মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুষ্ঠানে সুন্দরবনের খেলোয়াড়দের বাসে করে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বুধবার বিকেল থেকে পথে নামল পুলিশ। তুলে নেওয়া হল প্রচুর বাস। আর তার জেরে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার নানা প্রান্তে সে ভাবে বাস না পেয়ে নাকাল হলেন পরীক্ষার্থী থেকে সাধারণ যাত্রীরা। বাড়তি ভাড়া গুনে ছোট গাড়ি ভাড়া করে অনেককেই পৌঁছতে হল গন্তব্যে।
মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ দিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ‘সুন্দরবন কাপ’-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয় নামখানায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় সুন্দরবনের ১৯টি থানা এলাকার ৮৭৪টি দল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিল। তার মধ্যে ৬২টি ছিল মহিলা ফুটবল দল। সুন্দরবনের বিভিন্ন থানা সূত্রে জানা গিয়েছে, জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আগেই নির্দেশ এসেছিল, বিভিন্ন দলের খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তাদের ওই অনুষ্ঠানে যথাসময়ে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করতে হবে। তাই শুরু হয় বাস তুলে নেওয়া। এ দিনই আবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের বিএ পাস ও অনার্সের পরীক্ষা ছিল। জীবনতলার বেগম রোয়েকা কলেজ, ক্যানিংয়ের ট্যাংরাখালি বঙ্কিম সর্দার কলেজ, পাঠানখালি হাজি দেশারথ কলেজ এবং ভাঙড় মহাবিদ্যালয়ে ওই পরীক্ষার ‘সিট’ পড়েছিল। কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে পরীক্ষার্থী এবং তাঁদের অভিভাবকেরা সে ভাবে বাস না পেয়ে সঙ্কটে পড়েন।
শিয়ালদহ-ঘটকপুকুর, আলিপুর-বাসন্তী, বারুইপুর-ঘটকপুকুর, সোনারপুর-ঘটকপুকুর, ক্যানিং-জামতলা, বারুইপুর-ঝড়খালি, বারুইপুর-চুনোখালি, বারুইপুর-গঁদখালি— সব রুটেই ছবিটা প্রায় একই রকম ছিল। বাস বা অন্য যাত্রিবাহী গাড়ি প্রায় নেই। যে ক’টি চলছিল, তাতে বাদুরঝোলা ভিড়। জীবনতলা কলেজে পরীক্ষা দিতে আসা চন্দনেশ্বরের নার্গিস পরভিন বলেন, ‘‘রাস্তায় বাস কম থাকার রীতিমতো সমস্যায় পড়তে হয়। কয়েক জন বন্ধু মিলে ৫০০ টাকায় অটো ভাড়া করে পরীক্ষা দিতে আসতে হল।’’ একই সুরে ক্যানিং-বারুইপুর রুটের নিত্যযাত্রী সুরজিৎ মণ্ডল বলেন, ‘‘কাজে যাব বলে ৯টার সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলাম। বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখলাম বাস খুবই কম। একটি বাস যদিও বা পেলাম, অত্যন্ত ভিড়। উঠতে পারলাম না।’’
বাস কম থাকায় যাত্রীদের সমস্যার কথা মেনে নিয়েছেন বিভিন্ন রুটের বাস-মালিকদের সংগঠনগুলিও। শিয়ালদহ-ঘটকপুকুর ২১৩ রুটের বাস-মালিকদের সংগঠনের সম্পাদক ইয়াদ আলি বলেন, ‘‘রুটে প্রায় ৪০টি বাস চলে। তার মধ্যে পুলিশ প্রায় ২৪টি বাস নেয়। ফলে, কিছুটা সমস্যা হয়েছে। একটু বেশি সময়ের ব্যবধানে বাস চালাতে হয়েছে।’’ সোনারপুর-ঘটকপুকুর এসডি-৩ রুটের বাস-মালিক সংগঠনের সভাপতি ময়না মোল্লা বলেন, ‘‘রুটে ১৫টির মতো বাস চলে। ৬টি তুলে নেওয়া হয়। ফলে, অন্য দিনের মতো ঘন ঘন বাস-পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি।’’ ক্যানিংয়ের আইএনটিটিইউসি সম্পাদক সুশীল সর্দার বলেন, ‘‘ক্যানিং-জামতলা রুটে প্রায় ১৩টি বাস চলে। তার মধ্যে অর্ধেক বাস তুলে নেওয়া হয়।’’ তবু যাত্রীদের যাতে অসুবিধা না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রেখে বাস পরিষেবা ঠিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
বাস বা যাত্রিবাহী অন্য যানবাহন কম থাকায় সাধারণ মানুষকে যে নাকাল হতে হয়েছে, সে কথা মেনে নিয়েছেন বিভিন্ন থানার পুলিশকর্মীরা। তবে, জেলা পুলিশের এক কর্তার দাবি, ‘‘থানাগুলিকে বলে ২০০ বাস নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে কারও সমস্যা হয়েছে বলে শুনিনি। কোনও অভিযোগও মেলেনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’’
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, জীবনতলা থানা ওই এলাকার ৫৬টি দলকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন রুটের ২০টি বাস তোলে। ক্যানিং থানা ৪৭টি দলকে নিয়ে যাওরা জন্য ৩২টি বাস তোলে। ছোট মোল্লাখালি কোস্টাল থানা ৭০টি দলের জন্য ভুটভুটি ও ১৫টি বাসের ব্যবস্থা করে। গোসাবা থানা ৫৯টি দলের জন্য ৯টি বাস তোলে। বাসন্তী থানা ৬০টি দলকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রায় ১৫টি বাস বিভিন্ন রুট থেকে তুলে নেয়। এমন উদাহরণ আরও রয়েছে।
এ বার ‘সুন্দরবন কাপ’-এ জেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জীবনতলার হাওড়ামারি মিলন সঙ্ঘ। মহিলা দলগুলির মধ্যে জীবনতলার কস্তুরীবা গাঁধী গার্লস হস্টেল। ক্যানিং মহকুমার একটি থানার এক পুলিশ অফিসার জানান, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে খেলোয়াড়দের নিয়ে যেতে তাঁদের হিমশিম খেতে হয়েছে। দূর থেকে নিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থা করতে হয়েছে। মহিলা খেলোয়াড়দের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে বলে তাঁর দাবি।