ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। বুথের সামনে আধা-সামরিক বাহিনীর পাহারা। পাশ দিয়ে হতাশ মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ভগ্ন চেহারার বৃদ্ধ। কোঁচকানো চামরায় হতাশা-কষ্টের কাটাকুটি। এ বার ভোটটা আর দেওয়া হল না তাঁর! ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আতঙ্কে এসআইআর-এর শুরুতেই কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। দিন কয়েক নার্সিংহোমে ভর্তি ছিলেন কোচবিহারের দিনহাটার জিৎপুর গ্রামের খাইরুল শেখ। বাড়ি ফিরে এলেও শরীরিক অসুস্থতা কাটেনি। তবু অশক্ত শরীরে ভোটের দিন কেন্দ্রের সামনে পৌঁছে গিয়েছেন খাইরুল। বুথের সামনে জমা ভিড়ে চোখ রেখে বলেছেন, ‘‘নামটা থাকলে, আমিও ভোটে দিতে পারতাম। প্রতিবারই তো দিয়েছি। এ বার আর হল না। কষ্ট হচ্ছে খুব।’’
খাইরুল জানিয়েছেন, বিভিন্ন কাগজে এক-এক জায়গায় এক-এক রকম নাম ছিল তাঁর। এসআইআর ফর্মে নাম ছিল খয়রুল শেখ। অথচ তাঁর নাম খাইরুল শেখ। তালিকা প্রকাশের পরে দেখা যায়, নাম বাদ পড়েছে খাইরুলের। ভোটের অধিকার ফিরে পেতে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন তিনি। তাঁর স্ত্রী আমিনা বিবি অবশ্য ভোট দিয়েছেন। গ্রামের বিএলও অতুল প্রসাদ পাল জানান, ওই গ্রামের ৮৮ জনের নাম এ বার ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। খাইরুল বলেছেন, ‘‘আতঙ্কিত হয়েই ওই ঘটনা ঘটিয়েছিলাম। আমার দুই সন্তানেরও একই কারণে ভোটার তালিকায় নাম নেই। ভয় করবে না?’’
খাইরুলের মতো এই একই ভয়ে দিনহাটার ওকরাবাড়ির ফলিমারি গ্রামের বাসিন্দা সুভাষচন্দ্র বর্মণ আত্মহত্যা করেন বলে অভিযোগ। যদিও ভোটার তালিকায় সুভাষের নাম ঠিক ছিল। কিন্তু তাঁর স্ত্রী সুচিত্রার বাবার নামের জায়গায় ছিল দাদার নাম। স্ত্রীয়ের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে বলে আতঙ্কে ছিলেন সুভাষ। এ দিন সুচিত্রা ভোট দিলেন। কিন্তু আতঙ্ক কেড়ে নিল সুভাষের প্রাণ। চোখের জল সামলে সুচিত্রা বলেন, ‘‘আমার নাম তো রইল। ভোটও দিলাম। ওই শুধু চলে গেল!’’
ভোটার তালিকায় স্বামী-স্ত্রী কারও নামই ছিল না। অভিযোগ, নাজিরহাটের বাসিন্দা বেলালউদ্দিন মিয়াঁ তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। ‘‘সেই দুশ্চিন্তাতেই অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন আমার স্বামী’’, বলছেন স্ত্রী দিলবারা খাতুন। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের স্বামী-স্ত্রী দু’জনের কারও নামই ভোটার তালিকায় ছিল না। স্বামী সেই ভয়েই মারা গিয়েছেন। আমার নাম না থাকায় আমিও ভোট দিতে পারলাম না।’’
ভোটার তালিকায় নাম ওঠেনি সাবেক ছিটমহলের বহু বাসিন্দার। মধ্য মশালডাঙা সাবেক ছিটমহলে আমেনা বিবি, আলামিন শেখ'দের নাম নেই ভোটার তালিকায়। ওই এলাকার বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘‘আমরা সবাই এক সঙ্গে দেশের নাগরিক হয়েছি। তার পরেও ওঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আমি ভোট দিয়েছি ঠিকই কিন্তু ওঁদের জন্য খারাপ লাগছে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)