তিরুঅনন্তপুরম

ভারকালার পর আমরা কেরল ভ্রমণের প্রায় অন্তিম পর্যায়ের দিকে এগিয়ে চলেছি। ভারকালা থেকে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার দূরে রাজ্যের রাজধানী শহর তিরুঅনন্তপুরম। পূর্বে নাম ছিল ত্রিবান্দ্রম। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্পে সমৃদ্ধ এই শহরে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটেছে। শহরটা ঘুরে দেখতে সফরসূচিতে অন্তত দু’দিন সময় রাখুন। আরও দুটো দিন ধার্য করুন পোনমুড়ি আর কোভালামের জন্য।

সুপ্রাচীন পদ্মনাভস্বামী মন্দির দিয়েই শুরু হোক নগর দর্শন। নিয়ম অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক ভাবে পুরুষদের খালি গায়ে ধুতি ও মহিলাদের শাড়ি পরে মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে। মহিলারা অবশ্য সালোয়ার কামিজের ওপর লুঙ্গির মতো করে শাড়ি জড়িয়েও ঢুকতে পারেন। তবে পশ্চিমী পোষাক কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। ক্লকরুমে জিনিসপত্র জমা রেখে ঢুকে পড়ুন মন্দির চত্বরে। দ্রাবিড়ীয় শৈলীতে তৈরি মন্দিরের কারুকার্য দেখলে তাক লেগে যাবে। খুবই পরিচ্ছন্ন মন্দির। গর্ভগৃহে অনন্তশয্যায় শায়িত বিষ্ণুর মাথার ওপর অনন্তনাগ ফণা তুলে আছে। মন্দিরে ২৮টি পিলার আছে। যে কোনও একটিতে কান পাতুন আর পাশেরটিতে শব্দ করুন। অবিশ্বাস্য ভাবে, মৃদঙ্গের সুর শুনতে পাবেন। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে দেখে নিন সংলগ্ন সরোবর পদ্মতীর্থম।

মন্দির লাগোয়া পুথেন মালিকা প্রাসাদ। ত্রাবাঙ্কোরের রাজা স্বাথী থিরুনাল বলরাম বর্মা এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। প্রাসাদের অন্দরে সংগ্রহশালার নাম মহারাজা স্বাথী থিরুনাল প্যালেস মিউজিয়াম। প্রাসাদের কারুকার্যময় কাঠের দেওয়ালে খোদিত আছে ১২২টি ঘোড়া। তাই এ প্রাসাদ ‘হর্স ম্যানসন’ নামেও পরিচিত। সিংহাসন, আসবাবপত্র, আইভরি চেয়ার, রাজাদের পোশাক, ঝাড়বাতি, বাদ্যযন্ত্র, অমূল্য পেন্টিং দেখতে দেখতে ফিরে যাবেন অতীতের কেরলে।

পদ্মনাভস্বামী মন্দির।

আরও পড়ুন: কেরলের সাগরসৈকত, ব্যাকওয়াটার, সবুজের আল্পনা​

শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে দেখে নিন ভেলিয়ানি লেক। ওনাম উৎসবের সময় এখানে বোট রেস অনুষ্ঠিত হয়। শহরের উত্তরে মিউজিয়াম কমপ্লেক্স। সুবিশাল এই চত্বরে আছে নেপিয়ার মিউজিয়াম, কে সি এস পানিকার গ্যালারি, ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও শ্রী চিত্রা আর্ট গ্যালারি। শ্রী চিত্রা আর্ট গ্যালারিতে উনবিংশ শতকের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী রাজা রবি বর্মার অসামান্য কিছু ছবি প্রদর্শিত আছে। চিড়িয়াখানায় সাদা ময়ূর দেখতে ভুলবেন না।

হাতে সময় থাকলে দেখে নিন কেরল স্টেট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি মিউজিয়াম। দিনের শেষে চলে আসুন এয়ারপোর্টের কাছে শঙ্কুসুঘম বিচে। মনোরম সূর্যাস্তের সাক্ষী হয়ে শেষ করুন রাজধানী দর্শন।

পোনমুড়ি

তিরুঅনন্তপুরম থেকে এ বার চলুন ৬২ কিলোমিটার দূরে নিরিবিলি শৈলাবাস পোনমুড়ি। ‘পোন’ কথার অর্থ ‘সোনা’ আর ‘মুড়ি’ কথার অর্থ ‘পাহাড়’।  তিরুঅনন্তপুরম থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন সোনালি পাহাড়ের উদ্দেশে।

শহর ছেড়ে পোনমুড়ি রোড ধরে এগিয়ে চলতে চলতে পৌঁছে যাবেন ভিথুরা। পথের দূরত্ব ৩৬ কিলোমিটার। ভিথুরা থেকে ইউক্যালিপ্টাসের ছায়াঘেরা পথ গেছে ১০ কিলোমিটার দূরে পেপ্পারা ড্যাম ও ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্কচুয়ারি। গোটা অঞ্চলটাই পক্ষীপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য।

মিউজিয়াম কমপ্লেক্স।

পোনমুড়ির পথেই ‘কলার’ এক চমৎকার পিকনিক স্পট। ঘন জঙ্গলে ঘেরা ‘কলার’ নদীর মাঝে মাথা উঁচিয়ে আছে বড় বড় প্রস্তরখণ্ড। এখান থেকেই গহন বনের বুক চিরে ২ কিলোমিটার দূরে পথ গেছে মীনমুট্টি জলপ্রপাত। রোমাঞ্চকর এই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পাবেন দূর থেকে ভেসে আসা বিচিত্র সব পাখির ডাক।

২২টা মনোরম হেয়ার পিন বাঁক পেরিয়ে পৌঁছে যান পশ্চিমঘাট পাহাড়ের কোলে ১১০০ মিটার উচ্চতায় পোনমুড়ি। রবার বাগান আর মশলা বাগানকে সঙ্গে নিয়ে পথ চলা।কখনও অরণ্যের ঘনত্ব ভেদ করে সূর্যের আলোটুকুও পৌঁছয় না। প্যাঁচানো পথ ধরে উপরে উঠতে উঠতে ধরা দেবে ঢেউ খেলানো সবুজ চা বাগান। পোনমুড়ি পৌঁছে দেখে নিন পার্ক ও ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার। অল্প চড়াই ভেঙে উঠে আসুন ভিউ পয়েন্টে। সমান্তরালে দাঁড়িয়ে থাকা ঢেউখেলানো নীল পাহাড়ের সারি দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে।

হাতে সময় কম থাকলে তিরুঅনন্তপুরম থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে সারা দিন কাটিয়ে সে দিনই ফিরে আসুন। তবে নিঝুম রাতের নিস্তব্ধ পোনমুড়ি খুবই রোম্যান্টিক। তাই সোনালী পাহাড়ের সোনালী মুহূর্তগুলো আপনার স্মৃতিপটে চিরস্থায়ী করে রাখতে হলে একটা নিশিযাপন আবশ্যিক।

সূর্যাস্তের সময় কোভালাম সৈকত।

আরও পড়ুন: ঘন অরণ্য, পাহাড়, উচ্ছ্বল ঝর্না, চা বাগান বুকে অপেক্ষায় কেরল​

কোভালাম

দেশের জনপ্রিয় সৈকতাবাসের তালিকায় কোভালামের নাম প্রথম সারিতে। অর্ধচন্দ্রাকৃতি সোনালি বেলাভূমিকে ঘিরে রেখেছে সবুজ নারকেল গাছের সারি, কলা আর পেঁপে গাছ। কখনও উদ্দাম ঢেউ শিলাখণ্ডের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফোয়ারার মতো উঁচুতে উঠে যাচ্ছে, কখনও আবার শান্ত জলরাশির সাদা ফেনা ভিজিয়ে দিচ্ছে মসৃণ বালুকাতট।

কোভালাম সৈকতের তিনটি ভাগ— লাইটহাউস বিচ, হাওয়া বিচ ও সমুদ্র বিচ। দেশবিদেশের পর্যটকেরা সাধারণ ভাবে ভিড় জমান লাইটহাউস বিচেই। রৌদ্রস্নান-সমুদ্রস্নান, দু’য়েরই আনন্দ নিন লাইটহাউস বিচে। অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে আগ্রহীরা প্যারাসেলিং, বোটিং, ওয়াটার স্কি প্রভৃতিতে মেতে উঠুন। ইচ্ছা হলে আয়ুর্বেদিক স্পা করাতে পারেন। সাগরকিনারে হাঁটতে হাঁটতে অন্য দুই সৈকতে পৌঁছে যান। সেখানে আছে কাঠের নৌকার সারি আর কর্মব্যস্ত জেলেদের আনাগোনা। কোভালামের মেরিন মিউজিয়ামটাও দেখে নিতে পারেন।

সাগরের গা ঘেঁসে ছোট্ট টিলার উপর দাঁড়িয়ে আছে লাইটহাউসটি। প্রবেশের সময় বিকাল ৩টে থেকে ৫টা। এখান থেকে সৈকতের অর্ধচন্দ্রাকৃতি চেহারাটা অনেক বেশি প্রকট। ফিরোজা রঙের সুনীল সাগর আর সোনালি সমুদ্রতটের অপূর্ব কোলাজ দেখলে মনে হবে কোনও শিল্পীর যাদুতুলির ছোঁয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এই অনবদ্য ছবি। দিনের শেষ আলোয় দেখুন ঢেউয়ের ওঠানামায় দুলতে দুলতে ভেসে চলা নৌকা।

সাগরের গা ঘেঁসে লাইটহাউস।

তিরুঅনন্তপুরম থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে এই মনোরম সৈকত। সকালে বেরিয়ে সারাদিন কোভালামে কাটিয়ে ফিরে যেতে পারেন তিরুঅনন্তপুরম। তবে নীল সাগরের হাতছানিতে এক রাতের ঠিকানা হোক কোভালাম।

কেনাকাটা: তিরুঅনন্তপুরম থেকে কেরল কটনের শাড়ি ও ধুতি কিনতে পারেন। এ ছাড়া, কাঠের খেলনাও কিনতে পারেন। কোভালামে ঝিনুকের তৈরি হরেক জিনিস পাওয়া যায়।

যাত্রাপথ: ভারকালা থেকে বাসে, ট্রেনে অথবা ভাড়াগাড়িতে চলে আসুন তিরুঅনন্তপুরম। যদি তিরুঅনন্তপুরম থেকে আপনার কেরল সফর শুরু করেন, সে ক্ষেত্রে কলকাতা থেকে সরাসরি ট্রেনে আসুন তিরুঅনন্তপুরম। শালিমার থেকে ২২৬৪২ শালিমার-ত্রিবান্দ্রম সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেস (রবি, মঙ্গল) ও ১২৬৬০ গুরুদেব এক্সপ্রেস (বুধ) তিরুঅনন্তপুরম যাচ্ছে। ১২৫১৬, ১২৫০৮ গুয়াহাটি-তিরুঅনন্তপুরম এক্সপ্রেস (বৃহস্পতি, শনি) যাচ্ছে তিরুঅনন্তপুরম। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস ও ট্রেন যাচ্ছে। এ ছাড়া, কলকাতা থেকে ট্রেনে বা বিমানে চেন্নাই পৌঁছে, চেন্নাই সেন্ট্রাল বা চেন্নাই এগমোর স্টেশন থেকেও ট্রেনে যেতে পারেন তিরুঅনন্তপুরম। সরাসরি কলকাতা থেকে বিমানেও তিরুঅনন্তপুরম পৌঁছতে পারেন।

তিরুঅনন্তপুরম শহরের আশপাশ অটো বা গাড়িভাড়া করে দেখে নিন। বাসে, গাড়িতে বা অটো ভাড়া করে যেতে পারেন কোভালাম। তিরুঅনন্তপুরম থেকে সরাসরি বাস যায় পোনমুড়ি। তবে মীনমুট্টি ফলস্‌ ও পেপ্পারা ড্যাম দেখতে হলে ভাড়াগাড়িতেই এ পথে যাওয়া ভাল।

মারুতি, ইন্ডিকা প্রভৃতি ছোট গাড়ির ভাড়া ১৬০০-১৭০০, ট্যাভেরা, জাইলো গাড়ির ভাড়া ১৬০০ টাকা, ইনোভা, কোয়ালিস গাড়ির ভাড়া ১৯০০-২০০০ টাকা।

গাড়ির জন্য যোগাযোগ করতে পারেন: আর বিশ্বনাথন ৯৪৪৬১৭৬৫৮৬, ৮৯২১৩৯৩৬৫৭। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু সংস্থা আছে যারা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়।

কোভালাম সৈকত।

আরও পড়ুন: ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’ কেরল আপনাকে স্বাগত জানায়​

রাত্রিবাস

তিরুঅনন্তপুরম: কেরল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের হোটেল ম্যাসকট। যোগাযোগ: ০৪৭১-২৩১৮৯৯০, ০৪৭১-২৩১৬১০৫। ই-মেল: mascothotel@ktdc.com ভাড়া: ব্রেকফাস্ট সমেত ৪৫০০-১০০০০ টাকা, ট্যাক্স আলাদা।  

কেরল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের হোটেল চৈত্রম। যোগাযোগ: ০৪৭১-২৩৩০৯৭৭, ০৪৭১-৩০১২৭৭০। ভাড়া: ব্রেকফাস্ট সমেত ৩১০০-৪০০০ টাকা, ট্যাক্স আলাদা। ই-মেল: chaithram@ktdc.com

এ ছাড়া শহর জুড়ে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন মানের অসংখ্য বেসরকারি হোটেল, লজ। ভাড়া ৮০০-৩০০০ টাকা।

পোনমুড়ি: কেরল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের হোটেল গোল্ডেন পিক, যোগাযোগ: ০৪৭২-২৮৯০২২৫, ০৪৭২-২৮৯০১৮৬, ০৯৪০০০-০৮৬৪১। ই-মেল: goldenpeak@ktdc.com

ভাড়া: ব্রেকফাস্ট সমেত ২২০০-৫০০০ টাকা, ট্যাক্স আলাদা।

কোভালাম: কেরল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের হোটেল সমুদ্র। যোগাযোগ: ০৪৭১-২৪৮০০৮৯, ০৪৭১-২৪৮১৪১২, ই-মেল: samudra@ktdc.com

ভাড়া: পিক সিজনে ব্রেকফাস্ট সমেত ৬১০০-১২৩৫০ টাকা, ট্যাক্স আলাদা।

কেরল ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের ওয়েবসাইট: www.ktdc.com

কেটিডিসি-র সব হোটেলের ভাড়া সিজন-ভেদে ওঠানামা করে।

কলকাতায় কেরল ট্যুরিজমের ঠিকানা: সিআইটি শপিং কমপ্লেক্স, জি-১১, গড়িয়াহাট রোড (সাউথ), দক্ষিণাপণ, ঢাকুরিয়া, কলকাতা-৭০০০৬৮, ফোন: ৮২৭৪০-০৭১৯০

ছবি: লেখক