—তরতর করে কেমন বাড়িটা তুলে ফেলল দেখেছ?
—তুলবে না? হাতে কাঁচা টাকা এসেছে যে!
পড়শির বাড়ি তৈরি করা দেখে অনেকেই এমন আলোচনা করে থাকেন। নিন্দুকেরা বলে, তাঁরা নাকি পরশ্রীকাতর!
কিন্তু তৈরি হওয়া আস্ত বাড়িটাকেই যদি যন্ত্রপাতির সাহায্যে মাটি থেকে উঁচুতে তুলে ফেলা হয়?
কৃষ্ণনগরের কাঁঠালপোঁতায় চায়ের দোকানে কথাটা শুনে মোক্ষম চটেছিলেন সত্তর বছরের এক বৃদ্ধ। চায়ের গেলাসটা কাঠের বেঞ্চের উপরে ঠক করে রেখে বলেছিলেন, ‘‘সাতসকালে মস্করা হচ্ছে? এ কি ম্যাজিক নাকি হে!’’ ছাড়ার পাত্র নয় সদ্য যুবকও। বলেছিলেন, ‘‘চলুন না, দেড় মিনিটের হাঁটা পথ। নিজে চোখেই দেখে আসবেন।’’ অবশেষে চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন হয়েছে বৃদ্ধের। হাসতে হাসতে তিনি বলছেন, ‘‘মরার আগে আরও কত কী দেখব! এ তো আজব জিনিস গো।’’
আজবই বটে!
কাঁঠালপোঁতায় খোকনচন্দ্র দাসের আস্ত একতলা বাড়িটি মাটি থেকে চার ফুট উঁচুতে তোলা হচ্ছে। একশোটি জ্যাক দিয়ে ইতিমধ্যে বেশ কিছুটা তুলেও ফেলা হয়েছে। দশ দিন ধরে কাজও চলছে পুরোদমে। হরিয়ানার ‘এসসিএসবি ইঞ্জিনিয়িরিং ওয়ার্কস’ নামে এক সংস্থা এই কাজের দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের দাবি, কাজ শেষ হতে এখনও মাসখানেক সময় লাগবে।
কী ভাবে হচ্ছে এই ‘আজব’ কাজ?
সংস্থার কর্মীরা জানাচ্ছেন, বাড়ি উঁচু করার কাজটি নিখুঁত মাপজোকের উপরে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমে বাড়ির ভিত পর্যন্ত মাটি খোঁড়া হয়েছে। ভিতের প্রায় তিন ফুট অংশ থাকছে মাটির নীচে। ভিতের উপরের অংশ থেকে ইট সরিয়ে জ্যাক লাগানো হচ্ছে। প্রায় পৌনে আটশো বর্গফুটের ওই বাড়িতে ১০০টি জ্যাক লাগিয়ে ভিত থেকে বাড়িটিকে আলাদা করা হয়েছে। ওই জ্যাকগুলির উপরে আস্ত বাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে মাঝের অংশে ইটের গাঁথনি দেওয়া হচ্ছে। গাঁথনি শেষ হলে জ্যাকগুলি বের করা হবে।
তবে এমন কাজ নদিয়ায় এই প্রথম নয়। গত বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ফুলিয়ার চাঁপাতলায় একটি বাড়িকে তোলা নয়, এক্কেবারে সত্তর ফুট পিছিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এই সংস্থা। সে বারেও আস্ত বাড়িটাকে গাড়ির মতো গড়িয়ে পিছিয়ে আনা হবে—কথাটা তেমন বিশ্বাস হয়নি কারও। নিজের চোখে ঘটনাটি দেখতে বেশ কয়েক দিন ধরে আশপাশের গাঁ উজিয়ে লোকজন ভিড় করেছিলেন চাঁপাতলায়। তারপর সকলের চোখের সামনে একটু একটু করে আস্ত একতলা বাড়িটাই পিছিয়ে গিয়েছিল সত্তর ফুট!
চাঁপাতলার অমল শর্মার সেই বাড়ির নামও দিয়েছিলেন স্থানীয় লোকজন—চলন্ত বাড়ি। জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণের সময় অমনবাবুর বাড়ি-সহ প্রায় তিন শতক জমি অধিগ্রহণ করে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ক্ষতিপূরণ বাবদ যা তিনি পেয়েছিলেন তা দিয়ে আর একটি বাড়ি তৈরি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। সব ভেবেচিন্তে তিনি হরিয়ানার এই সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রায় তিন লক্ষ টাকা খরচ করে অমলবাবু বাড়ি পিছিয়ে দিয়েছিল ওই সংস্থা।
কিন্তু কাঁঠালপোঁতার বাড়িটি উঁচু করার দরকার হল কেন?
কাঁঠালপোঁতার ওই বাড়ির মালিক খোকনবাবু পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনিতে টাঁকশালে চাকরি করেন। বছর দেড়েক আগে এই বাড়িটি কিনেছিলেন তিনি। বর্তমানে তাঁর শ্যালক দেবাশিস বিশ্বাস ওই বাড়িতে থাকেন। দেবাশিসবাবু জানান, বাড়ি কেনার পর থেকে একটাই সমস্যা। এলাকার নিকাশি ব্যবস্থা তেমন ভাল নয়। জায়গাটাও নিচু। ফলে ফি বর্ষায় বাড়ির মধ্যে জল ঢুকে যায়। মার্চ মাসে তিনি জানতে পারেন, হরিয়ানার এই সংস্থার কথা। দেবাশিসবাবু বলছেন, ‘‘প্রায় পৌনে আটশো বর্গফুট বাড়ি চার ফুট উচু করতে প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা ওই সংস্থাকে দিতে হবে। তবে বাড়ি উঁচু করার জন্য ঘরের মেঝে ভাঙতে হয়েছে। তার জন্য নতুন করে ইট, বালি, পাথর ও অন্যান্য যা খরচ হবে তা আলাদা ভাবে আমাদের বহন করতে হবে।’’
এ ভাবেন বাড়ি সরানো কিংবা উঁচু করার ক্ষেত্রে বাড়ির ক্ষতি হয় না?
সংস্থার মালিক শিবচরন সাইনি জানাচ্ছেন, তাঁদের সংস্থা ২১ বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। এখনও পর্যন্ত গোটা দেশ জুড়ে প্রায় পাঁচ হাজার বাড়ি সরানো এবং উঁচু করার পাশপাশি হেলে যাওয়া বাড়ি সোজা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ৯ টি বাড়ি সরানো হয়েছে। ৪০ টিরও বেশি বাড়ি উঁচু করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ‘‘মাটির চরিত্র বুঝে কাজ করা হয়। আজ পর্যন্ত একটি বাড়িও ক্ষতি হয়নি। বাড়ির মালিকের সঙ্গে আমাদের চুক্তি থাকে, বাড়ি সরানো বা উঁচু করার ক্ষেত্রে কোনও ক্ষয়ক্ষতি হলে তার সব দায়িত্ব কোম্পানি বহন করবে।’’
নদিয়ার পূর্ত দফতরের এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়র গৌরহরি মালাকার বলেন, “এমন কাজ বিদেশে অনেক আগে থেকেই হয়। মাপজোক ও কাজের পদ্ধতি ঠিক থাকলে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”
অতএব কাজ চলছে পুরোদমে। বিরাম নেই ফোনেরও।
—হ্যাঁ রে, যা শুনলাম তা সত্যি?
—একশো ভাগ। বিকেলে একবার চলে আয় না। নিজে চোখেই দেখতে পাবি।
কাঁঠালপোঁতার বাসিন্দা অশোক রায় বলছেন, ‘‘ফুলিয়ার চাঁপাতলার ঘটনাটা নিজে চোখে দেখার সুযোগ হয়নি মশাই। তবে এ বার দেখছি। বন্ধুদেরও ফোনে আসতে বলেছি।’’
চাঁপাতলায় ভিড় বাড়ছে। হাসি চওড়া হচ্ছে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে। আঁচে হাওয়া দিতে দিতে মাঝবয়সী চা বিক্রেতা মাঝেমধ্যেই ছুড়ে দিচ্ছেন প্রশ্নটা—‘‘কাজ শেষ হতে এখনও মাসখানেকের ধাক্কা। কী বলেন?’’