তিনি কলকাতা পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তা। তিনি ‘প্রভাবশালী’ অফিসারও বটে। কিন্তু রবিবার থেকে তিনি উধাও! তাঁর পুত্র বলছেন, বাবা বাড়িতে। কিন্তু বাবার খোঁজে যাওয়া কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অফিসারেরা বলছেন, তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তার পর থেকে তাঁকে আর কোথাও দেখা যায়নি।
কোথায় গেলেন কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিংহ বিশ্বাস?
শান্তনুর বাড়িতে রবিবার ভোরে হানা দিয়েছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তার পর দিন সোমবার শান্তনুকে তলব করা হয়েছে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির দফতরে। কিন্তু সোমবার দুপুর পর্যন্ত ইডির দফতরে হাজিরা দেননি ওই পুলিশকর্তা। সকাল থেকে তাঁর দেখাও মেলেনি। রবিবার ইডির তল্লাশির সময় কি বাড়িতে ছিলেন তিনি? না কি ছিলেন না? পরস্পরবিরোধী দাবিতে তা নিয়েও ধোঁয়াশা ক্রমশ বাড়ছে।
রবিবার তল্লাশি চলাকালীন পুলিশকর্তার পুত্র দাবি করেন, শান্তনু বাড়িতেই ছিলেন। তাঁকে ইডি-র অফিসারেরা জেরাও করেছেন। কিন্তু তদন্তকারী সংস্থা ইডি সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, অভিযানের সময়ে শান্তনু তাঁর বাড়িতে ছিলেন না। ইডি অবশ্য ওই দাবি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও বিবৃতি দেয়নি। তবে পরস্পরবিরোধী দাবি নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে বিভিন্ন মহলে।
রবিবার ইডির হানা চলাকালীন শান্তনুর বাড়িতে সামনে পৌঁছে যান প্রসেনজিৎ নাগ নামে এক আইনজীবী। তিনি নিজেকে ‘শান্তনুর আইনজীবী’ বলে পরিচয় দেন। প্রসেনজিৎ পুলিশকর্তার বাড়িতে ঢুকতে চাইছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁকে সেই অনুমতি দেয়নি। ওই আইনজীবী জানিয়েছিলেন, ডিসি শান্তনুর সঙ্গে তাঁর কোনও যোগাযোগ হয়নি। যদিও পরে শান্তনুর পুত্র সায়ন্তন সিংহ বিশ্বাস দাবি করেন, তাঁর বাবা বাড়িতেই ছিলেন। শান্তনুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নে ঘাড় নেড়ে ইতিবাচক ইশারা করেন তিনি।
রবিবার তল্লাশি চলাকালীনই দুপুরের দিকে সায়ন্তনকে নিয়ে বালিগঞ্জের বাড়ি থেকে পার্ক স্ট্রিটের এক ঠিকানায় পৌঁছোন ইডির আধিকারিকেরা। সেখানে তিনি প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “জাস্ট নর্মাল একটা এনকোয়ারি। বাবাও বাড়িতে ছিল। আমিও বাড়িতে ছিলাম। সকলে এসেছে। নর্মাল কিছু কাগজ চেক করবে।” অর্থাৎ, সাধারণ একটা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সাধারণ কিছু নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, তাঁর বাবা বাড়িতেই রয়েছেন। যদিও ইডি সূত্রে বারবার দাবি করা হয়েছে, শান্তনু তল্লাশির সময় বাড়িতে ছিলেন না। তিনি কোথায় ছিলেন, তা নিয়েও কোনও সদুত্তর মেলেনি। তল্লাশি চলাকালীন শান্তনুকে দেখা যায়নি। তার পরেও তাঁকে কোথাও দেখা যায়নি।
আরও পড়ুন:
রবিবার ভোর থেকে ইডির অভিযান শুরু হয়েছিল। রাত ২টো নাগাদ পুলিশকর্তার বাড়ি থেকে বেরোন ইডির আধিকারিকেরা। ওই দীর্ঘ পর্বে শান্তনুকে কখনওই প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। কিন্তু এরই মধ্যে সোমবার সকালে জানা যায়, দুই পুত্র সায়ন্তন এবং মণীশ-সহ শান্তনুকে তলব করেছে ইডি। তাঁদের ডেকে পাঠানো হয়েছে সিজিও কমপ্লেক্সে। ইডির এক সূত্রের বক্তব্য, রবিবারের অভিযানের সময়ে শান্তনু বালিগঞ্জের ওই বাড়িতে ছিলেন না। সেই কারণেই তাঁকে জেরার করার জন্য সিজিও কমপ্লেক্সে ডেকে পাঠানো হয়েছে। সঙ্গে ডাকা হয়েছে তাঁর দুই পুত্রকেও। সোমবার দুপুর পর্যন্ত শান্তনু সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির দফতরে যাননি বলেই খবর। ফলে তিনি কোথায়, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গিয়েছে। শান্তনু অতীতে কালীঘাট থানার ওসি ছিলেন। ইডির একটি সূত্রে খবর, দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা সোনা পাপ্পু এবং বেহালার প্রোমোটার জয় কামদারের সঙ্গে কালীঘাট থানার প্রাক্তন ওসি শান্তনুর ‘যোগসূত্র’ থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। সোনা পাপ্পু এখনও অধরা। তবে জয়কে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে ইডি। সূত্রের দাবি, শান্তনুর দুই পুত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের সঙ্গেও জয়ের পরিচয় রয়েছে। ধৃত প্রোমোটারের সঙ্গে পুলিশ আধিকারিক বা তাঁর দুই পুত্রের কোনও আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, তা-ই তদন্ত করে দেখতে চান ইডি আধিকারিকেরা। সে জন্যই তলব করা হয়েছে পিতার সঙ্গে পুত্রদের। শান্তনু বা তাঁর দুই পুত্র সায়ন্তন-মণীশ সেই তলবে সাড়া দেবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তার চেয়েও অস্পষ্ট শান্তনুর আচমকা উধাও হয়ে যাওয়া।