সাইবার প্রতারণায় গত এক বছরে শুধু কলকাতা থেকেই খোয়া গিয়েছে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা!গোটা রাজ্যের নিরিখে খোয়া যাওয়া টাকার অঙ্ক এক হাজার কোটিরও বেশি। নতুন বছরের শুরুতে ফেলে আসা বছরের অপরাধ সংক্রান্ত পুলিশি পর্যালোচনায় এমনই তথ্য উঠে আসছে। জানা যাচ্ছে, এর মধ্যে ডিজিটাল গ্রেফতারিরশিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি টাকা খোয়ানোর ঘটনা ঘটেছে। এর পরেই রয়েছে বিনিয়োগ করতে গিয়ে এবং ছাড়ে খাবার বা সামগ্রী কেনার নামে প্রতারকের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে টাকা খোয়ানো।
লালবাজারের অবশ্য দাবি, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সাইবার প্রতারণার অভিযোগ কমেছে।বেড়েছে খোয়া যাওয়া টাকা উদ্ধারের পরিমাণ। পুলিশের দাবি, এর নেপথ্যে রয়েছে পৃথক ‘রিকভারি সেল’ তৈরি এবং ব্যাঙ্ক ও বিভিন্ন ‘পেমেন্ট গেটওয়ে’ সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর কৌশল। যদিও সাইবার গবেষক থেকে আইনজীবীদেরএকাংশের দাবি, অনেকেই এখন ‘ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল’ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ১৯৩০ নম্বরে ফোন করে সাইবার প্রতারণার অভিযোগদায়ের করছেন। এই পথে অভিযোগ করলেই সেটি ‘জেনারেল ডায়েরি’হিসাবে গণ্য হয়। ফলে থানা স্তরে কম অভিযোগ জমা পড়ছে। যদিও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রেই অভিযোগ করতে গিয়েনাজেহাল হতে হয়। টোল ফ্রি নম্বরে ফোন করলে কখনও ১ টিপুন, কখনও ২ টিপুন বলে ঘোরানোহয়। বিশেষত, প্রবীণদের ক্ষেত্রে এই পথে অভিযোগ করা যথেষ্টকষ্টসাধ্য।
পুলিশকর্তাদের যদিও দাবি, প্রতারকদের ধরার মতো সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে খোয়াযাওয়া টাকা উদ্ধারের বিষয়টিও। সেই কারণেই সার্বিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক দিন আগেই ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরোর (এনসিআরবি) সর্বশেষ প্রকাশিত (২০২৩ সালের) রিপোর্ট এবং আরও কিছুতথ্য সামনে রেখে পুলিশের উচ্চ স্তরে বৈঠক হয়েছে। সূত্রের দাবি, সেখানে দেখা গিয়েছে, ২০২৪ সালে প্রতি মাসে কলকাতায় ১০ থেকে২২ কোটি টাকার সাইবার প্রতারণা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট আরও দেখিয়েছে, গোটা দেশের মধ্যে কলকাতাতেই সবচেয়েবেশি, প্রায় এক কোটি টাকা খোয়া যাওয়ার মতো প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। ওই বছরে ৩৯১টি এমন অভিযোগ দায়ের হয়েছিল।আবার, ১৭৩টি অভিযোগের প্রতিটিতে ১০ কোটি টাকার উপরে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে।
এর পরেই প্রতারকদের ধরার পাশাপাশি খোয়া যাওয়া টাকার অন্তত ৫০ শতাংশ অবশ্যইউদ্ধার করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়। সেই সঙ্গেই লালবাজারে সাইবার থানায় তৈরি হয় পৃথক ‘মানি রিকভারি সেকশন’। এক পুলিশকর্তার মন্তব্য, ‘‘এখন দেখা যাচ্ছে২০২৫ সালে খোয়া যাওয়া টাকার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ উদ্ধার করা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ১০ শতাংশের আশপাশে।’’
তবে, নতুন বছরে নাগরিকদেরও আরও সতর্ক হতে বলছে পুলিশ। তারা জানাচ্ছে, ডিজিটালগ্রেফতারি বলে কিছু হয় না। পুলিশের পরামর্শ, কোনও অপরিচিতের কথা মতো কাজ করা চলবে না। ফোন বা ল্যাপটপ থেকে অজানা লিঙ্কে ক্লিক করার আগে ভাবতে হবে। বাড়তি আয় বা লাভের কথা বলাহলে টাকার অঙ্কটা বাস্তবসম্মত কিনা, ভেবে দেখতে হবে।এর সঙ্গেই কেন্দ্রীয় সরকারের পোর্টালে গিয়ে আধার কার্ড এবং আঙুলের ছাপ মাস্ক (প্রযুক্তির সাহায্যে গোপন করা)করাতে বলা হচ্ছে। ‘ট্যাফকপ’ নামের ওয়েবসাইটে গিয়ে অজানা কোনও ফোন নম্বর সংশ্লিষ্টগ্রাহকের নথি দিয়ে চালু করা আছে কিনা, দেখে নিতে বলা হচ্ছে তা-ও।এর পরেও প্রতারণার কবলে পড়লে যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগ জানাতে বলা হচ্ছে।
সাইবার গবেষকেরা যদিও বলছেন, ‘‘বহু ক্ষেত্রে পুলিশও ব্যাঙ্ক গড়িমসি করে। দ্রুত আদালতে আর্জি জানিয়ে নির্দেশ বার করতে হবে। সেই নির্দেশ দেখালে পুলিশ পদক্ষেপ করতে বাধ্য।’’কিন্তু কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে কি সব সময়ে এত দ্রুত আদালতের নির্দেশ বার করাসম্ভব? এই প্রশ্নের অবশ্য স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)