আরজি কর আন্দোলনে তখন উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকের একটি দুপুর। সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের বহুতলে তাঁর দফতরে কার্যত গলদঘর্ম অবস্থা। কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল। কর্মীরা ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি তাঁর নির্ধারিত ঘরটিতে। কর্মীরা গরমে অতিষ্ঠ। কিন্তু তিনি ‘ঠান্ডা’। যাকে বলে ‘কুল’।
শাসক তৃণমূল তখন বেনজির নাগরিক আন্দোলনের গণস্রোতে হাবুডুবু। কিন্তু তিনি ঠান্ডা। ‘কুল’। কী বুঝছেন? সোফায় গা এলিয়ে আরও তিনি ঠান্ডা গলায় বলেছিলেন, ‘‘সিচুয়েশন থোড়া গরম হ্যায়। লেকিন ঠিক হো জায়েগা!’’ কবে? তিনি হেসেছিলেন। তার পর বলেছিলেন, ‘‘দেখতে রহিয়ে না! পেশেন্স রখনা হোগা!’’
ধৈর্য রেখেছিলেন তিনি। আরজি করের উত্তাল নাগরিক আন্দোলন স্থিমিত হয়ে গিয়েছিল। ক্রমে ক্রমে তা মিলিয়েও গিয়েছে রাজ্য এবং দেশের রাজনীতি থেকে। তৃণমূল আবার রাজনীতিতে ফিরেছে ‘স্বমহিমা’ নিয়ে।
বরফের চাঁই চাপিয়ে রাখার মতো ঠান্ডা মাথার দীর্ঘ এবং সুঠাম চেহারার সেই যুবকের নাম প্রতীক জৈন। তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের কর্ণধার। যাঁকে ঘিরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আলোড়িত রাজ্য এবং দেশেরও রাজনীতি। কয়লা কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত দিল্লির একটি পুরনো মামলায় প্রতীকের কলকাতার লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং সল্টলেকে সেক্টর ফাইভে তাঁর দফতরে হানা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) দু’টি দল। খবর পেয়ে দু’জায়গাতেই পৌঁছেছেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং।
কে এই বছর ছত্রিশের যুবক? কী ভাবে তিনি আইপ্যাকের কর্ণধার হলেন? কোন পথে তাঁর এমন উল্কাসদৃশ উত্থান? যাঁর সম্পর্কে মমতা বলেছেন, ‘‘প্রতীক আমার পার্টির ইনচার্জ।’’
আরজি কর আন্দোলন যখন তৃণমূলের অনেক রথী-মহারথীর ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছিল, তখন প্রতীক ধৈর্যের কথা বলেছিলেন। ১৩ বছর আগে আরও তরুণ এবং নবীন প্রতীক ধৈর্যের পাঠ দিয়েছিলেন খোদ নরেন্দ্র মোদীকে। তখন অবশ্য মোদী প্রধানমন্ত্রী নন। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। ২০১৪ সালে মোদীর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নির্বাচনে তাঁর পরামর্শদাতা দলের অন্যতম ‘মুখ’ ছিলেন প্রশান্ত কিশোর। আর প্রতীক? প্রশান্তের ‘ছায়াসঙ্গী’। ২০০৭ সালের একটি সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক কর্ণ থাপরের মুখে গুজরাত দাঙ্গা সংক্রান্ত ‘অপ্রিয়’ প্রশ্ন শুনে ক্রুদ্ধ এবং ক্ষুব্ধ মোদী আসন ছেড়ে সটান উঠে গিয়েছিলেন। এ কথা বলে যে, বন্ধুত্ব থাকুক। কিন্তু সাক্ষাৎকার নয়। প্রতীকের ঘনিষ্ঠেরা জানেন, গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী মোদীর সেই উঠে পড়ার ‘ক্লিপিং’ দেখিয়েই ভারতের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীকে ধৈর্যের পাঠ দেওয়ার অন্যতম পরামর্শদাতা ছিলেন এই প্রতীক। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে ২০১৩ সালে মোট ১৭ বার বিজেপির ‘প্রধানমন্ত্রী মুখ’ মোদীকে ওই অংশের ফুটেজ দেখিয়ে এবং দর্শকের মনে তাঁর সেই শরীরী ভাষার ‘নেতিবাচক প্রভাব’ বুঝিয়ে সহনশীলতার পাঠ দেওয়া হয়েছিল। যার পুরোধা ছিলেন প্রতীক।
প্রতীক নিজে অবশ্য সে কথা কখনও মুখ ফুটে বলেননি। কিন্তু আইপ্যাকের দায়িত্বভার ‘পিকে’-র হাত থেকে মসৃণ ভাবে ‘পিজে’র হাতে যাওয়ায় কারও বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, দ্বিতীয় প্রজন্মের এলেম প্রমাণিত। পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূলের নীতিনির্ধারণ, সংগঠন পরিচালনা এমনকি, সরকারি কর্মসূচির নকশা আঁকার ক্ষেত্রেও নির্ণায়ক ভূমিকা নিচ্ছেন তিনি। তৃণমূলকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের বৈতরণী পার করাতে ‘মেঘনাদ’-এর ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনিই।
ঝাড়খণ্ডের ভূমিপুত্র প্রতীক ২০০৮ সালে বম্বে আইআইটিতে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখান থেকে বি-টেক পাশ করেন। সেখানে তাঁর বিষয় ছিল মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেটিরিয়াল সায়েন্স। শিক্ষানবিশ হিসাবে প্রথম চাকরি একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে। তার পরে ডেটা বিশ্লেষক হিসাবে ২০১২ সালে কাজ শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ সংস্থা ‘ডেলয়েট’-এ। সে চাকরি ছেড়ে ‘সিটিজেন্স ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নেন্স’ নামে একটি সংস্থা তৈরি করেন প্রতীক। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ওই সংস্থাই ছিল প্রতীকের কাজের জগৎ। সেই সংস্থার হয়েই মোদীর পরামর্শদাতা টিমে ছিলেন তিনি। মোদী প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার পরে প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আইপ্যাক তৈরি করেন। সংস্থার ‘সহ-প্রতিষ্ঠাতা’ তিনি।
‘কথা কম, কাজ বেশি’ মন্ত্রে বিশ্বাসী প্রতীক গোটা দেশের রাজনীতিকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর দফতরের দেওয়ালে ঝুলছে ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্র। রাজ্য, জেলা, জনবিন্যাস তাঁর ঠোঁটস্থ। তথ্যপঞ্জি তাঁর কাছে জলভাত। সঙ্গে সারা রাজ্যের সমস্ত এলাকার খোঁজখবর। তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা বা মন্ত্রী সম্পর্কে মূল্যায়নও রয়েছে তাঁর তথ্যভান্ডারে। আশ্চর্য নয় যে তাঁর উপর যুগপৎ আস্থা রাখেন মমতা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
গত কয়েক বছরে তৃণমূলের প্রবীণ নেতাদের অনেকেই আইপ্যাকের ব্যাপারে কখনও-সখনও ‘নেতিবাচক’ মন্তব্য করেছেন। এমনকি, গত বছর মমতাও বিধানসভায় তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে বলেছিলেন, ‘‘প্যাক-ফ্যাকের কথা শুনে কেউ কাজ করবেন না!’’ কিন্তু তার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতিতে নাটকীয় বদল ঘটে। নেতাজি ইন্ডোরের একটি সভায় মমতা ‘প্যাক-ফ্যাক’ বলা সংস্থাকেই ‘আমার আইপ্যাক’ বলে সম্বোধন করেন। তার পর থেকে প্রতীককে কাজ করার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী। একাধিক বার নবান্নে গিয়ে মমতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বাধীন পরামর্শদাতা সংস্থা আরও বিস্তৃত হয়েছে। প্রচুর নিয়োগ হয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে সারা রাজ্য জুড়ে কাজ করছে আইপ্যাক। তৃণমূল এবং রাজ্য সরকারের সঙ্গে। বস্তুত, দল এবং সরকারের নৈমিত্তিক যোগাযোগের ‘সেতু’ হিসাবেই কাজ করেন প্রতীক। বিধানসভা ভোটের আগে সরকারের উন্নয়নের খতিয়ান-সহ বিভিন্ন প্রচারমূলক ছবি, চলচ্ছবি নির্মাণই হোক বা কোন কোন প্রকল্পে জোর দিতে হবে, সে বিষয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া অথবা নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে ঝাড়াইবাছাই প্রক্রিয়া— প্রতীক এবং আইপ্যাকের অস্তিত্ব, প্রভাব এবং মতামত অসীম।
ব্যক্তিগত ভাবে প্রতীক কখনও সামনে আসতে পছন্দ করেন না। বরং কৃতিত্বের জন্য এগিয়ে দেন তাঁর সহকর্মীদের। তৃণমূলের অন্দরে তাঁর ‘ঘনিষ্ঠ’ কেউ আছেন, এমন শোনা যায় না। তবে কিনা, পেশাদারদের ‘ঘনিষ্ঠ’ কেউ হয়ও না। যদিও ব্যক্তিগত ভাবে কাউকে কাউকে পছন্দ করেন প্রতীক।
যে প্রতীক সাধারণত অন্তরালে থেকে পরামর্শ দেন, তাঁর বাড়ি ও দফতরে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অভিযান এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে খবর এবং ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। একদা মোদীকে ধৈর্যের পাঠ দেওয়া প্রতীক আরজি কর আন্দোলনের সময় ধৈর্যকে শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। আন্দাজ করার পুরস্কার নেই যে, বৃহস্পতিবার দিনের শেষে তিনি কী বলছেন নিজেকে— ‘‘পেশেন্স রখনা হোগা।’’