Advertisement
E-Paper

পুজোয় স্বপ্ন হোম থেকে বাড়ি ফেরার

এ দেওয়ালে রং-পেন্সিল, ও দেওয়ালে কোণা ভাঙা ব্যাট, এক দেওয়ালে টাঙানো তারে ঝুলছে জামাকাপড়, এর এক দিকে সার দিয়ে ছোট চৌকি— অনেকটা এরকম চার দেওয়ালের মধ্যেই জীবন কাটায় খুদে ছেলেমেয়েগুলো। বাড়ি ফিরতে না পারার দুঃখ, বাবা-মায়ের খোঁজ না নেওয়ার অভিমান, বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়াও চলে ওই ঘরেই।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০১৫ ০৩:০৩

এ দেওয়ালে রং-পেন্সিল, ও দেওয়ালে কোণা ভাঙা ব্যাট, এক দেওয়ালে টাঙানো তারে ঝুলছে জামাকাপড়, এর এক দিকে সার দিয়ে ছোট চৌকি— অনেকটা এরকম চার দেওয়ালের মধ্যেই জীবন কাটায় খুদে ছেলেমেয়েগুলো। বাড়ি ফিরতে না পারার দুঃখ, বাবা-মায়ের খোঁজ না নেওয়ার অভিমান, বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়াও চলে ওই ঘরেই।

তবে এ বার পুজোয় অনেকটাই অন্য স্বাদ পাবে তারা। আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের মতো বাবা-মায়ের হাত ধরে না হলেও তাদের জন্য নতুন পোশাক পরে ঠাকুর দেখা, ভাল খাবারদাবারের আয়োজন করেছে জেলা সমাজকল্যাণ দফতর। আজ, ষষ্ঠীর সকালে গাড়ি করে শহর লাগোয়া এলাকায় ঠাকুর দেখা দিয়ে শুরু হবে সেই আনন্দ-যাত্রা। ঢলদিঘির শিশুকল্যাণ সমিতির ওই হোমের আবাসিক আবাসিক অনন্যা রায়, সোমা বিশ্বাসরা বলে, “চারিদিকে আলো, ঢাকের আওয়াজে মন খারাপ করছিল। এ বার আমরাও ঠাকুর দেখতে যাব। খুব মজা করব।’’

সাধারণত হারিয়ে যাওয়া শিশু-কিশোরীদের খুঁজে জেলার এই হোম কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয় চাইল্ড লাইন। এই মূহুর্তে হোমটিতে নাবালিক রয়েছে ২৪ জন। আর এক জনের বয়স ১৮ বছরের বেশি। চার বছর হোমে থাকার পরে দিন কয়েক আগেই এক আবাসিক ফিরে গিয়েছে তার দিদিমার কাছে। কিন্তু সবার ভাগ্য ততটা সুপ্রসন্ন নয় বলেই মনে করেন সমাজকল্যাণ দফতরের কর্তারা। তাঁরা জানান, হোমের বেশ কয়েকজন আবাসিকদের বাড়ির হদিস পেয়ে যোগাযোগ করা হয়ছিল, কিন্তু শিশুদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে অভিভাবকেরা তেমন উৎসাহী নন। সমাজকল্যাণ দফতরের শিশুসুরক্ষা আধিকারিক সুদেষ্ণা মুখোপাধ্যায় বলেন, “অভিভাবকরা হৈ হৈ করে আমাদের কাছে এসে হারিয়ে যাওয়া শিশু বা কিশোরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এমনটা ঘটেনি। আমরাই অভিভাবকদের হদিস পেয়ে যোগাযোগ করি, কিন্তু অনেক সময়েই তাঁরা উৎসাহ দেখান না। ভাবতে পারেন, এই উৎসবের সময়েও অভিভাবকরা ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে থাকে।”

কিন্তু অভিভাবকেরা মুখ ফেরালেও পুজোর ক’দিন খুদেদের আনন্দে, যত্নে কাটানোর ব্যবস্থা করে ফেলেছেন সমাজকল্যাণ দফতরের কর্মী-আধিকারিকেরা বর্ধমান জেলার এক আধিকারিক বলেন, “হোমের আবাসিকেরা যাতে পুজোর সময় আনন্দে থাকতে পারে, তার জন্য ঠাকুর দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দু’রকম পোশাক দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত বিশেষ খাবারের বন্দোবস্তো করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

কী কী থাকছে মেনুতে? জানা গিয়েছে, রবিবার পঞ্চমীর দিন দুপুরে মুরগীর মাংস পড়েছিল পাতে। আজ, সোমবার বেলা ১১টা দেখে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরার সময় ফাস্ট ফুড খাওয়ানো হবে তাদের। এ ছাড়াও থাকছে, ফ্রায়েড রাইস, পোলাও, মাছ, মাংস, পায়েস। হোম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, আজ, ষষ্ঠীর দিন সকাল ১১টা নাগাদ তিনটে ছোট গাড়ি করে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরানো হবে খুদেদের। সঙ্গে শিশুকল্যাণ কমিটির দু’জন কর্মী ও চার জন মহিলা পুলিশও থাকবেন। পরিক্রমা শুরু হবে বুড়ির বাগান থেকে। তারপরে বাদামতলা হয়ে জিটি রোড ধরে গোলাপবাগ, আলমগঞ্জ, নীলপুর, উল্লাস মোড় পর্যন্ত ঘোরানো হবে। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মনোবিদ সুব্রত সেন বলেন, ‘‘ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে থেকে ওই শিশুকন্যারা যে কল্পনায় ভেসে বেড়াত, মণ্ডপ দেখতে বেড়িয়ে বাস্তব জগৎটা ধরতে পারবে তারা। চারপাশের ভালোলাগা দেখে তাদের বাড়ি ফিরতে মন চাইবে।” হোমের আবাসিক শিপ্রা দত্ত, রিয়া দলুইরাও বলে ওঠে, “চুল বেঁধে, নতুন জামা পরে ঠাকুর দেখব। প্যান্ডেলে যাব। নতুন জামা পড়লে কেউ আমাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাবে না।”

আর ঠাকুরের কাছে কী চাইবে?

চিৎকার করে তারা বলে উঠল, “বাড়ি ফিরতে চাই। বাবা-মায়ের জন্য মন খারাপ করে। ওরা যেন আমাদের নিয়ে যায়, সেটাই চাইব।”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy