‘পকেটমারি’ শব্দটি লিখতে আপত্তি কী? কেন লিখতে হবে ‘ফোনটি আমার পকেটে ছিল। খুঁজে পাচ্ছি না!’ ভরদুপুরে থানায় এ নিয়ে তর্ক শুরু হয়েছে। অভিযোগ জানাতে আসা ব্যক্তি নাছোড়। চিৎকার করে বলছেন, ‘‘পকেটমারি বা পিকপকেট হয়েছে লিখলেই তো মামলা করতে হবে। দোষীকে খুঁজে বার করার দায় তৈরি হবে। অভিযোগকারী নিজেই খুঁজে পাচ্ছেন না লেখাতে পারলে সেই দায় নেই।’’
একই চিত্র বাড়িতে তালা ভেঙে চুরির একটি ঘটনায়। অভিযোগকারীকে পুলিশ বলছে, ‘‘সোজা কথায় চুরি হয়েছে লিখুন।’’ অভিযোগকারী বলছেন, ‘‘চুরিটা যে বাড়ির দরজা ভেঙে ঢুকে হয়েছে, সেটা লিখতে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে তো বার্গলারির মামলা হবে। শুধু চুরি হয়েছে বললে তো লঘু আইনের ব্যাপার হয়ে যায়।’’
আর একটি ঘটনায় আবার এক তরুণীকে পুলিশকর্মী বুঝিয়ে চলেছেন, ‘‘এ দিক-ও দিক লিখলে কিন্তু আদালতে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। তার চেয়ে তোমাকে কটূক্তি করা হয়েছে লিখে দাও। আমরা ছেলেটাকে তুলিয়ে এনে ওষুধ দিয়ে দেব।’’ কিন্তু তরুণীর প্রশ্ন, যৌন নিগ্রহ আর কটূক্তি কি এক অপরাধ?
পুলিশ পরিষেবা পেতে গিয়ে এমন নানা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় বলে অভিযোগ অনেকেরই। আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন নির্বাচনের এই সময়ে আলাদা করে আলোচনার কেন্দ্রে। যে কোনও সরকারি পরিষেবার অন্যতম দিক পুলিশ পরিষেবা। তা পেতে গিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা কী, সে নিয়ে খোঁজ করতেই সামনে আসছে এমন নানা ঘটনা। আইনজীবী থেকে প্রাক্তন পুলিশকর্তাদের অনেকেরই দাবি, কখনও অপরাধ লঘু করে দেখানোর চেষ্টা হয়। কখনও এমন ধারায় মামলা করা হয়, যাতে শাস্তির মাত্রা কমে যায়। অনেক সময়ে বাজি বা বোমা বিস্ফোরণের মতো ঘটনার ক্ষেত্রেও কিছুই বাজেয়াপ্ত করা যায়নি বলে আদালতে পুলিশ এমন রিপোর্ট দেয়, যাতে দিনকয়েকেই জামিন পেয়ে বেরিয়ে ফের বাজি, বোমার বেআইনি কারবার শুরু করতে পারেন অভিযুক্ত।
প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের পরেও চিত্র বদলায় না। ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরো’ (এনসিআরবি)-র রিপোর্টে টানা চার বার কলকাতা দেশের নিরাপদতম শহরের স্বীকৃতি পেলেও নারী নিগ্রহ, গার্হস্থ্য হিংসা এবং অ্যাসিড হামলার ঘটনা যে হারে বেড়েছে বলে জানা গিয়েছে, তাতে আলাদা করে চর্চা চলছে। অভিযোগ, পুলিশ জানতেই পারে না কে, কী ধরনের অ্যাসিড কেন কিনছে! অথচ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ রয়েছে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান ছাড়া কেউ অ্যাসিড বিক্রি করতে পারবে না। লাইসেন্স থাকলেও কোন দোকান, কাকে, কতটা অ্যাসিড বিক্রি করছে, সেই সংক্রান্ত সব তথ্য রাখতে হবে স্থানীয় থানাকে।
নারী নিগ্রহের বহু অভিযোগই আবার থানা পর্যন্ত গড়ায় না। পাচারের অভিযোগও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমর্থন না থাকলে পুলিশের নজরে পড়ে না বলে অভিযোগ। তবে, রাজীব কুমার বা অনুজ শর্মা, বিনীত গোয়েল বা মনোজ বর্মা, এমনকি, সদ্য প্রাক্তন কলকাতার নগরপাল সুপ্রতিম সরকারও কলকাতা পুলিশের দায়িত্ব নিয়ে মহিলাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে বিশেষ জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু অভিযোগ, এখনও কার্যত কর্মীর অভাবে ধুঁকছে মহিলা থানাগুলি। পরিকাঠামোর অভাবে সেখানে অপরাধী ধরতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও মহিলা পুলিশকর্মীদের অপেক্ষা করে থাকতে হয়। বহু থানাতেই রাতে মহিলা সংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে গিয়ে মহিলা পুলিশকর্মীর দেখা মেলে না।
একই রকম অভিযোগ ওঠে নিখোঁজ সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তের ক্ষেত্রেও। পুলিশ সূত্রের খবর, প্রতিদিন গড়ে অন্তত একটি করে নিখোঁজ ডায়েরি হয় কলকাতার প্রতিটি থানায়। বেশ কিছু দিন কেটে যাওয়ার পরেও খোঁজ না মিললে আর নিখোঁজের পরিবারের লোকবল থাকলে বিষয়টি নেড়েচেড়ে দেখা হয়। এক পুলিশ অফিসারেরই মন্তব্য, ‘‘রোজই লোকজন হারিয়ে যাচ্ছেন। অত ভাবলে চলে? নরম পরিবার দেখলে ‘দেখুন, ফুর্তি করতে গিয়েছে’ বা ‘অপরাধ করে পালিয়েছে’ বলে দিতে পারলেই হল।’’ একই ব্যাপার জ়িরো এফআইআর লেখার ক্ষেত্রেও।
প্রাক্তন পুলিশকর্তা সলিল ভট্টাচার্য বললেন, ‘‘এক থানা থেকে আর এক থানায় ঘোরানো হয় শুধু কাজ না করতে চাওয়ার জন্য। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা বিদেশি কেউ থানায় গেলেও একই রকম গড়িমসি চলে দোভাষী ডাকার ক্ষেত্রে। বিপদে পড়া কাউকে আরও একটু বিপদে ফেলে বাঁচানোর ভান করা হয়। এর পরে দু’হাত পেতে টাকা চাওয়া হয়। পাসপোর্ট করানোর ক্ষেত্রে বা মৃতের ময়না তদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার জন্য থানায় ঘুরতে হয়েছে যাঁদের, তাঁরা জানেন, টাকার খেলা কোন পর্যন্ত চলে!’’
পুলিশকর্তা অনিল জানার দাবি, ‘‘পুলিশের ওয়েলফেয়ার বোর্ড চালানোর নামে শাসকদলের সমর্থনে এমন প্রচার আগে দেখিনি। পুলিশ ভুলেই গিয়েছে, আমরা মানুষের বস নই, মানুষ আমাদের বস।’’ কলকাতার নবনিযুক্ত নগরপাল অজয়কুমার নন্দের যদিও দাবি, ‘‘পুলিশ নিরপেক্ষ হবে। নিজেদের হারতে দেখতে আমি আসিনি।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)