Advertisement
E-Paper

অন্ধকারে থেকে বাতিঘর শৌভিক

বিদ্যুতের খরচ বাঁচাতে জংধরা টিনের চালের মাটির বাড়িটা সারা বছর কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়ে অন্ধকারে ডুবে থাকত। কিন্তু শুক্রবার সকাল থেকে সেই বাড়িটাতেই যেন জ্বলে উঠল হাজার ওয়াটের আলো। যে আলোয় শুধু ওই বাড়িই নয়, উদ্ভাসিত হয়ে উঠল পড়শির ঘরও। মাধ্যমিকে কার্যত চোখ ধাঁধানো ফল করে এলাকায় হতাশার অন্ধকারে ডুবে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছে বাতিঘর হয়ে উঠেছে সেই আধো অন্ধকার বাড়ির ছেলে শৌভিক ভট্টাচার্য।

অর্ঘ্য ঘোষ

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০১৫ ০২:১৪
মিষ্টিমুখ। শুক্রবার চৌহাট্টা গ্রামে ছবিটি তুলেছেন সোমনাথ মুস্তাফি।

মিষ্টিমুখ। শুক্রবার চৌহাট্টা গ্রামে ছবিটি তুলেছেন সোমনাথ মুস্তাফি।

বিদ্যুতের খরচ বাঁচাতে জংধরা টিনের চালের মাটির বাড়িটা সারা বছর কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়ে অন্ধকারে ডুবে থাকত। কিন্তু শুক্রবার সকাল থেকে সেই বাড়িটাতেই যেন জ্বলে উঠল হাজার ওয়াটের আলো। যে আলোয় শুধু ওই বাড়িই নয়, উদ্ভাসিত হয়ে উঠল পড়শির ঘরও। মাধ্যমিকে কার্যত চোখ ধাঁধানো ফল করে এলাকায় হতাশার অন্ধকারে ডুবে থাকা ছেলেমেয়েদের কাছে বাতিঘর হয়ে উঠেছে সেই আধো অন্ধকার বাড়ির ছেলে শৌভিক ভট্টাচার্য। লাভপুরের চৌহাট্টা পশ্চিমপাড়ায় শৌভিকের বাড়ি ঘিরে তাই বাসিন্দাদের এ দিন উৎসাহের অন্ত ছিল না।

এ বার মাধ্যমিকে শৌভিক ৬৮০ নম্বর পেয়ে রাজ্যে মেধাতালিকার চতুর্থ স্থান দখল করেছে। সেই সঙ্গে সে নতুন রেকর্ড তৈরি করে দিয়েছে স্থানীয় চৌহাট্টা হাইস্কুলের। এমনকী ওই ব্লকেও এর আগে মাধ্যমিকে এক নম্বর কেউ পায়নি বলেই স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি। তাই আগামী প্রজন্মের কাছে শৌভিকের এই রেকর্ড নম্বর প্রাপ্তি ভাল ফল করার ‘টার্গেট’ বেঁধে দিল।

খবরটা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই আলোময় হয়ে উঠেছে অন্ধকারাচ্ছন্ন বাড়িটা। পড়শিদের শুভেচ্ছা জানানোর ভিড় থেকে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার ঝলকানিতে সরগরম হয়ে ওঠে শৌভিকের বাড়ি। বাকরুদ্ধ হয়ে যান বাবা মনোরঞ্জনবাবু এবং মা সমাপ্তিদেবী। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আনন্দেও তাঁরা কেঁদে ফেলেন। তাঁরা জানান, স্বপ্নেও ভাবেননি এই ছেলের জন্য তাঁদের বাড়িতে এত মানুষ ভিড় করবেন, শুভেচ্ছার বন্যা বইয়ে দেবেন।

Advertisement

যৎসামান্য বেতনে একটি চালকলে কাজ করেন মনোরঞ্জনবাবু। সকালে বেড়িয়ে ফিরতে তাঁর রাত গড়িয়ে যায়। নিজে স্নাতক হলেও কাজের চাপে কোনও দিন তিনি ছেলেকে পড়ায় সময় দিতে পারেননি। ছেলের পাশে থেকে মা সমাপ্তিদেবীই উৎসাহ জুগিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু স্নায়ুরোগে তাকেও দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার জন্য কলকাতা ছোটাছুটি করতে হয়। তাতে পড়াশোনার ক্ষতি হয় ছেলের। তাই এ দিন তাঁরা বলেন, ‘‘ছেলে যে ভাল ফল করবে তা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু এত প্রতিকুলতা সত্ত্বেও ও যে এত ভাল ফল করবে বিশ্বাস করতে পাচ্ছি না।’’ একই প্রতিক্রিয়া গ্রামবাসীরও। শৌভিকের পরিবার সম্পর্কে যাঁরা ভাল মতো জানেন, এই ফল জেনে তাঁদেরও চোখ বড়বড় হয়ে গিয়েছে। তাঁরা জানান, রোজগার কম বলে ওই বাড়িতে বিদ্যুতের খরচ কমাতে কম ,সময় আলো জ্বালানো হতো। কিন্তু ওই বাড়ির ছেলে এখন পুরো গ্রামে আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। শৌভিকের নামের সঙ্গে লোকে এই গ্রামের নামও উচ্চারণ করছেন।

প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শৌভিককে পড়িয়েছেন স্থানীয় প্রণবানন্দ ভট্টাচার্য, চৌহাট্টা হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর আলি মির্ধাদের মুখের কথাও একই। তাঁরা বলেন, ‘‘ওই রকম একটি দরিদ্র পরিবার থেকে এমন ফল করে আগামী প্রজন্মের কাছে বাতিঘর হয়ে উঠল শৌভিক।’’ এদিন বিডিও-র প্রতিনিধিও অভিনন্দন জানিয়ে যান শৌভিককে।

আলোর বৃত্তটা অবশ্য শুরু হয়েছিল আগেই। ২০০৯ সালে চতুর্থ শ্রেণির এবং ২০১২ সালে অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিল শান্ত স্বভাবের এই ছেলেটি। এ বারে মাধ্যমিকে তার প্রাপ্ত নম্বর বাংলায় ৯৫, ইংরেজিতে ৯৬, অঙ্কে ১০০, ভৌতবিজ্ঞানে ৯৯, জীবনবিজ্ঞানে ৯৭, ইতিহাসে ৯৭, ভূগোলে ৯৬। তার প্রিয় বিষয় গণিত। গণিত নিয়েই সে পড়াশোনা করে গবেষণা করতে চায়। তার ইংরেজি এবং অঙ্কে প্রাইভেট টিউটর ছিল। দৈনিক ৬-৭ ঘণ্টা সে পড়াশোনা করত। অবসরে সে ছবি আঁকে, গল্পের বই পড়ে আর টিভি দেখে। তার সংযোজন, ‘‘টিভি দেখলে কিংবা গল্পের বই পড়লে পড়াশোনার ক্ষতি হয় না। সব কিছুতেই কোনও না কোনও শিক্ষা হয়। যা পরবর্তী কালে কাজে লাগে।’’

খুশির হাওয়া ছড়িয়ে পড়েছে স্কুলে। সহপাঠী দেবব্রত ঘোষ, শ্রাবন্তী মজুমদাররা জানায়, ‘‘বহু ক্ষেত্রে শৌভিকের সহযোগিতা পেয়েছি। ওর এই দুর্দান্ত ফলে আমরাও তাই খুব খুশি।’’ স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ধুর্জটি চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘শৌভিকের জন্যই আমাদের মতো একটি অখ্যাত স্কুল রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি। স্কুলের পক্ষ থেকে ওকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy