‘একলা চলো রে’।
করোনা-জয়ের যাত্রা আক্ষরিক অর্থে এ ভাবেই শুরু হয়েছিল আইসক্রিমের কাঠি তৈরির ছোটখাটো ব্যবসা করা শঙ্কর দাসের। কোভিড পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে আসার পরে উদ্ভ্রান্ত শঙ্কর পরামর্শ নিতে বার বার চিকিৎসককে ফোন করেছিলেন। কিন্তু সাড়া মেলেনি। কিন্তু তাতে বিশেষ ঘাবড়ে যাননি বছর বিয়াল্লিশের ওই ব্যবসায়ী। দেরি না করে রিপোর্ট হাতে একাই ছুটে গিয়েছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তার পরের ১০ দিন করোনার সঙ্গে যুদ্ধে তাঁর হাতিয়ার ছিল একটাই— মনের জোর।
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পরে উল্টোডাঙার বাসিন্দা শঙ্করের ১৪ দিনের আইসোলেশন শেষ হয়েছে বুধবার। কাজ শুরু করার মতো মানসিক ও শারীরিক জোরও ফিরে পেয়েছেন। শঙ্করের কথায়, ‘‘করোনার কারণে ব্যবসা বন্ধ। তাই বেকার বসে রয়েছি। না হলে কাজে নামতে আমার কোনও সমস্যা নেই। আসলে এই লড়াইয়ে মনের জোরটাই বেশি প্রয়োজন।’’
দু’-তিন দিনের জ্বর ও কাশি দেখে কোভিড পরীক্ষা করিয়েছিলেন শঙ্কর। ৩০ জুন রিপোর্ট এলে জানতে পারেন, তিনি পজ়িটিভ। শঙ্করের কথায়, ‘‘যে চিকিৎসক কোভিড পরীক্ষা করার কথা লিখেছিলেন, রিপোর্ট আসার পরে তাঁর সঙ্গে ফের যোগাযোগ করি। হাসপাতালে ভর্তি হব কি না, তা জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু উনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন বন্ধ করে দেন। আর যোগাযোগ করতে পারিনি। তখনই স্থির করি, এ বার যা করার নিজেকেই করতে হবে।’’
শঙ্করের বাড়িতে রয়েছেন বৃদ্ধা মা, স্ত্রী এবং দু’বছরের মেয়ে। ফলে রিপোর্ট পজ়িটিভ দেখে প্রথমে খানিকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। ‘‘মনে হয়েছিল, হয়তো আর বেঁচে ফিরব না। তার পরে নিজেই নিজেকে বোঝাই। পরিবারের জন্য আমায় বাঁচতে হবে। তাই একাই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছে যাই’’— বলছেন শঙ্কর।
তবে হাসপাতালে গেলেও প্রথমে তাঁকে ভর্তি নিতে চাওয়া হয়নি বলেই জানাচ্ছেন শঙ্কর। রিপোর্ট পজ়িটিভ আসার পরে স্বাস্থ্য ভবনের যে নম্বর থেকে তাঁর কাছে ফোন এসেছিল, হাসপাতালে দাঁড়িয়ে সেই নম্বরেই ফের ফোন করেন শঙ্কর। হাসপাতালে ভর্তি করে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তাতেই কাজ হয়।
কোভিড রোগী হিসেবে ১০ দিনের সেই হাসপাতাল-বাসের অভিজ্ঞতা কেমন? শঙ্কর জানান, যে ট্রলিতে চাপিয়ে রোগীকে ওয়ার্ডে আনা হচ্ছে, তাতে করেই খাবার আনতে দেখেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘চিকিৎসায় কোনও সমস্যা ছিল না। তবে আশপাশের পরিবেশ ঘাবড়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। শৌচাগার পরিচ্ছন্ন নয়। এক দিন শুনলাম, নীচের তলায় এক জন পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভয়ে কেউ তাঁকে মেঝে থেকে তোলেননি। পরে তিনি নাকি মারা যান। আমি যে ঘরে ছিলাম, সেখানেও এক দিন এক জন বয়স্ক মানুষ পড়ে গিয়েছিলেন। প্রথমে কেউ এগিয়ে না এলেও পরে অবশ্য হাসপাতালের লোকজনই এসে তাঁকে সাহায্য করেন।’’
হাসপাতালে থাকার সময়ে এমনই নানা অভিজ্ঞতা এক জন করোনা-আক্রান্তের মনোবল তলানিতে ঠেলে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট বলে জানাচ্ছেন শঙ্কর। তবে নিজের চিকিৎসা নিয়ে অবশ্য কোনও অভিযোগ নেই তাঁর। ‘‘চিকিৎসকেরা সময়মতো এসে দেখে যেতেন। চিকিৎসা নিয়ে আমার মনে কোনও ক্ষোভ নেই।’’
করোনাকে হারিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পরে শঙ্করের সামনে এখন নতুন লড়াই। আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে সঙ্গে করোনা নিয়ে মানুষের মনে ভীতি কাটাতে চাইছেন এই কোভিডজয়ী। তাঁর কথায়, ‘‘বন্ধু-পরিজনদের বলেছি, করোনা মানেই মৃত্যু নয়। সাহস করে নিজের চিকিৎসার ব্যবস্থা করাটা খুব জরুরি। হাসপাতালে এক বৃদ্ধ আমায় বলেছিলেন, হাল ছেড়ো না বন্ধু। আমিও সেটাই বলছি সকলকে।’’