সব্জি, ফসল থেকে শুরু করে ছোট-বড় গাছের পাতা পুড়ে কালো হয়ে যাচ্ছে। ঝুর-ঝুর করে খসে পড়ছে পাতা। উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে এমন ঘটনায় মাথায় হাত গরিব কৃষকদের। ইতিমধ্যেই স্থানীয় পঞ্চায়েত সহ কৃষি দফতরের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় ইটভাটার ধোঁয়া থেকেই ফসলের এমন ক্ষতি হচ্ছে। দক্ষিণ শিবপুর গ্রামে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা ইটভাটা বন্ধ করে দিয়েছেন। ক্ষতিপূরণও দাবি করছেন।
গত এপ্রিল মাসেই উত্তর ২৪ পরগনার সমস্ত অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল পরিবেশ আদালত। ইটভাটার জন্য পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে জানিয়ে প্রশাসনকে দোষারোপ করতেও ছাড়েনি আদালত। কিন্তু আদালতের সেই নির্দেশ কতটা কার্যকরী হয়েছে প্রশ্ন করলে শনিবার জেলাশাসক মনমিত কৌর নন্দা বলেন, ‘‘অবৈধ ইটভাটা বন্ধের ব্যাপারে শুক্রবারেও বৈঠক হয়েছে। যে ইটভাটার বৈধ কাগজপত্র নেই, সেগুলিকে বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরপরেও ইটভাটা বন্ধ না হলে আইনত ব্যবস্থা নেব।’’
অবৈধ ইটভাটা বন্ধের পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের কাছে বৈধ ও অবৈধ ইটভাটার পরিসংখ্যান জানতে চেয়েছিল পরিবেশ আদালত। প্রশাসন সূত্রে খবর, এই জেলায় মোট ৮১২টি ইটভাটার মধ্যে ৩৮৩টি ইটভাটার বৈধ কাগজপত্র নেই। সেগুলি বন্ধেরই নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষের দাবি, এই জেলায় এত ইটভাটা রয়েছে যে, সেগুলি থেকে দূষণের জন্য এলাকায় চাষ ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গত বছরই যেমন বাদুড়িয়ার ফতুল্যপুর গ্রামে প্রচুর ফসল নষ্ট হয়ে কালো হয়ে পুড়ে যায়। সেই কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একাংশ জানান, অ্যাসিড বৃষ্টির ফলে এমন ঘটনা ঘটেছে। অন্য অংশ দাবি করে, ইটভাটায় বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে তার ধোঁয়ায় গাছের পাতা পুড়ে ঝরে পড়ছে। এই ঘটনার পর পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ঘটনাস্থলে এসে নানা পরীক্ষাও করেন। তখনই ইটভাটার দুষণের প্রসঙ্গ উঠে আসে।
তারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে এ বছরও। বাদুড়িয়া ব্লকের দক্ষিণ যদুরহাটি পঞ্চায়েতের দক্ষিণ শিবপুর গ্রামেও শুরু হয়েছে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি। শিবপুরে রাস্তার ডান দিকে গ্রাম এবং চাষের জমি উল্টো দিকেই ইটভাটা। গত শুক্রবার সকালে মাঠে ফসলে জল দিতে গিয়ে দক্ষিণ শিবপুর গ্রামের মানুষ লক্ষ করেন, পাট গাছের পাতা পুড়ে কালো হয়ে গেছে। কলা গাছ থেকে শুরু করে পটল, কচু, পুঁইশাক সব একই অবস্থা। বাড়ির সামনে পড়ে রয়েছে বাঁশ, আম, কাঁঠাল, কুল, আমড়া, কদম-সহ বিভিন্ন গাছের পোড়া পাতা। পাশের দক্ষিণ শেরপুরেও একই অবস্থা গাছগাছালির।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ২০ বিঘা জমির ফসল পুড়ে যাওয়ায় কয়েক লক্ষ টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এ দিন দুপুরে ওই গ্রামে গিয়েও দেখা গেল, রাস্তার পাশে ঝরা পাতার স্তূপ। একই অবস্থা সব্জি ফসলেরও। দক্ষিণ শিবপুর গ্রামের প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্য নুর ইসলাম মন্ডল বলেন, ‘‘ছয় বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলাম, সব পুড়ে গেছে। একই অবস্থা লক্ষাধিক টাকার কুল এবং বাঁশগাছের।’’ নুর ইসলামের দাবি, ইটভাটার ধোঁয়ার জন্য বছর দুই আগেও এমনটা হয়েছিল। সে বার ভাটা মালিকের পক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এবারে একই রকম ক্ষতির পর ভাটা বন্ধ করে দিয়েছেন কৃষকেরা। তাঁদের দাবি, এ বারে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া হলে গ্রামের মধ্যে ইটভাটা বন্ধ করতে তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
ওই গ্রামের মহাসিন মন্ডলের ৩ বিঘা জমির সব পাট পুড়ে গিয়েছে। একই অবস্থা মাসকুরা বিবির ১৮ কাঠা পাটেরও। নাসিরউদ্দিন মণ্ডল নামে এক কৃষক বলেন, ‘‘ধার-দেনা করে পাট, কচু, পুঁইশাক, কলা, পটল চাষ করেছিলাম। ইটভাঁটার ধোঁয়া খুব নিচু দিয়ে যাওয়ার সময়ে যে যে এলাকা পড়েছে, সব জায়গার ফসল ঝলসে গেছে।’’ এ ক’দিনে সব্জি ফসলের এই হাল হলে পরবর্তীকালে ফসলের কী হাল হবে, ভেবে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।
বসিরহাটের মহকুমাশাসক শেখর সেন অবশ্য বলেন, ‘‘কী কারণে গাছের পাতা ঝরে গিয়ে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’