রেড রোডে বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় বায়ুসেনা কর্পোরালের মৃত্যুর এক মাস পেরিয়ে গেল। মূল অভিযুক্ত সাম্বিয়া ধরা পড়লেও তার বাবা মহম্মদ সোহরাব এখনও পুলিশের নাগালের বাইরে। তবে লালবাজারের অনুমান, বাড়তি চাপ এড়াতে আগামী ক’দিনের মধ্যে তিনি আত্মসমর্পণ করতে পারেন। বস্তুত মধ্য কলকাতার ওই প্রতিপত্তিশালী ব্যবসায়ীর তরফে চলতি সপ্তাহেই কলকাতা হাইকোর্টের কিছু আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে পুলিশ-সূত্রের খবর।
গত ১৩ জানুয়ারি সকালে রেড রোডে প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজের মহড়া চলাকালীন গাড়ি চাপা পড়ে মারা যান বায়ুসেনার কর্পোরাল অভিমন্যু গৌড়। ঘটনার দিন দুপুরে মহম্মদ সোহরাব গা ঢাকা দেন। তাঁর নামে পুলিশ ইতিমধ্যে রেড কর্নার নেটিস, গ্রেফতারি পরোয়ানা, এমনকী হুলিয়াও জারি করে ফেলেছে। তার পরেও সোহরাব অধরা। এখন কেন মনে হচ্ছে যে, উনি ধরা দিতে পারেন?
তদন্তকারীদের ব্যাখ্যা: সোহরাবের নামে হুলিয়া জারি হয়েছে গত ৪ ফেব্রুয়ারি। নিয়ম অনুযায়ী, এর পরে ৩০ দিন কেটে গেলে তিনি হুলিয়া অগ্রাহ্যকারী (প্রোক্লেম্ড অফেন্ডার) হিসেবে গণ্য হবেন।
সে সম্ভাবনা মাথায় রেখেই সোহরাব আত্মসমর্পণের তোড়জোড় করছেন বলে পুলিশের ধারণা।
কী রকম?
লালবাজার-সূত্রের বক্তব্য: সে ক্ষেত্রে ওঁর বিরুদ্ধে নতুন মামলা রুজু হবে। রেড রোড-কাণ্ডে মহম্মদ সোহরাবের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং অভিযুক্তকে পালাতে ও আত্মগোপনে সাহায্য করার অভিযোগে মামলা হয়েছে। উপরন্তু জুড়েছে অস্ত্র আইন, কারণ নোটিস সত্ত্বেও তিনি নিজের লাইসেন্সড রিভলভারটি পুলিশকে জমা দেননি। এ বার ‘প্রোক্লেম্ড অফেন্ডার’ তকমা পড়ে গেলে কোর্টের নির্দেশে ওই ফল ও হোটেল ব্যবসায়ীর সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত হবে। ‘‘এমনিতেই গ্রেফতারি পরোয়ানা ঘাড়ে নিয়ে এত দিন লুকিয়ে থাকার সুবাদে সোহরাবের কারবার যথেষ্ট মার খাচ্ছে। ধরে নেওয়া যায়, এ অবস্থায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঝুঁকি উনি নেবেন না।’’— পর্যবেক্ষণ এক তদন্তকারীর।
এমতাবস্থায় সোহরাবের তরফে আত্মসমর্পণের চেষ্টার একটা আঁচ গোয়েন্দারা পেতে শুরু করেছেন। রেড রোড-কাণ্ডের তিন দিন বাদে ধরা পড়েছে সোহরাবের ছোট ছেলে সাম্বিয়া। তার দুই বন্ধু জনি ও শানুও এখন পুলিশের কব্জায়। জেল হেফাজতে প্রত্যক্ষদর্শীদের দিয়ে ধৃতদের শনাক্তকরণ (টিআই প্যারেড)-ও হয়ে গিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন,দুর্ঘটনার সময়ে সাম্বিয়া গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সাম্বিয়া নিজেও তা স্বীকার করেছেন বলে গোয়েন্দাদের দাবি। প্রসঙ্গত, সোহরাবের বড় ছেলে আম্বিয়াও ঘটনার পর থেকে পলাতক, যদিও অভিযুক্ত-তালিকায় তাঁর নাম নেই। ঘটনার পরে সোহরাবের স্ত্রী ও আম্বিয়ার স্ত্রীও কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সপ্তাহ দুয়েক আগে তাঁরা ফিরে এসেছেন।
পরিস্থিতির এ হেন প্রেক্ষাপটে এক গোয়েন্দা অফিসারের মন্তব্য, ‘‘গাড়ি চাপা দিয়ে মারার মামলায় সোহরাবের সাজা যদি না-ও হয়, হুলিয়া অগ্রাহ্যকারী হিসেবে তিনি শাস্তি এড়াতে পারবেন না। উনি নিজেও তা বিলক্ষণ জানেন।’’ যে কারণে হুলিয়া জারির এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করতে পারেন কিংবা আগাম জামিনের আবেদন জানাতে পারেন বলে গোয়েন্দাদের অনুমান। কিন্তু এত দিন ওঁকে ধরতে না-পারাটা কি পুলিশের ব্যর্থতা নয়?
বস্তুত এ প্রসঙ্গে ‘ঢিলেমি’র অভিযোগ শোনা যাচ্ছে লালবাজারের অন্দরে। নিচুতলার অভিযোগ, সাম্বিয়া-জনি-শানুকে হাতে পাওয়া ইস্তক পুলিশি তৎপরতায় ভাটা পড়েছে। বিশেষ তদন্তদলের বৈঠকও সে ভাবে হচ্ছে না। মহম্মদ সোহরাবকে ধরতে গত দু’সপ্তাহে তো কোনও উদ্যোগই চোখে পড়েনি বলে এই মহলের আক্ষেপ।
গোয়েন্দা-কর্তারা স্বভাবতই অভিযোগ উড়িয়ে দিচ্ছেন। এ দিকে শুক্রবার সাম্বিয়া, জনি ও শানুকে ফের ব্যাঙ্কশাল কোর্টে তোলা হয়েছিল। ওঁদের কৌঁসুলি অশোক বক্সী ও ফজলে আহমেদ খান আদালতের কাছে আবেদন করেন, শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া যে হেতু সারা হয়ে গিয়েছে, তাই ধৃতদের জামিন দেওয়া হোক। বিরোধিতা করে সরকারপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি তমাল মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এক জন সেনা অফিসার শনাক্তকরণে আসতে পারেননি। তাঁকে দিয়ে শনাক্তকরণ হোক। জেলে গিয়ে অভিযুক্তদের জেরার অনুমতিও দেওয়া হোক।’’
পুলিশের আবেদন মেনে তিন অভিযুক্তকে জেল হেফাজতেই রাখতে বলেছে আদালত।