মতুয়া ভোটব্যাঙ্ককে সামনে রেখে রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভা আসনে কৌশল বদল করল তৃণমূল। দক্ষিণ নদিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিদায়ী বিধায়ক মুকুটমনি অধিকারীকে টিকিট না দিয়ে নতুন মুখ আনার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
মুকুটমনি নিজে একসময় মতুয়া সমাজে বিজেপির অন্যতম মুখ ছিলেন—তাই তাঁকে প্রার্থী না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়ছে জল্পনা। তিনি বিজেপির ঘনিষ্ঠ মতুয়া সংগঠনের নদিয়া দক্ষিণ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ছিলেন এবং সেই সময়ে মতুয়া ভোট সংগঠনে তাঁর প্রভাব যথেষ্ট বলেই মনে করা হত। পরবর্তীকালে তিনি দলবদল করে তৃণমূলে যোগ দেন। এক দিকে, মতুয়া ভোটের সমীকরণ, অন্য দিকে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলে ওঠানামা—সব মিলিয়ে ঝুঁকি নিয়েই প্রার্থী বদলের পথে হাঁটল শাসকদল।
এই প্রেক্ষাপটেই তৃণমূল প্রার্থী করা হয়েছে স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সৌগত বর্মণকে। তিনি কল্যাণীর কলেজ অফ মেডিসিন অ্যান্ড জহরলাল নেহেরু মেমোরিয়াল হাসপাতালের অধ্যাপক তথা ডিন অফ স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্স। কৃষ্ণনগরের নেদেরপাড়ার বাসিন্দা সৌগতের কল্যাণীতেও বাড়ি রয়েছে। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ও এমএস পাশ করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার প্রার্থী ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই রানাঘাটে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে পতাকা হাতে নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে দলে যোগ দেন সৌগত। যদিও তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নতুন নয়। ১৯৯৮ সালে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন তৃণমূলপন্থী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি প্রোগ্রেসিভ হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সহ-সভাপতি।এর আগেও তাঁর নাম প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছিল। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রানাঘাট কেন্দ্র থেকে তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু একটি দুর্ঘটনার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়ন জমা দিতে পারেননি, ফলে প্রার্থী বদল করতে হয় দলকে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, রানাঘাট দক্ষিণ আসনে এ বার তৃণমূলের লড়াই যথেষ্ট কঠিন। দক্ষিণ নদিয়ায় বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় মতুয়া ভোট একটি বড় নির্ণায়ক ফ্যাক্টর। রানাঘাট দক্ষিণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় মতুয়া ভোটার রয়েছেন, যা ভোটের ফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
ভোটের অতীত পরিসংখ্যানও তৃণমূলের জন্য খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ২০১১ সালে তৃণমূল এই আসন জিতলেও ২০১৬ সালে তা হাতছাড়া হয় সিপিএমের কাছে। ২০২১ সালে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে মুকুটমনি অধিকারী প্রায় ১৭ হাজার ভোটে জয়ী হন। পরে তিনি দলবদল করে তৃণমূলে যোগ দেন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী হন, যদিও সে সময় প্রায় ৩৭ হাজার ভোটে পরাজিত হন। তবে পরবর্তী উপনির্বাচনে তিনি প্রায় ৩৯ হাজার ভোটে জিতে আবার বিধায়ক হন।
এই প্রেক্ষাপটে তাঁকে প্রার্থী না করে নতুন মুখে ভরসা করল তৃণমূল নেতৃত্ব। রানাঘাট ১ ও ২ ব্লকের ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং কুপার্স নোটিফায়েড এরিয়া নিয়ে গঠিত এই আসনে সংগঠন ও ভোট সমীকরণ—দুই দিক থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে তৃণমূল। সৌগত বলেন, “মানুষ দেখছেন এসআইআর-এর নাম করে কী ভাবে বিজেপি তাঁদের হেনস্থা করছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সর্বদা মানুষের পাশে রয়েছেন। বিজেপি যে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তা এখন স্পষ্ট। মানুষতৃণমূলের পাশেই থাকবেন।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)