Advertisement
E-Paper

‘অর্ডারই নেই, প্রতিরোধ করব কী করে’

সকালে ঘুম থেকে উঠে সাত তাড়াতাড়ি বাজারে গিয়েছিলেন। কিনে এনেছিলেন আলু, ফুলকপি, টম্যাটো আর মাছ। স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘জমিয়ে রাঁধো। ফিরে এসে সবাই একসঙ্গে খাবো।’ তার পর ছোট ছোট দুই মেয়ের গাল টিপে আদর করে ছুট দিয়েছিলেন কাজের জায়গায়।

অর্ঘ্য ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০১৬ ০২:৩৯
অসহায় পুলিশ। ছবি: অনির্বাণ সেন

অসহায় পুলিশ। ছবি: অনির্বাণ সেন

সকালে ঘুম থেকে উঠে সাত তাড়াতাড়ি বাজারে গিয়েছিলেন। কিনে এনেছিলেন আলু, ফুলকপি, টম্যাটো আর মাছ। স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘জমিয়ে রাঁধো। ফিরে এসে সবাই একসঙ্গে খাবো।’ তার পর ছোট ছোট দুই মেয়ের গাল টিপে আদর করে ছুট দিয়েছিলেন কাজের জায়গায়। কিন্তু, বাড়ি ফিরে স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে একসঙ্গে আর খেতে বসা হল না সাজু শেখের। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ির অদূরেই বালিবোঝাই ডাম্পার পিষে মারল ওই যুবককে।

পেশায় রাজমিস্ত্রি সাজু লাগোয়া তুড়িগ্রামে একটি বাড়ি তৈরির কাজ করছিলেন। দুপুরের খাওয়ার খেতে সেই বাড়ির মালিকের থেকে মোটরবাইক নিয়ে বাড়ি ফিরছেন বলে দুর্ঘটনার কিছু ক্ষণ আগেও স্ত্রীকে ফোনে জানিয়েছিলেন সাজু। বাড়ির খুব কাছে চলেও এসেছিলেন। শুক্রবার ময়ূরেশ্বরে দুর্ঘটনাটি যেখানে ঘটে, সেখান থেকে তাঁর বাড়ির দূরত্ব মেরে কেটে ৫০০ মিটার। এ দিন ঘটনার পরে সাজুর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, তাঁর স্ত্রী সারফা বিবি শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। মায়ের কোলে চুপ করে বসে ছিল চার বছরের সাইনা ও তিন বছরের সুফিয়া। ঘটনার গুরুত্ব ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারেনি দুই শিশু। মাকে কাঁদতে দেখে বারবার মুখ টেনে অবাক হয়ে দেখছিল।

স্ত্রী এবং দুই মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকতেন সাজু। তাঁর একার আয়েই সংসার চলত। এখন দুই মেয়েকে নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন, ভেবে কুল পাচ্ছেন না সারফা। ময়ূরেশ্বর গ্রামেই তাঁর বাপের বাড়ি। কিন্তু, অবস্থা স্বচ্ছল নয়। সারফা এ দিন কোনও মতে বলেন, ‘‘সাড়ে ১০টা নাগাদ ফোন করে বলেছিল বাড়ির মালিকের মোটরবাইক নিয়ে ফিরছে। রান্না করে বসেছিলাম। হঠাৎ খবর এল। গিয়ে দেখি সব শেষ!’’ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাজুর পরিবারের লোকজন দেখতে পান তাঁর থেঁতলানো দেহ পড়ে রয়েছে। মোটরবাইকটিও বেপাত্তা। অসহায় স্ত্রীর ভাবনা, ‘‘এখন মালিক মোটরবাইক ফেরত চাইলে কী করব জানি না। কী ভাবে নিজেদের চলবে, তা-ও জানি না।’’

রোশের আগুন

(১) তখনও দাউদাউ জ্বলছে পুলিশের ভ্যান। (২) পুড়িয়ে ক্যানালে ফেলে দেওয়া হয়েছে অন্য ভ্যানটি।
(৩) সমস্ত কাচ ভাঙা পড়েছে ময়ূরেশ্বর থানায়। ছবি: অনির্বাণ সেন

ছেলের শোকে ভেঙে পড়েছিলেন সাজুর মা মহুবা বিবি এবং বাবা চানাই শেখও। বিড়বিড় করে শুধু বললেন, ‘‘আমরা নিজেরাই ছেলেদের বাড়িতে পালা করে খাই। এখন দুই মেয়েকে নিয়ে বউটা কী করে চালাবে আল্লাই জানেন!’’ অবশ্য এ দিন পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সাজুর দাদা কাজেম শেখ এবং ভাই নাজেম শেখ। তাঁদের দাবি, তাড়াতাড়ি দেহ উদ্ধার এবং চালককে ধরার জন্য তাঁরা পুলিশকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু, তাতে কান না দিয়ে পুলিশ উল্টে তাঁদেরই লাঠিপেটা করে। এমনকী, ঘটনা ধামাচাপা দিতে পুলিশ ডাম্পারের চালককে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছে বলেও তাঁদের অভিযোগ। পুলিশের জন্যই ভাইকে অকালে হারাতে হল বলে দাবি নাজেমদের। তাঁদের ক্ষোভ, ‘‘ওভারলোড ট্রাক থেকে তোলার জন্য থানার গেটের সামনে মুখিয়ে থাকে পুলিশ। ওরাই ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী।’’

ঘটনা হল, এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরেই গোটা গ্রামে চিরুনি তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। তত ক্ষণে গ্রাম কার্যত পুরুষশূন্য। তবু সামনে যাকে পেয়েছে, পুলিশ তাকেই নির্বিচারে লাঠিপেটা করছে বলে অভিযোগ। এমনকী, পুলিশের আক্রোশ থেকে রেহাই পাননি প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ জাহিরুল শেখও। আতঙ্কিত এক মহিলা বলেন, ‘‘পুলিশের তোলাবাজির জন্যই এক গরিব রাজমিস্ত্রিকে প্রাণ দিতে হল। এলাকার মানুষ তো খেপবেই! পুলিশ এখন নিজেদের আক্রোশ মেটাতে হাতের সামনে যাকে পারছে ধরে পেটাচ্ছে। ভাঙচুর চালাচ্ছে বাড়িতে।’’

মৃতের পরিবারের মতো পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছে অন্য গ্রামবাসীরাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জন গ্রামবাসী এ দিন জানালেন, ময়ূরেশ্বর থানার দু’পাশে দু’টি হাট রয়েছে। তা ছাড়াও বিভিন্ন অফিস কাছারি থাকার সূত্রে ওই এলাকাটি জমজমাট। রাস্তায় সব সময় ভিড় থাকে। তাঁদের অভিযোগ, এমনিতেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তার উপর তোলা এড়িয়ে বেপোরোয়া ভাবে গাড়ি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন কিছু চালক। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই এলাকা দিয়ে প্রতি দিন প্রাণ হাতে নিয়ে তাঁদের চলাফেরা করতে হয়।

এ দিন সাড়ে ১২টা নাগাদ গিয়ে দেখা গেল ক্যানাল সেতুর অদূরে তখনও ডাম্পারের পিছনের চাকায় চাপা পড়ে রয়েছে সাজুর থেঁতলে যাওয়া দেহ। কাছেই পড়ে থাকা পুলিশের জিপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। লাগোয়া সেচখালে পড়ে থাকা গাড়িটিরও একই দশা। থানা চত্বরে গিয়ে দেখা গেল বিরাট পুলিশ বাহিনী ঘিরে রেখেছে এলাকা। ওসির অফিসঘরের জানালার কাঁচ, চেয়ার টেবিল ভেঙেচুরে পড়ে রয়েছে। লন্ডভন্ড কাগজপত্র। থানা চত্বরে পড়ে থাকা বিভিন্ন জিনিসপত্র পুড়ে ছাই। তখনও ধোঁয়া উড়ছে। থানায় পৌঁছে থরথর করে কাঁপছিলেন পুড়ে যাওয়া দু’টি গাড়ির এক চালক। তিনি বলেন, ‘‘উন্মত্ত জনতা গাড়ি ঘিরে ফেলে পুলিশ কর্মীদের মারধর শুরু করে। মাঠের দিকে ছুট লাগিয়ে কোনও রকমে প্রাণ বাঁচিয়েছি।’’ কাঁদো কাঁদো হয়ে ব্যারাকের এক পুলিশ কর্মী আবার বললেন, ‘‘ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। রে রে করে উন্মত্ত জনতা ঢুকে পড়ল। কোনও রকমে ছুটে পালাই। জোর বেঁচে গিয়েছি। এখনও বুকের ভিতরটা কাঁপছে!’’

জনতাকে কেউ আটকানোর চেষ্টাও করলেন না? ওই পুলিশকর্মীর আক্ষেপ, ‘‘উপরতলার অর্ডারই নেই, প্রতিরোধ করব কী করে!’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy