Advertisement
E-Paper

চোলাই কারবারে লাগাম কোথায়!

প্রায় দেড় মাস হল দু’চোখের পাতা এক করতে পারেন না করুণাদেবী। অভাবকে সঙ্গে নিয়েও দিব্যি চলছিল সংসার। এক ছেলে আর এক মেয়ে স্কুলে পড়াশোনা করছিল। স্বামীও কাজ করতে যেতেন নিয়মিত। কিন্তু কাল হল চোলাই খাওয়াটাই।

আনন্দ মণ্ডল

শেষ আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৫ ০১:১৯
ময়নার আড়ংকিয়ারানায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেক। ছবি: পার্থপ্রতিম দাস।

ময়নার আড়ংকিয়ারানায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেক। ছবি: পার্থপ্রতিম দাস।

প্রায় দেড় মাস হল দু’চোখের পাতা এক করতে পারেন না করুণাদেবী। অভাবকে সঙ্গে নিয়েও দিব্যি চলছিল সংসার। এক ছেলে আর এক মেয়ে স্কুলে পড়াশোনা করছিল। স্বামীও কাজ করতে যেতেন নিয়মিত। কিন্তু কাল হল চোলাই খাওয়াটাই। সেদিন তো দিব্যি লোকটা সকালে কাজ করতে গেল। আর ফিরল না। পরে জানা গেল, কাজ শেষে যেমন চোলাই খেতে যেত, সেরকমই গিয়েছিল। কিন্তু সে দিন আর পাঁচটা দিনের মতো ছিল না। ‘‘ওই মদের বিষই কেড়ে নিল মানুষটাকে’’-ক্ষোভ ঝরে পড়ে করুণাদেবীর গলায়।

করুণাদেবী একমাত্র নন। ময়নার আ়ড়ংকিয়ারানা গ্রামের অনেকের জীবনই বদলে দিয়েছে বিষ-মদ কাণ্ড। গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ময়নায় চোলাই মদ খেয়ে মোট ২৫ জনের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকার বাসিন্দাদের ক্ষোভ তুঙ্গে উঠেছিল। তবে এটাই প্রথম নয়। এর আগেও ২০০৯ সালে এই জেলার তমলুকের শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকে এই রকমের ঘটনা ঘটে। তখন ৫২ জনের মৃত্যু থেকেও শিক্ষা হয়নি এলাকা। সেই ঘটনার পরও প্রতিটি বাজারে চোলাই মদের ঠেক চলেছে রমরমিয়ে। সন্ধে নামলেই দিনের কাজ সেরে অনেকে ভিড় জমাতেন এখানে। স্থানীয়দের অভিযোগে মাঝে মাঝে পুলিশ অভিযান চালাত। দিন কয়েকের জন্য বন্ধও থাকত ঠেক। কিন্তু যে কে সেই। এই মৃত্যু মিছিলের পর ফের স্বমহিমায় ফিরে এসেছে ঠেক। তারই ফল বিষ মদ কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি।

ময়নার কিয়ারানা বাজার, পেটুয়া মোড়, তেওয়ারি মোড়-সহ বিভিন্ন বড়-ছোট বাজারগুলিতে চোলাই মদের বেশ কিছু ঠেক ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। পুলিশ ও আবগারি দফতর অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে মদ ব্যবসায়ী মানিক রুইদাস, পেটুয়া মোড় এলাকার দুলাল বিষয়ী ও তেওয়ারি মোড়ের গৌর তেওয়ারিকে। আপাতত আদালতের নির্দেশে তাঁদের আপাতত ঠাঁই হয়েছে শ্রীঘরে। বাজেয়াপ্ত করা হয় প্রচুর বেআইনি চোলাই মদ। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক ব্যবসায়ীকেই ধরেনি পুলিশ। এমনকী লুকিয়ে ফের ব্যবসা চালানোরও অভিযোগ উঠেছে।

Advertisement

টালির চাল আর বাঁশের দেওয়া এক চিলতে বাড়িতে বসে তাই স্বামীর কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন করুণাদেবী। তিনি বলেন, ‘‘স্বামীর মৃত্যুর পর পঞ্চায়েত থেকে আমাদের ৫০ কিলোগ্রাম আর ২ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন আর কোনও আয় নেই। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা পুরোপুরি ভেসে গেলাম।’’ একই কথা তরুণ মণ্ডলেরও। বাবা সহদেব মণ্ডলেরও চোলাইয়ের নেশা ছিল। তরুণবাবু বলেন, ‘‘আমরা বারণ করেছিলাম ছাইপাঁশ খেতে। মদের ঠেকে গিয়ে র ঝামেলা করেছি। কিন্তু চোলাই মদের ব্যবসায়ীদের দাপট এত ছিল যে কেউ কিছু বলতেই পারেনি।’’

চোলাই মদ খেয়ে কোনওরকমে রক্ষা পাওয়া বাসিন্দারাও এলাকার চোলাই মদ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভে ফুঁসছেন। আড়ংকিয়ারানা গ্রামের বাসিন্দা বছর আটত্রিশের শ্যামপদ ভূঁইয়া পেশায় পান চাষি। চোলাই মদ খেয়ে অসুস্থ হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তমলুক জেলা হাসপাতালে। বাড়ির সামনে বসে শ্যামপদ বলেন, ‘‘জানি চোলাই খাওয়া ঠিক নয়। তা বলে ওরা বিষ মদের ব্যবসা করবে? ওদের যেন কঠোর শাস্তি হয়।’’ স্থানীয় বাসিন্দা বনবিহারী মণ্ডল বলেন, ‘‘এলাকায় বাজারগুলিতে চোলাই মদের ঠেক থেকে অনেকেই লুকিয়ে মদ খেয়ে আসত। ওইসব ঠেকে মদ খেয়ে এত মানুষের মৃত্যু হবে ভাবতে পারিনি।’’

সোমবার পেটুয়ামোড় এলাকায় একটি মদ বিরোধী সচেতনতা শিবিরে এসেছিলেন তমলুকের সাংসদ শুভেন্দু অধিকারী। ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি পরিবারের হাতে ৫০ হাজার টাকা তুলে দিয়ে বলেন, ‘‘এই জেলা শিক্ষায় এগিয়ে। সেখানে এমন ঘটনা মোটেও কাম্য নয়। আমরা কেউ এই ঘটনার দায় এড়াতে পারি না।’’ এলাকা থেকে বেআইনি মদের ঠেক নির্মূল করারও ডাক দেন তিনি।

২০০৯ সালের ঘটনায় অভিযুক্তরা আপাতত জামিন পেয়ে বহাল তবিয়তেই রয়েছে। চোলাই মদ খেয়ে ২৫ জনের মৃত্যুর ঘটনার জেরে ময়না থানার পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছিল। যার জেরে ময়না থানার ওসি আশিস বেরাকে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে বদলি করা হয়েছে বলে খবর। এখনও পুলিশের নজর এড়িয়ে চোলাই ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ জানাচ্ছেন স্থানীয়রাই। মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত দোষীদের শাস্তি হবে তো? অপেক্ষায় ময়না।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy