লুচি-পায়েস থেকে পোলাও-ইলিশ। ভোগের আয়োজনে এখনও রাজকীয় মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজার ছোট রাজবাড়ি।
অযোধ্যানারায়ণ রায়ের প্রতিষ্ঠিত রাজত্বের অবলুপ্তি হয়েছে অনেক দিন। কিন্তু তিনশো বছরের প্রাচীন এই পুজো তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে সযত্নে। মহালয়ার পরের দিন শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে শুরু হয়ে গিয়েছে ষোড়শ উপাচারে পুজো। রাজকীয় ভোগের আয়োজনও প্রতিপদ থেকেই।
ষষ্ঠী পর্যন্ত লুচি, বোঁদে, মিষ্টি, সন্দেশ, পায়েস, আনারস, নাসপাতি, সরবতি আলু, আপেল আখ, পেয়ারা, বাতাবি লেবুর মতো ফল দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয় দেবীকে। রাতে লুচি, পায়েস, সুজি ও ক্ষীরের শীতল ভোগ।
শুরুর এই আয়োজন সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর এলাহি ভোগের সলতে পাকানোর ব্যবস্থা মাত্র। এলাহি ভোগের মেনুতে থাকে পোলাও থেকে সাদা ভাত, পাঁচ তরকারি থেকে পাঁচ রকমের ভাজা— বেগুন, কুমড়ো, আলু, পটল, ডালের বড়া। তরকারির মধ্যে ফুলকপির ডালনা থেকে মোচার ঘণ্ট, লাউ-চিংড়ি, মুগের ডাল। অবশ্যই থাকে ইলিশ মাছের ঝোল আর রুই মাছের কালিয়া। শেষ পাতে টমেটোর চাটনি। কোনও দিন গোবিন্দভোগ চাল আর সোনামুগের ডালের উপাদেয় খিচুড়িভোগ রান্না করা হয়। সন্ধিপুজোর জন্য পৃথক ভোগের বন্দোবস্ত থাকে।
রাজবাড়ির প্রধান পুরোহিত সৌমেশ্বর চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সপ্তমী থেকে নবমীর ভোগকে বলা হয় বাল্যভোগ। প্রতিদিন এই ভোগ দেবীর পদতলে নিবেদন করার পর প্রসাদ হিসাবে ভক্তকুলের মধ্যে বিলি করা হয়। নবমীর দুপুরে পংক্তি ভোজন।’’ সপ্তমী থেকে নবমীর বিশাল আয়োজনের ভার চার জন ঠাকুর আর ছ’জন সহযোগীর কাঁধে।
পুজোপাঠের দলও নেহাত ছোট নয়। সেই দলে রয়েছেন সাত জন। প্রধান পুরোহিত নদিয়ার দেবগ্রাম নিবাসী ৬৮ বছরের বৃদ্ধ সৌমেশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের অধীনে তিন জন পুরোহিত চণ্ডীপাঠে ব্যস্ত। বাকি তিন জন পুরোহিত দুর্গানাম জপে মগ্ন।
সৌমেশ্বরবাবুর প্রধান সহযোগী পুরোহিত গোপাল রায় জানান, রাজত্বের সঙ্গে অবলুপ্ত হয়েছে সামন্ত যুগের পুজোর বেশ কিছু প্রথা। বর্তমান রানিমা সুপ্রিয়াদেবী আর রাজা প্রশান্ত রায়ের কল্যাণে ফের টিকেও আছে ঐতিহাসিক আমলের কিছু নিজস্ব ঐতিহ্য। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে কুমারী পুজোর পাশাপাশি সধবা পুজো হয় কাশিমবাজার ছোট রাজবাড়িতে। বেদিতে শাড়ি, শাঁখা, লোহা, সিঁদুর দিয়ে সধবা বসানোর পর তাঁর পুজো করা হয়। আবার বন্ধ হয়ে গিয়েছে পশুবলি ও সন্ধিপুজোয় তোপ দাগার মতো প্রাচীন প্রথা। পশুবলি বন্ধের কাহিনিটা শোনালেন সৌমেশ্বরবাবু। সেটা ১৯৮৪ সাল। তখন বেঁচে ছিলেন রাজা কমলারঞ্জন রায়। নিয়ম, এক কোপে বলি দিতে হবে। কিন্তু সে বার পরপর দু’টো ছাগবলির ক্ষেত্রেই দু’কোপ দিতে হয়েছিল। সেই থেকে রাজা কমলারঞ্জন রায় পুরোহিতের নিদান মেনে পশুবলি বন্ধ করে দেন। বিকল্প হিসাবে এখন উৎসর্গ করা হয় রুই মাছের ঝোল ও কাঁচা সন্দেশ।
বলি প্রথা বাতিল হলেও স্বমহিমায় বিরাজ করছে কয়েকশো বছরের প্রাচীন তুলোট কাগজে হাতে লেখা ৪৫ পাতার পুঁথি। রাজপুরোহিত জানান, ওই পুঁথি লেখা হয়েছে কালিকাপুরাণ, বৃহৎ নান্দি কেশর ও দেবীপুরাণের সমন্বয়ে। প্রাচীন এই পুঁথি থেকে চণ্ডীপাঠ করে রাজবাড়ির দেবীদুর্গার আরাধনা হয় বরাবর। যেমন, রাজার আমলের পেল্লাই সাইজের পিতলের হাঁড়িতে ভোগ রান্নার রেওয়াজ চলছে এখনও।