার মধ্যে বিস্তর তফাত। চিড়িয়াখানায় বন্যপ্রাণের দেখা মিললেও, সেখানে তেমন রোমাঞ্চ নেই। অরণ্যের শোভা উপভোগের পাশাপাশি মুক্ত বন্যপ্রাণীর ঝলক দেখার উত্তেজনা চিড়িয়াখানায় কোথায়!
আরও পড়ুন:
বাঘের নিরাপদ বিচরণের জন্য ভারতের নানা প্রান্তে জাতীয় উদ্যানে যেমন ব্র্যাঘ্র সংরক্ষণ ক্ষেত্র রয়েছে, তেমনই হাতির জন্যও রয়েছে সংরক্ষিত স্থান। হাতির মতো প্রাণীকে নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে আটকে রাখা যায় না। আবার হাতি খাদ্যের সন্ধানে বার বার লোকালয়ে ঢুকে পড়লেও বাড়ে বিপদ। সেই কারণে যে সব অঞ্চলে হাতির আনাগোনা বেশি, সেখানে হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ, তাদের নিরাপদ বিচরণ এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত ঠেকাতে তৈরি হয় ‘প্রজেক্ট এলিফ্যান্ট’। দেশ জুড়ে হাতির সংরক্ষিত ক্ষেত্রের মধ্যে যেমন অরণ্য আছে, তেমনই সেই তালিকায় পড়ে হাতির বেশ কয়েকটি করিডরও। তবে নিরাপদে হাতি দেখতে হলে তালিকায় রাখতে পারেন এমন কিছু জাতীয় উদ্যান, যেখানে প্রাণীটির আনাগোনা বেশি।
বন্দিপুর জাতীয় উদ্যান
বন্দিপুর বা মুদুমালাই জাতীয় উদ্যানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়েও কখনও দেখা মেলে হাতিদের। ছবি:সংগৃহীত।
নীলগিরি পাহাড়ের কোলে কর্নাটকের বন্দিপুর জাতীয় উদ্যান শুধু বাঘেদের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার হাতিদেরও বৃহত্তম বিচরণ ক্ষেত্র। নীলগিরি বায়োস্ফিয়ার রিজ়ার্ভের মধ্যে পড়ে এই উদ্যান। চামরাজনগর জেলায় এই অরণ্য। কয়েক হাজার হাতির ডেরা এখানে। শুধু বাঘ বা হাতি নয়, গউর, বাইসন, অজস্র পাখি-সহ অসংখ্য বন্যপ্রাণের ঠিকানা এই অরণ্য।
কর্নাটকে মায়সুরু-উটি রাজ্য সড়কের ধারে বন্দিপুরের অরণ্য। সেই অরণ্য শেষ হতে না হতেই একই পথে শুরু হয় তামিলনাড়ুর মুদুমালাই অভয়ারণ্য। দুই স্থানই হাতির বিচরণক্ষেত্র। অনেক সময় রাস্তা ধরে যাওয়ার পথেও হাতির দেখা পেতে পারেন। ছোট ছোট জলাশয়ে জল খেতে আসে হাতি। তবে অরণ্যের শোভা উপভোগ করতে হলে সাফারি বুক করাই ভাল।
সকাল সাড়ে ছ’টা থেকে সাফারি শুরু হয় বন্দিপুরে। দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্তও সাফারির ব্যবস্থা থাকে। অরণ্যে প্রবেশ করা মানে যে বাঘ-হাতি-বাইসনের দেখা মিলবেই, তা নয়। তবে কপাল ভাল থাকলে বন্যপ্রাণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যেতেই পারে।
মুদুমালাই জাতীয় উদ্যান
নীলগিরি এলিফ্যান্ট রিজার্ভ রয়েছে নীলগিরি বায়োস্ফিয়ারের মধ্যে। পূর্বঘাটের নীলগিরির বিস্তীর্ণ অংশকে হাতির আবাসস্থল বলে চিহ্নিত করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে। শুধু মুদুমালাই নয়, নীলগিরি উত্তর-দক্ষিণ, গুদালুর-সহ একাধিক বনবিভাগ এই ক্ষেত্রের মধ্যে পড়ে। তামিলনাড়ুর কোয়েম্বত্তুর শহরের উত্তর-পশ্চিমে এই অরণ্যের অবস্থান। কর্নাটক এবং তামিলনাড়ুর সীমানায় এই অরণ্য। শুধু হাতি নয়, মুদুমালাই অরণ্যের ভিতরে রয়েছে ব্যাঘ্র প্রকল্পও। হাতি, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিতাবাঘ, গউর-সহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এই বনভূমি। রয়েছে কয়েকশো প্রজাতির পাখিও। মুদুমালাইয়ে রয়েছে গাড়িতে জঙ্গল সাফারির ব্যবস্থা। ভিতরে রয়েছে হাতির ক্যাম্প, সেখানে বুনো নয়, কুনকি হাতির দেখা মিলবে। সকালে এবং দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত সাফারি হয়।
পেরিয়ার জাতীয় উদ্যান
পেরিয়ারের হ্রদে জল খেতে আসে হাতিরা। কপাল ভাল থাকলে সে দৃশ্যের সাক্ষী হতে পারেন আপনিও। ছবি:সংগৃহীত।
কেরলের পেরিয়ার জাতীয় উদ্যানও হতে পারে ভ্রমণের ঠিকানা। পশ্চিমঘাট পর্বত এবং অরণ্যের সৌন্দর্য উপভোগের আদর্শ স্থান উদ্যানটি। ইডুক্কি এবং পত্তনমতিট্ট জেলা জুড়ে বিস্তৃত এই অরণ্য বাঘ এবং হাতির ডেরা। কেরলে রয়েছে পেরিয়ার হাতি প্রকল্প। জাতীয় উদ্যানের কাছের শহর থেক্কাডি। পেরিয়ার হ্রদে বোটিং পরিষেবার ব্যবস্থা রয়েছে এই থেক্কাডিতেই। হাতি দেখার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে এখানে। অনেক সময় হাতি সপরিবার এই হ্রদে জল খেতে আসে। নৌকা করে ঘোরার সময় দর্শন পেতে পারেন হস্তীবাহিনীর।এ ছাড়াও অরণ্য উপভোগের একাধিক উপায় আছে। এখানে বাঁশের ভেলায় র্যাফটিং, প্রকৃতির মধ্যে গাইড নিয়ে হাঁটা, ক্যাম্পিং-এর সুযোগ রয়েছে। হাতি-বাঘ ছাড়াও অজস্র পাখি, হরিণ-সহ বেশ কিছু বন্যপ্রাণের আনাগোনা এই অরণ্যে।
কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান
হাতি দর্শনের জন্য তালিকায় রাখা যায় কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানও।
অসমের কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানও পর্যটকমহলে জনপ্রিয়। মূলত একশৃঙ্গ গন্ডারের জন্য এখানকার অরণ্যের খ্যাতি থাকলেও, এখানে রয়েছে হাতির অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রও। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, গন্ডার, বাইসন, হাতি, গউর ছাড়াও কয়েকশো প্রজাতির পাখি রয়েছে এখানে। অসমেই রয়েছে কাজিরাঙা-কারবি আংলং এলিফ্যান্ট রিজ়ার্ভ বা হস্তী প্রকল্প। কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান এবং কারবি আংলং জেলার পাহাড়ি অঞ্চল নিয়ে তা বিস্তৃত। বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রের জল ছাপিয়ে গেলে প্লাবিত হয় কাজিরাঙার বনভূমি। তখন বন্যপ্রাণেরা আংলং-এর পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে যায় বন্যা থেকে বাঁচতে। দীর্ঘ দিন ধরে এটি হাতিদের করিডর বলে পরিচিত।
কাজিরাঙা উদ্যানের সর্বত্র অবশ্য পর্যটকদের যাওয়ার অনুমতি নেই। নির্দিষ্ট পথে সাফারি করা যায়। এই অরণ্যে জিপ সাফারির সময়েও হাতির দেখা মেলে।
ময়ূর ঝর্না এবং জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান
ময়ূর ঝর্নায় কখনও সপরিবারে হাতির দলের দেখা মেলে। ছবি:সংগৃহীত।
পশ্চিমবঙ্গে হাতির অবাধ বিচরণের জন্য দু’টি এলাকা চিহ্নিত। ঝাড়গ্রাম জেলা ও ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভুম জেলার সীমানায় অবস্থিত ময়ূর ঝর্না হাতি সংরক্ষণাগার হিসাবে চিহ্নিত। এটি মূলত জঙ্গলমহল এলাকা। দলমা পাহাড় থেকে মাঝেমধ্যেই এই অঞ্চলে হাতি চলে আসে। এটি হাতিদের করিডর বলে পরিচিত। এটি যেহেতু কোনও অভয়ারণ্য বা জাতীয় উদ্যান নয়, তাই এখানে এসে হাতি দেখা কিছুটা ঝুঁকির। বিশেষত হাতির পালের সামনে পড়ে গেলে, তা বিপজ্জনক হতে পারে। তবে এই অঞ্চলে পর্যটকেরা মাঝেমধ্যে হাতির দেখা পান। জায়গাটি সুন্দর, গাড়ি করে এখানে ঘোরা যায়। তবে বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে গাইডের সঙ্গে তাঁদের পরামর্শে ঘোরাই নিরাপদ।
পশ্চিমঙ্গের আর একটি হস্তী সংরক্ষণস্থল হল পূর্ব ডুয়ার্স। এর মধ্যে মূলত দু’টি জায়গা পড়ে, বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প এবং জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান। পূর্ব ডুয়ার্সে শুধু অরণ্যেই নয়, অনেক সময় জাতীয় সড়কেও হাতি চলে আসে। বক্সার জঙ্গলে, জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে সাফারির সময় মাঝেমধ্যেই হাতির দেখা পাওয়া যায়। মূর্তি নদীতেও অনেক সময় হাতি জল খেতে আসে। রায়ডাক, সঙ্কোশ নদীর পাড় দিয়েও হাতির পাল এক অরণ্য থেকে অন্যত্র যাতায়াত করে। তবে নিরাপদে হাতি দেখার জন্য জঙ্গল সাফারিই সবচেয়ে ভাল উপায়।
হাতি দেখা যতই রোমাঞ্চকর হোক, অরণ্যের নিয়ম-নীতি সকলেরই মেনে চলা দরকার। বন্যপ্রাণীর সামনে পড়ে গেলে, নিজের নিরাপত্তার কথাটাই সর্বাগ্রে মাথায় রাখা উচিত। এ ছাড়া, হাতির সামনে গিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা বা তাদের উত্ত্যক্ত করলে তা বিপজ্জনক হতে পারে।