তুফানগঞ্জ ১ ব্লকের নাটাবাড়ির বাসিন্দা বিমল বর্মন প্রায় আড়াই বিঘে জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় তাঁর জমির কিছু অংশের পাট গাছ শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। ক্ষতির আশঙ্কা এড়াতে জমির পাট গাছ কাটা শুরুও করেছেন তিনি। কিন্তু গ্রামের খাল-বিল থেকে ছোট জলাশয় সবই প্রায় শুকিয়ে গিয়েছে। বাধ্য হয়ে জমি থেকে দেড় কিমি দূরে বড় একটি বিলে পাট পচানর জন্য নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সেখানেও অবশ্য জলস্তর অনেকটা কম।
কোচবিহার ১ ব্লকের ঘুঘুমারির বাসিন্দা পরেশ রায় তিন বিঘে জমিতে পাট চাষ করেছেন। চারা লাগানর সময় বৃষ্টির জল জমে থাকায় প্রায় এক বিঘে জমির গাছের দৈর্ঘ্য আশানুরুপ হয়নি। বাকি দুই বিঘে জমি কিছুটা উঁচু বলে গাছ বেড়েছে। কিন্তু এখন এলাকার পুকুরগুলি প্রায় মজে যাওয়ায় পুরো জমির পাট পচানো নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তিনি। এক কিমি দূরে বিলের কাদামাখা জলে কিছু পাট রেখেছেন তিনি।
জুলাইয়ের শুরু থেকে জেলাজুড়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পাট পচাতে এমনই বিপাকে পড়েছেন কোচবিহারের বিস্তীর্ণ এলাকার চাষিরা। যা পরিস্থতিতে তাতে আর টানা এক সপ্তাহ এমন অবস্থা চললে বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কায় রাতের ঘুম উবে গিয়েছে জেলার পাটচাষিদের একাংশের। কৃষি দফতরের কর্তারাও ওই আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেননা। কোচবিহারের মুখ্য কৃষি আধিকারিক আশিস পাত্র বলেন, “ পাটের আঁশ ছাড়ানর জন্য মেশিন কিংবা বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রবণতা জেলায় তেমন নেই। বৃষ্টির জমা জলের ওপর নির্ভর করেই মূলত পাট পচিয়ে আঁশ বের করা হয়। এবার ওই কাজের সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টি হচ্ছেনা। ফলে আমরাও চিন্তায় আছি। তাছাড়া কাদাজলে পাট পচালে গুণগত মান খারাপ হবে।” কোচবিহারের শস্য সুরক্ষা আধিকারিক বিপ্লব ঘোষ বলেন, “ পচানর জলের সমস্যায় জেলার অন্তত ৪০ শতাংশ পাট জমিতে রয়েছে।”
জেলায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ
( ১-১৩ জুলাই)
২০১১ – ৩৫৯ মিমি
২০১২- ৭৪১ মিমি
২০১৩- ৪৫৭ মিমি
২০১৪- ১৪৩ মিমি
২০১৫- ১১৫ মিমি
এই পরিস্থতিতে কৃষি দফতরের তরফে শ্যালো দিয়ে জল উত্তোলন করে জমির মাটিতে জলাশয়ের মত পরিকাঠামো তৈরি করে পাট পচানর পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু তাতেও সমস্যা মিটছেনা। একে জেলার সর্বত্র বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, তার ওপর পাট চাষিদের অনেকেরই শ্যালো নেই। জেলা কৃষি দফতরের এক কর্তা বলেন, গত ৫ বছরের মধ্যে এবার ১-১৩ জুলাই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সবথেকে কম। তবুও পাটের বাজার মন্দা, তার ওপর পাট পচাতে খরচ বাড়ান হলে আখেরে লাভ হবেনা বলে চাষিরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেননা।
কৃষি দফতর সূত্রেই জানা গিয়েছে, গত একদশক আগে ফি বছর জেলায় গড়ে ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হত। সময়ে বৃষ্টি না হওয়া, বাজারে দাম না মেলা, গুণগতমান ভাল না হওয়ার মত নানা কারণে ওই এলাকা কমতে শুরু করে। ২০১২ সালে পাট চাষের এলাকা ছিল ৪৭,৬০০ হেক্টর। ২০১৩ সালে পাট চাষের এলাকা কমে দাঁড়ায় ৪১,৯৫০ হেক্টর। ২০১৪ সালে এক ধাক্কায় ওই এলাকা কমে দাঁড়ায় ৩১ হাজার হেক্টরে। এবার এলাকা আরও কমে ৩০ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। চারা লাগানর সময় নীচু জমিতে জল জমে থাকায় কিছু এলাকায় চারার ক্ষতি হয়। এবার জুলাইয়ের শুরু থেকে প্রায় অর্ধেক মাস পেরোতে চললেও বৃষ্টির অভাব নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কোচবিহার জেলা আলু-ধান-পাট চাষি সংগ্রাম সমিতির সম্পাদক নৃপেন কার্জি বলেন, “ দরকার অনুযায়ী বৃষ্টির তারতম্যে সমস্যা হচ্ছে। শুরুতে বেশী বৃষ্টিতে চারাগাছের ক্ষতি হল, এখন অনাবৃষ্টিতে যা পাট হয়েছে তা পচানর জল মিলছেনা। গ্রামের বেশিরভাগ ডোবা, পুকুর, জলাশয় প্রায় শুকনো।”