Advertisement
E-Paper

যেখানে চাঁদার ভয়

জাতীয় সড়ক কিংবা গ্রামের পথ—রাস্তা আটকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ছে একদল ছেলে। কিংবা পেতে রাখা হচ্ছে বেঞ্চ। চাঁদা না দিলে জুটছে গালি। কখনও মারধরও।জাতীয় সড়ক কিংবা গ্রামের পথ—রাস্তা আটকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ছে একদল ছেলে। কিংবা পেতে রাখা হচ্ছে বেঞ্চ। চাঁদা না দিলে জুটছে গালি। কখনও মারধরও।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৫ ০৩:২৩
মালদহে রাস্তা আটকে এ ভাবেই চলছে চাঁদা আদায়। গাড়ি তো বটেই, ছাড় মিলছে না টোটো-অটোরও।

মালদহে রাস্তা আটকে এ ভাবেই চলছে চাঁদা আদায়। গাড়ি তো বটেই, ছাড় মিলছে না টোটো-অটোরও।

জাতীয় সড়কের উপরেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে চলছে চাঁদার জুলুম। ডুয়ার্স, কোচবিহার থেকে মালদহ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গ জুড়ে কালীপুজোর মুখে হয়রানির মুখে পড়ছেন বাইক আরোহী থেকে ট্রাকচালক—সকলেই। পুলিশ জানাচ্ছে, রাস্তা আটকে চাঁদা তোলার অভিযোগ পেয়ে কোনও কোনও ক্ষেত্রে পুলিশ হাজির হয়েছে, কিন্তু তার আগেই পালিয়ে গিয়েছে চাঁদা আদায়কারীরা।

কোচবিহার জেলা ট্রাক মালিক সমিতির কর্তা মঙ্গল সরকার সরাসরিই অভিযোগ করেন, “জেলার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় ট্রাক দাঁড় করিয়ে চাঁদার জুলুমবাজি হচ্ছে। ফলে ট্রাক নিয়ে যাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ জানান হয়েছে।”

ট্রাক মালিক ও চালকদের সূত্রেই জানা গিয়েছে, রাস্তা আটকে চাঁদার জুলুমবাজির সব থেকে বেশি অভিযোগ উঠেছে কোচবিহার-মাথাভাঙা, কোচবিহার-ঘোকসাডাঙা, মাথাভাঙা-শীতলখুচি, তুফানগঞ্জ-বক্সিরহাট, তুফানগঞ্জ-আলিপুরদুয়ার, দিনহাটা-বামনহাট, কোচবিহার-আলিপুরদুয়ার রোডে। পুলিশ জানায়, ঘোকসাডাঙা, শীতলখুচি এলাকায় রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে চাঁদার জুলুমবাজির অভিযোগে গত দু’দিনে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জেলা জুড়ে এ বারের কালিপুজোয় চাঁদার জুলুমবাজির অভিযোগে সব মিলিয়ে ধৃতের সংখ্যা ১০ জন। কোচবিহারের পুলিশ সুপার রাজেশ যাদব বলেন, “রাস্তায় যানবাহন দাঁড় করিয়ে চাঁদা তোলার প্রবণতা বন্ধে নজর রাখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে জেলা জুড়ে ১০ জনকে ধরা হয়েছে।”

Advertisement

আটকে থাকছে গাড়ি

মালদহেও ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে শুরু করে রাজ্য সড়ক পর্যন্ত সর্বত্রই গাড়ি থামিয়ে পুজো উদ্যোক্তারা চাঁদা আদায় করছে বলে অভিযোগ। গাড়ি চালকদের অভিযোগ, ১০০ মিটার অন্তর অন্তর পুজো হচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে চলছে জোর করে চাঁদা আদায়। দাবি মতো চাঁদা না দিলেই জুটছে গালিগালাজ। প্রতিবাদ করলেই মারধরও করা হচ্ছে। এমনকি দাবি মতো চাঁদা না দিলে আটকেও রাখা হচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা। গাড়ি চালক ও মালিকদের মত হল, পুলিশের টহলদারির অভাব রয়েছে বলেই এমন জুলুমবাজি চলছে। রাস্তার উপরে গাড়ি থামিয়ে চাঁদা আদায় করায় যানযট হওয়ায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। মালদহের পুরাতন মালদহ, গাজল, হবিবপুর এবং বামনগোলা এলাকায় চাঁদার ব্যাপক জুলুম রয়েছে। কিন্তু মালদহের পুলিশ সুপার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘চাঁদার জুলুম রুখতে নিয়মিত টহল দেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

ডুয়ার্সে রাজ্য সড়ক কিংবা পূর্ত সড়কেও আকছার কালীপুজোর জন্যে গাড়ি, বাইক দাঁড় করিয়ে চাঁদা তোলা হচ্ছে। মালবাজার মহকুমার লাটাগুড়ি, ক্রান্তি, বড়দিঘি, গজলডোবা, মেটেলি, বাতাবাড়ি, নাগরাকাটা, শুল্কাপাড়া সব এলাকাতেই যাত্রী এবং গাড়ি চালকেরা চাঁদা দিয়েই তবে ছাড় পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।


একই ছবি কোচবিহারেও। নানা জায়গাতেই বাস-ট্রাক আটকে চলছে চাঁদা আদায়।

পুজোর অনুমতি বাতিল

কোথাও কোথাও পুলিশ অবশ্য কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে। যেমন শিলিগুড়ির টিকিয়াপাড়া এলাকায় একটি পুজো কমিটির বিরুদ্ধে জোর করে গাড়ি দাঁড় করিয়ে চাঁদা তোলার অভিযোগ ওঠায় পুলিশ ওই পুজোর অনুমতি বাতিল করে দেয়। মিলনপল্লি এলাকায় একটি পুজো কমিটি রাস্তা আটকে চাঁদা তুলছিল বলে খবর পাওয়ার পরে শিলিগুড়ি থানার পুলিশ গিয়ে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে চাঁদা আদায়কারীদের হঠিয়ে দেয়। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন লাগোয়া এলাকায় রাস্তা আটকে চাঁদা তোলার অভিযোগ থাকলেও লিখিত কোনও অভিযোগ হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে এলাকায় নজর রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়। আশিঘর লাগোয়া ইস্টার্ন বাইপাস এলাকায় চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে। তবে পুলিশের দাবি সমস্যা নেই। সড়ক আটকে চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে বাগডোগরা এলাকাতেও। তবে সরকারিভাবে অভিযোগ হয়নি। তবে দু’এক জায়গায় পুলিশ হস্তক্ষেপ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।

তবে বিভিন্ন এলাকায় অপেক্ষাকৃত গুরুত্বহীন রাস্তাতেই পথ আটকে চাঁদা তোলার বহর বেশি বলেই মত গাড়ি মালিকদের।

জলপাইগুড়ি শহরেরও কোথাও রাস্তা আটকে চাঁদার জুলুম দেখা না গেলেও শহরতলি এবং গ্রামগুলিতে কিন্তু উল্টো ছবি। বেলাকোবা, রংধামালি, জয়পুর চা বাগান সংলগ্ন এলাকা, মণ্ডলঘাট, চাউলহাটি, দোমহনি, বোদাগঞ্জ, পোড়াপাড়া, সিঙ্গিমারি এলাকায় অনেক যুবককে রাস্তা আটকে চাঁদা তুলতে দেখা গিয়েছে। যদিও এখানেও ওই বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনও অভিযোগ জমা পড়েনি। জলপাইগুড়ি শহর সংলগ্ন পোড়াপাড়া এলাকায় তিন জায়গায় রাস্তায় বাইক আটকে চাঁদা তুলতে দেখা গিয়েছে। দোমহনি এলাকাতেও ছিল একই ছবি। জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার জেমস কুজুর বলেন, “রাস্তা আটকে চাঁদার জুলুমের কোনও অভিযোগ পাইনি। তবে রাস্তায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। খবর পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

চাঁদার বিরুদ্ধে পদযাত্রা

গত ৬ নভেম্বর রায়গঞ্জের দেবীনগর এলাকার রায়গঞ্জ-বালুরঘাট রাজ্য সড়কে একদল যুবক একটি ট্রাক থামিয়ে চালকের কাছ থেকে কালীপুজোর চাঁদা হিসেবে ১৫০০ টাকা দাবি করে বলে অভিযোগ। মালদহ থেকে রায়গঞ্জগামী ওই ট্রাকের চালক সেই টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাঁকে ধাক্কাধাক্কি করা হয়।

সেই সময় ওই ট্রাক চালক চিত্কার চেঁচামেচি জুড়ে দিলে পথচারী ও বাসিন্দারা জড়ো হলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে ওই ট্রাক চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও অভিযুক্তরা কোন ক্লাবের হয়ে চাঁদা দাবি করেছিল, তা তিনি জানাতে পারেননি। এই বিষয়ে পুলিশে কোনও অভিযোগ দায়ের না হলেও গত ৫ অক্টোবর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী ও ব্যবসায়ী সংগঠনকে নিয়ে চাঁদার জুলুমবাজি রুখতে রায়গঞ্জ থানার পুলিশ শহরে একটি পদযাত্রার আয়োজন করে। তারপরে রায়গঞ্জ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ও পশ্চিম দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্সের সাধারণ সম্পাদক শঙ্কর কুন্ডু বলেন, এবার এখনও কোনও ব্যবসায়ী চাঁদার জুলুমবাজির অভিযোগ জানাননি। পুলিশের দাবি, তাঁরা সতর্ক রয়েছেন।

ছবি: মনোজ মুখোপাধ্যায় ও হিমাংশুরঞ্জন দেব।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy