এই কাহিনি লড়াইয়ের। লড়াই স্বপ্নপূরণের জন্য।
এক দিকে পরিবারের তরফে বিয়ের চাপ আর অন্য দিকে চাকরির স্বপ্ন বছর একুশের এক মূক-বধির তরুণীর। এই পরিস্থিতিতে পরিবারের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে নিজের বিয়ে রুখলেন পুরুলিয়ার বাগমুণ্ডির সাবিত্রী কুমার নামে সেই তরুণী। ‘ঘরবন্দি’ অবস্থা থেকে মুক্তি শেষে তাঁর আশ্রয় এখন উলুবেড়িয়ার আশা ভবন সেন্টারে।
আশা ভবন সেন্টার সূত্রে জানা গিয়েছে, দশ বছর বয়সে সাবিত্রী পড়াশোনা শেখা ও স্পিচ থেরাপির মাধ্যমে কথা বলার জন্য এখানে ভর্তি হয়েছিল। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পাশের পর একুশ বছরের সাবিত্রীকে কলকাতার একটি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছিল প্রশিক্ষণের জন্য। সেখানে হাউজ় কিপিংয়ের কাজে শিখেছিলেন। এরপরে নানা কাজের সুযোগও আসছিল।
ইতিমধ্যে পুজোর ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলেন সাবিত্রী। সেই সময়ে তাঁর সঙ্গে ঝাড়খণ্ডের এক যুবকের বিয়ে ঠিক করে পরিবার। বিয়ের দিনও ঠিক করা হয়। সাবিত্রী জানান, তিনি বিয়ে করতে চাননি। তাঁর অভিযোগ, এরপরেই তাঁকে বিয়ে দেওয়ার জন্যে জোর করা ও ঘরে আটকে রাখা হয়। অনন্যোপায় হয়ে সাবিত্রী ফোনে যোগাযোগ করেন আশা ভবন সেন্টারের ডিরেক্টর জন মেরি বারুই-এর সঙ্গে। ভিডিয়ো কলে প্রতিষ্ঠানের বিশেষ শিক্ষিকা বাসন্তী কুমারকে সমস্যার কথাজানান সাবিত্রী।
বিষয়টি জানাতে পেরে হোমের তরফে যোগাযোগ করা হয় জেলার বিভিন্ন দফতরে। কিন্তু সাবিত্রী যেহেতু প্রাপ্তবয়স্ক তাই আইনি বাধায় আটকে যায় তাঁর উদ্ধার-কাজ। কিন্তু হোম কর্তৃপক্ষও হাল ছাড়েননি। যোগাযোগ করা হয় হাওড়া গ্রামীণের ডিএসপি ত্রিগুণা রায়ের সাথে। এর পরই শুরু হয় ওই তরুণীকে গৃহবন্দি থেকে মুক্তি করার প্রক্রিয়া। ওই পুলিশ আধিকারিকের কথায়, ‘‘কর্মসূত্রে কিছু বছর পুরুলিয়ায় কাটিয়েছি। সেই সূত্রে পুরুলিয়া সদর প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। রবিবার সকালে তরুণীর বাবাই তাঁকে আশা ভবন সেন্টারে পৌঁছে দিয়েছেন।’’
সাবিত্রীর বাবা, পেশায় দিনমজুর চিত্তরঞ্জন কুমার বলেন, ‘‘মেয়েকে স্বাভাবিক জীবন দিতে আমিই এখানে ভর্তি করিয়েছিলাম। ও চাকরির চেষ্টা করছে, তাতে আমাদের কোনও বাধাও নেই। বিয়েতে ও খানিকটা রাজি ছিল বলেই কথা এগিয়েছিলাম। ও বিয়ে করতে না চাইলে জোর নেই। তবে ওকে আটকে রাখা হয়নি।’’
এ দিন হোমে ফিরে হাসি ফিরেছে সাবিত্রীর মুখে। তিনি আকার-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন খুশির কথা। আর স্বনির্ভর হতে লড়াই করতে চান, সেটাও জানিয়েছেন।
আর হোমের ডিরেক্টর জন মেরি বারুই বলেন, ‘‘প্রতিবাদ মানুষের মনেই থাকে। ভাষা সেখানে বাধা হতে পারে না। শিক্ষার শেষে সমস্ত তরুণীদের আমরা স্বনির্ভর করার জন্য চেষ্টা করি। সাবিত্রীও সেই দলে রয়েছেন। যতদিন না উনি স্বনির্ভর হবেন, হোম তাঁর পাশে থাকবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)