রাস্তার ধারে বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল সাদা রঙের খালি গাড়িটি। ভিন্ রাজ্যের নম্বর প্লেট, ভিতর থেকে উঁকি মারছে দু’টি স্যুটকেস। কিন্তু কার গাড়ি, হদিস নেই।
দিন কয়েক আগে এ শহরেই ঘটেছে রেড রোড-কাণ্ড, প্রজাতন্ত্র দিবস ঘিরে নাশকতার আশঙ্কাও জারি হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। বৃহস্পতিবার সকালে কুঁদঘাটে নেতাজি মেট্রো স্টেশন লাগোয়া চণ্ডী ঘোষ রোডে তাঁর দোকানের সামনে প্রায় ঘণ্টাখানেক গাড়িটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাই আর সময় নষ্ট করেননি স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রশান্তকুমার গঙ্গোপাধ্যায়।। বেশ খানিকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও গাড়ির মালিকের সন্ধান না পেয়ে সোজা ফোন করেন ১০০ ডায়ালে। লালবাজার থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় রিজেন্ট পার্ক থানা ও রিজেন্ট পার্ক ট্রাফিক গার্ডের পুলিশ। ততক্ষণে এলাকায় ছড়িয়ে গিয়েছে বোমাতঙ্ক। বম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড, ডগ স্কোয়াডের তত্পরতায় কড়া সতর্কতার চাদরে মুড়ে ফেলা হয় নেতাজি মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন এলাকা। বন্ধ করে দেওয়া হয় এলাকার রাস্তাঘাট, দোকানপাট। খালি করে দেওয়া হয় আশপাশের কয়েকটি বাড়িও। তবে দু’ঘণ্টা তল্লাশিতে দাবিদারহীন গাড়িটি এবং তার ভিতরে থাকা দু’টি স্যুটকেস পরীক্ষা করে বোমা পাননি বম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াডের অফিসারেরা। অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের নম্বর প্লেট লাগানো গাড়িটি থেকে মেলে শুধু স্যুটকেস ভরা পোশাক ও কিছু সব্জি।
পুলিশ সূত্রের খবর, তল্লাশি চলাকালীনই খবর পেয়ে ফিরে আসেন গাড়ির মালিক অসীমকুমার ঘোষ। মেট্রো স্টেশনের সামনে রিকশা থেকে নামলে তাঁর থেকেই গাড়ির চাবি পান পুলিশ অফিসারেরা। পঁচাত্তর বছরের ওই বৃদ্ধকেও নিয়ে যাওয়া হয় রিজেন্ট পার্ক থানায়। পরে অবশ্য তাঁর কাছ থেকে সন্দেহজনক কিছু না মেলায় বেআইনি পার্কিংয়ের মামলা দায়ের করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ দিন বিকেলে অবসরপ্রাপ্ত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার অসীমবাবু জানান, গত ২ জানুয়ারি তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে বিশাখাপত্তনম থেকে কলকাতায় এসেছেন। রয়েছেন দেশপ্রিয় পার্কের কাছে একটি হোটেলে। কর্মসূত্রে সাতের দশকে শহর ছেড়ে বিশাখাপত্তনমে চলে গিয়েছিলেন। মাঝেমধ্যে কলকাতায় এলেও কখনওই কুঁদঘাটের পূর্ব পুটিয়ারীতে নিজের পুরনো পাড়ায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁর। এ বার শহরে ফিরে তাই পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতেই কুঁদঘাটে এসেছিলেন তিনি। চণ্ডী ঘোষ রোডে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ১০০ টাকায় রিকশা ভাড়া করে স্মৃতির পথ ধরে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন তিনি। আর তখনই বিপত্তি। পুলিশকে এমনটাই জানিয়েছেন বৃদ্ধ।
এত কিছুর পরেও অসীমবাবু অখুশি নন। বোমাতঙ্ক, ভোগান্তি যাবতীয় কিছু পেরিয়ে বরং বহু বছর আগে ফেলে যাওয়া কলকাতাকে দিয়ে ফেলেছেন ‘ভারতের এক নম্বর মহানগরী’র সার্টিফিকেট। আর বলেছেন, ‘‘আবার আসব কলকাতায়। তবে আর গাড়ি নিয়ে নয়।’’
কিন্তু পোশাক ভর্তি স্যুটকেস সঙ্গে নিয়ে ঘুরছিলেন কেন? অসীমবাবুর দাবি, ১৩ বছর আগে স্ত্রীকে হারিয়েছেন তিনি। তাঁর জামাকাপড় কাউকে দান করবেন ভেবেই সঙ্গে নিয়ে ঘুরছিলেন।