Advertisement
E-Paper

স্বাভাবিক পেট্রাপোলের বাণিজ্য, খুশি ব্যবসায়ীরা

বছর তিনেক আগেও ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা শ্রমিক সংগঠনের ডাকা সাধারণ বন্‌ধে তো বটেই স্থানীয় নানা বিষয়কে কেন্দ্র করেও বন্ধ করে দেওয়া হতো দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর পেট্রাপোল দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পণ্য আমদানি রফতানির কাজ।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০২:১৩
পেট্রাপোল সীমান্ত থেকে পণ্য নিয়ে ও পারে চলেছে ট্রাক। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।

পেট্রাপোল সীমান্ত থেকে পণ্য নিয়ে ও পারে চলেছে ট্রাক। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।

বছর তিনেক আগেও ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা শ্রমিক সংগঠনের ডাকা সাধারণ বন্‌ধে তো বটেই স্থানীয় নানা বিষয়কে কেন্দ্র করেও বন্ধ করে দেওয়া হতো দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর পেট্রাপোল দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পণ্য আমদানি রফতানির কাজ। উত্তর ২৪ পরগনা বা বনগাঁ মহকুমায় বন্‌ধ ‘সফল’ করতে সকলেই টার্গেট ছিল পেট্রাপোলে বাণিজ্যের কাজ বন্ধ করা। ফলে ব্যবসায়ীরা একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতেন, তেমনি বন্দর সম্পর্কেও দেশের ব্যবসায়ী মহলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ত।

যে কোনও বন্‌ধের আওতা থেকে বন্দরকে মুক্ত করতে উদ্যোগী হয়েছিল শুল্ক দফতরের অনুমোদিত সংগঠন পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কাছে অনুরোধ করা হতে থাকে, তারা যেন বন্‌ধের আওতা থেকে বন্দরকে বাদ রাখেন। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও একই দাবি তোলা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দিকে শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সে ভাবে সাড়া মেলেনি। ধীরে ধীরে অবশ্য পরিস্থিতিটা বদলাতে থাকে।

গত বিধানসভা নির্বাচনের পরে পেট্রাপোল বন্দরে তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সিটু ছেড়ে বহু শ্রমিক শাসকদলের শিবিরে নাম লেখায়। শাসক দল বন্‌ধের বিরোধী। ফলে শ্রমিকদের একটা বড় অংশ বন্‌ধে সামিল হয়নি। আসলে ব্যক্তিগত ভাবে শ্রমিকেরাও চাইতেন কাজ করতে। এখন পরিস্থিতি বদলেছে অনেকটাই। ফলে শ্রমিকেরাও বন্‌ধের দিন কাজ করছেন।

বুধবার বামেদের ডাকা সাধারণ ধমর্ঘটেও কার্যত স্বাভাবিক থাকল দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর পেট্রাপোল দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রফতানির কাজ। বাণিজ্য-সংক্রান্ত অন্যান্য কাজকর্মও হয়েছে। বন্দরের পরিবেশও অন্য দিনের মতো স্বাভাবিক ছিল। দোকানপাট খোলা ছিল। যানবাহন চলাচল করেছে। পাসপোর্ট নিয়ে দু’দেশের মধ্যে সাধারণ মানুষ যাতায়াত করেছেন। মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রগুলিও খোলা ছিল। সব মিলিয়ে বুধবার এক ব্যতিক্রমি ছবি দেখা গেল পেট্রাপোল বন্দরকে ঘিরে।

বুধবার কী হবে, তা নিয়ে অবশ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশঙ্কা ছিল। মঙ্গলবারও বামেদের পক্ষ থেকে বন্দর এলাকায় মিছিল বের করা হয়েছিল। এ দিন সকাল ১১টা নাগাদ বন্দরে গিয়ে দেখা গেল সেন্ট্রাল ওয়্যার হাউস কর্পোরেশনের (বন্দরে ট্রাক রাখার জায়গা) গোডাউনের গেটগুলি খোলা। সেখান দিয়ে পণ্য-বোঝাই ট্রাক বের হচ্ছে। সীমান্ত পেরিয়ে চলে যাচ্ছে বাংলাদেশের বেনাপোল বন্দরে। বেনাপোল থেকেও পণ্য ভর্তি ট্রাক পেট্রাপোলে আসছে। শুল্ক দফতরের আধিকারিকেরাও অফিসে এসেছেন। কাজকর্ম স্বাভাবিক। বন্দর সূত্রের খবর, সকালের দিকে ওই কাজ হাত লাগাতে দেখা গিয়েছে সিটুর শ্রমিকদেরও।

কথা হচ্ছিল বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রা বিনিময় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কার্তিক ঘোষের সঙ্গে। নিজের মুদ্রা বিনিয়ম কেন্দ্রে বসে কার্তিকবাবু জানালেন, বামদের ডাকা বন্‌ধে অতীতে দেখা যেত, সকালে বন্‌ধ সমর্থকেরা ঝান্ডা নিয়ে মিছিল করছেন। মাইকে স্লোগান দিচ্ছেন। আমাদের এসে বলা হতো, দোকান বন্ধ করুন। এ বার অবশ্য বন্‌ধ সমর্থকদের এ দিন দেখা যায়নি বন্দর এলাকায়।

বন্দরে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন আরও জানালেন, বন্‌ধের দিন সকালেই বন্‌ধ সমর্থকেরা এসে ট্রাক পার্কিং গোডাইনের গেটগুলিতে ঝান্ডা লাগিয়ে বন্ধ করে করে দিতেন। ফলে পণ্যবাহী ট্রাক গোডাইন থেকে বের হতে পারত না। এ বার অবশ্য তেমন কিছু দেখা যায়নি। যা আশা জাগিয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। এক ব্যবসায়ীর কথায়, ‘‘পণ্য নিয়ে ট্রাক একদিন বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা মানে আর্থিক ক্ষতি। ডিটেনশন চার্জের পাশাপাশি কথা মতো সঠিক সময়ে বাংলাদেশে মাল পাঠাতে না পারলে বিশ্বাসভঙ্গের দায় মাথায় নিতে হতো।’’ এ দিন বাংলাদেশ থেকে পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে পেট্রাপোলে আসা বাংলাদেশিদের অভয় দিতে দেখা গেল বন্দরে বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনকে। তাঁরা বলছিলেন, ‘‘কোনও ভয় নেই, বাস-অটো-ট্রেন চলছে।’’ শুনে আশ্বস্ত হলেন বিদেশি আগন্তুকেরা।

অতীতের বন্‌ধের দিন দেখা যেত, বাংলাদেশিরা এ পাড়ে এসে বিভিন্ন বেসরকারি পরিবহণ সংস্থার অফিসে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছেন। বিকেলের দিকে তাঁদের নিয়ে বাস ক‌লকাতার দিকে রওনা হতো। যাত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়তেন। এ বার অবশ্য তাঁদের সেই দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়নি। বেসরকারি সংস্থার বাস কম চললেও চলেছে সকাল থেকেই।

অটো-ট্যাক্সি সহ অন্য যানবাহনও চলতে দেখা গিয়েছে এ দিন। বন্দরের হোটেল, দোকানপাটও খোলা ছিল। বাংলাদেশ থেকে যাত্রীদের আসা স্বাভাবিক থাকলেও এ দেশ থেকে মানুষ গিয়েছেন তুলনায় কম।

বুধবার সকালে অবশ্য পণ্য রফতানি শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়েছিল। অন্য দিন সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে কাজ শুরু হলেও এ দিন শুরু হতে সাড়ে ১০টা বেজে যায়। পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যসোসিয়েশনের সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, ‘‘তিন বছরের চেষ্টায় আজ মনে হচ্ছে বন্দরকে বন্‌ধ থেকে মুক্ত করা গেল। স্থলপথে বাংলাদেশের সঙ্গে এই বন্দর দিয়েই ভারতের সব থেকে বেশি টাকার বাণিজ্য হয়। এ দিন বন্‌ধে বন্দর স্বাভাবিক থাকায় দেশের ব্যবসায়ীদের কাছে সদর্থক বার্তা দেওয়া গেল।’’

সিটুর জেলা নেতা ধৃতিমান পাল বলেন, ‘‘আমরা জোর করে পেট্রাপোল বন্দরে বন্‌ধ সফল করতে যাইনি। আমাদের শ্রমিকদের পরবর্তী সময়ে কাজ না দেওয়ার হুমকি দেখিয়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। তবে বেলা ১১টা পর্যন্ত পণ্য রফতানির কাজ হয়নি।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy