গ্রাম সুনসান। রাস্তায় লোক নেই। কড়া নাড়লেও কেউ দরজা খুলছেন না। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলছেন, ‘‘ভোট দিতে গেলে খুন হয়ে যাব।’’
তবু বুধবার ভোট হল বাসন্তীর ফুলমালঞ্চ পঞ্চায়েতের নির্দেশখালি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে। প্রিসাইডিং অফিসার ছিলেন। পোলিং অফিসার ছিলেন। নিরাপত্তায় ছিলেন সিভিক ভলান্টিয়ার। কিন্তু বেলা সাড়ে ১১টায় দেখা গেল, বুথে কোনও ভোটার নেই। অথচ, ভোট হচ্ছে! ভিতর থেকে আওয়াজ আসছিল, ‘২১, ৪৬, ৬০...’। শোনা যাচ্ছিল ব্যালটে ছাপ মারার শব্দও!
বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল, প্রিসাইডিং অফিসার মোবাইলের টর্চ জ্বলে বসে রয়েছেন। কত শতাংশ ভোট পড়েছে, এই প্রশ্নে হোঁচট খেয়ে তাঁর দাবি, ‘‘এখনও পর্যন্ত ৩০০-র বেশি ভোট হয়ে গিয়েছে।’’ কিন্তু ভোটার কোথায়? আমতা আমতা করে তাঁর উত্তর, ‘‘আসছে তো।’’
ঘরের একটি বেঞ্চে তিন-চার জন যুবক বসে। এক জন শুয়ে। কানে মোবাইল। ঘরের এক পাশে তিনটি ব্যালট বাক্স। ব্যালট ছিঁড়ে নেওয়ার সময় ক্রমিকসংখ্যা চিৎকার করে বলা হচ্ছে। পোলিং অফিসার মোবাইলের টর্চের আলোয় ক্রমিকসংখ্যা লিখে নিচ্ছেন। এক জন করে যুবক ব্যালট-পেপার নিয়ে পাশের ঘরে চলে যাচ্ছেন। ওই ঘরেও মোবাইলের টর্চ জ্বেলে বসে রয়েছে কয়েক জন। তাঁরা ব্যালটে ছাপ মেরে দিচ্ছেন। তার পরে সেই ব্যালট ফেলা হচ্ছে বাক্সে। গোটা কাজে যুক্ত জনাদশেক যুবক।
কারা ওই যুবক? প্রশ্নটা করার আগেই সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক জনের প্রশ্ন ধেয়ে এল, ‘‘আপনি কে? কোথা থেকে আসছেন?’’ নিজেকে আড়াল করতে এই প্রতিবেদকের জবাব, ‘‘না। সেক্টর অফিস থেকে এসেছি। হচ্ছেটা কী?’’ দমল না পাজামা-পাঞ্জাবি। তার সটান উত্তর, ‘‘স্যার, গোলমাল এড়াতে সকলের ভোট আমরাই দিয়ে দিচ্ছি। ভোটররা এলে এতক্ষণে অন্তত ১০টা লাশ পড়ে যেত। সেটা ঠিক নয়। একটু চা খাবেন?’’
চায়ের ডাক প্রত্যাখ্যান করে বেরিয়ে আসার সময়েও পিছনে পাজামা-পাঞ্জাবি, ‘‘স্যার, আলিপুরে যাচ্ছেন তো? ডিএম সাহেবকে কিছু বলবেন না।’’ তার পরে হঠাৎ ছাতা খুলে প্রতিবেদকের মাথায় ধরে পাজামা-পাঞ্জাবি এ বার আরও গদগদ, ‘‘স্যার, ছোট ভাইকে দেখবেন কিন্তু।’’