Advertisement
E-Paper

সন্তানদের মাথা উঁচু রাখতে লড়াই করে যান আর্জুনা

তিনি নিজে প্রতিবন্ধী নন। কিন্তু মূক ও বধির তিন ছেলে ও এক নাতি ছাড়াও পাহাড় সমান প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:৫৮
দিদিমার সঙ্গে মূক ও বধির জসীমউদ্দিন। নিজস্ব চিত্র।

দিদিমার সঙ্গে মূক ও বধির জসীমউদ্দিন। নিজস্ব চিত্র।

তিনি নিজে প্রতিবন্ধী নন। কিন্তু মূক ও বধির তিন ছেলে ও এক নাতি ছাড়াও পাহাড় সমান প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে।

এক দশক আগে মারা গিয়েছেন দিনমজুর স্বামী। মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার সন্তানও মূক ও বধির হওয়ায় শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই মেয়ে ও নাতিরও ঠাঁই হয় তাঁর সংসারে। প্রতিবন্ধী ছেলেদের সহ নাতিকে নিয়ে পথে বসার উপক্রম হলেও হাল ছাড়েননি মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের মানকিবাড়ি-ধরমপুরের আর্জুনা বেওয়া। মুখ বুজে লড়াইয়ের ফলও মিলেছে। খড়ের ঝুপড়ির জায়গায় নিজের হাতে পাকা বাড়ি তৈরি করেছেন প্রতিবন্ধী এক ছেলে। এক ছেলে বিএ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। নাতিও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।

তবে এ সব কিছুই সম্ভব হয়েছে জেলা সমাজকল্যাণ দফতরের প্রাক্তন আধিকারিক প্রত্যর্পণ সিংহরায়ের জন্য। প্রতিবেশীরাও তাঁকে লড়াই করার সাহস জুগিয়েছেন। প্রত্যর্পণবাবু আর্জুনাকে জোর করেই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সহায়িকা পদে কাজ দিয়েছিলেন। প্রতিবেশীদের সাহায্য আর প্রশাসনের একটু সদিচ্ছা থাকলে যে প্রতিবন্ধীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারগুলোও ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তা দেখিয়ে দিয়েছেন আর্জুনা। তাঁর দীর্ঘ এক দশকের লড়াইয়ের কথা এখন প্রতিবেশীদের মুখে মুখে ফেরে।

Advertisement

প্রত্যর্পণবাবু ২০০৭ সালে মালদহের সমাজকল্যাণ আধিকারিক ছিলেন। এখন তিনি ত্রাণ ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দফতরের মন্ত্রী সাবিত্রী মিত্রের আপ্ত সহায়ক। এদিন তিনি বলেন, ‘‘শুধু অনুষ্ঠান করে কিছু হয় না। সমাজের সর্ব স্তরের মানুষের তো এদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। তা হলে এদের কাছে কোনও কিছুই বোঝা মনে হবে না। আমি একটা কাজ দিয়েছিলাম। সেটা হয়ত সহায়ক হয়েছে, কিন্তু মূল লড়াইটা তো উনি করেছেন। ওকে কুর্নিশ জানাই।’’

হরিশ্চন্দ্রপুরের রশিদাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত এলাকা ধরমপুরে আর্জুনা বেওয়ার পরিবারকে বোবা বাড়ি বলেই সবাই চেনেন। পাঁচ ছেলের মধ্যে বড় ও সেজো বাদে প্রত্যেকেই জন্মের পর থেকেই মূক ও বধির। তাঁদের নিয়ে লড়াই যখন তুঙ্গে তখন ২০০৫ সালে মারা যান স্বামী মহম্মদ হোসেন। স্বামী বেঁচে থাকতেই মেয়ে মুস্তকিমার বিয়ে দিয়েছিলেন বিহারের আবাদপুরে। তার প্রথম ছেলে জসীমউদ্দিনও মূক ও বধির। পরে মুস্তকিমার দুই মেয়ে হয়। তাদের কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু মামারা যেহেতু প্রতিবন্ধী, তাই ছেলে হলে ফের প্রতিবন্ধী হবে এই নিয়ে মুস্তকিমার উপরে শুরু হয় অত্যাচার। পরে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে মায়ের অভাবের সংসারে হাজির হন তিনি।

লড়াই আরও বেড়ে যায় আর্জুনা বেওয়ার। অভাবে চার ছেলেকে পড়াতে পারেননি। কিন্তু অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে সহায়িকার কাজ পাওয়ার পর ছোট ছেলেকে পড়ানো শুরু করেন। মূক ও বধির হলেও সাধারণ স্কুল থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে এখন সে চাঁচল কলেজে বিএ পড়ছে। মূক ও বধির নাতি জসিমউদ্দিনও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।

আর্জুনা বেওয়া বলেন, ‘‘প্রত্যর্পনবাবুর জন্যই আজ মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখেছি। আমার বোবা ছোট ছেলে বুধুয়া হোসেন বিএ পড়বে কখনও ভাবিনি। এই কাজটা আগে পেলে অন্য ছেলেদেরকেও পড়াতে পারতাম।’’ জসিম হাত নেড়ে জানায়, এখানে সে খুব আনন্দে রয়েছে। আর মা মুস্তাকিম বলেন, ‘‘মা না থাকলে আমাদের ভেসে যেতে হত।’’

আর্জুনা বেওয়ার লড়াইয়ের কাহিনি শুনেছেন চাঁচলের মহকুমাশাসক জয়ন্ত মন্ডলও। তিনি জানান, প্রশাসন সব সময় এদের পাশে রয়েছে। যাঁরা বিপিএল, তাঁদের ১৮ বছর পার হলে ভাতা দেওয়ারও ব্যবস্থা রয়েছে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy