Advertisement
E-Paper

দেখতে ভাল, খরচা আছে

থরে থরে সাজানো ফুলকপি, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি, গাজর, বিনস, বেগুন, টোম্যাটো। কিন্তু দাম শুনে সব্জি হাতে ধরতে দু’বার ভাবতে হচ্ছে। শীতকালীন সব্জির দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্তের কার্যত এমনই দশা। রবিবার পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় ব্যাগ ভরিয়ে যাঁরা বাজার করবেন ভেবেছিলেন তাঁদের অনেকেই শুকনো মুখে আধ ভর্তি ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০১৬ ০১:১৯
দামের আঁচে হাত পুড়লেও হেঁসেল ফাঁকা রাখা চলবে না। বাঁকুড়ায় রবিবারের নিজস্ব চিত্র।

দামের আঁচে হাত পুড়লেও হেঁসেল ফাঁকা রাখা চলবে না। বাঁকুড়ায় রবিবারের নিজস্ব চিত্র।

থরে থরে সাজানো ফুলকপি, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি, গাজর, বিনস, বেগুন, টোম্যাটো। কিন্তু দাম শুনে সব্জি হাতে ধরতে দু’বার ভাবতে হচ্ছে। শীতকালীন সব্জির দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্তের কার্যত এমনই দশা। রবিবার পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় ব্যাগ ভরিয়ে যাঁরা বাজার করবেন ভেবেছিলেন তাঁদের অনেকেই শুকনো মুখে আধ ভর্তি ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।

ক্যালেন্ডারে পৌষ মাস শেষ হতে চলেছে। কিন্তু খোলা বাজারে শীতের সব্জির দাম কমার কোনও লক্ষণই নেই দুই জেলার বিভিন্ন বাজারে। শীতের গোড়ায় অল্প কিছুদিনের জন্য সব্জির দাম কিছুটা কমেছিল। কিন্তু ফের দাম চড়ে গিয়েছে। বিক্রেতাদের আশঙ্কা, মাঘ মাসের শুরুতে আরও বাড়তে পারে শীতের সব্জির দাম। এই পরিস্থিতিতে বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সদর্থক ভূমিকার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ তুলছেন ক্রেতাদের একটা বড় অংশ।

বস্তুত গত বছরেও জানুয়ারির প্রথম, দ্বিতীয় সপ্তাহে শীতের সব্জির দাম ছিল ক্রেতাদের নাগালের মধ্যেই। চলতি বছরেও ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সব্জির দাম সেই অর্থে বাড়েনি। দুই জেলার বিভিন্ন বাজারে নিয়মিত যাওয়া ক্রেতাদের দাবি, ডিসেম্বরের শেষ থেকেই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে সব্জির দাম।

Advertisement

রবিবার ফুলকপি বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকা জোড়া, বাঁধাকপি ছিল ১৫-১৬ টাকা প্রতি কেজি। মটরশুঁটি বিক্রি হয়েছে ৫০-৬০ টাকা কেজি দরে। টোম্যাটোর দাম ছিল কেজিতে ২০ টাকা। আদ্রায় কার্যত নাগালের বাইরে ছিল পেঁয়াজকলি (৮০ টাকা প্রতি কেজি)। একই অবস্থা বেগুনেরও, ২৫-৩০ টাকা কেজি দরে বিকিয়েছে। গাজর উঠেছে ৩০-৪০ টাকা কেজিতে। সব মিলিয়ে রবিবাসরীয় বাজারে সব্জির চড়া দামের আঁচ পোহাতে হয়েছে ক্রেতাদের।

কিন্তু কেন এই অবস্থা? এ ক্ষেত্রে দু’টি ব্যাখ্যা শোনা গিয়েছে বিক্রেতাদের মুখে। প্রথমত পুরুলিয়ায় অগস্ট মাসের পর থেকে টানা সাড়ে পাঁচ মাস ধরে বৃষ্টি নেই। এই জেলায় জলের অভাবে মার খেয়েছিল আমল ধান। এ বার কোপ পড়েছে সব্জি চাষেও। বস্তুত ভাদ্র মাস থেকেই শীতের সব্জির চাষ শুরু করেন চাষিরা। সেই সব্জি উঠেছে কার্তিক মাসে। ফলে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই বাজারে শীতকালীন সব্জি চলে এসেছিল। দামও ছিল নাগালের মধ্যেই।

কিন্তু পরের ধাপে কার্তিক মাসে দ্বিতীয় দফায় এই সব্জি চাষ করতে গিয়ে তীব্র জল সঙ্কটে পড়েন চাষিরা। হুড়া ব্লকের কালিয়াবাসা গ্রামের বড় চাষি হারাধন মাহাতোর কথায়, ‘‘ভাদ্র মাসে ফুলকপি ও বাঁধাকপি মিলিয়ে ২০ হাজার চারা লাগিয়েছিলাম। কার্তিক মাসে ফলন পেয়েছি। কিন্তু তার পরে জলের অভাব শুরু হওয়ায় এ বার মোটে পাঁচ হাজার কপি চারা লাগিয়েছি। কিন্তু সেই চারা বাঁচাতে পারব কি না বেশ সন্দেহ রয়েছে।” একই কথা বলছেন কাশীপুরের কালাঝোর গ্রামের চাষি রাজারাম মাহাতো। তাঁর অভিজ্ঞতা, দ্বিতীয় দফায় শীতের সব্জি লাগানোর পরে জলের অভাবে সে সব গাছ কার্যত মাঠেই শুকিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় জল না পেলে বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে চাষিদের। ফলে জেলার বাজারে স্থানীয় সব্জির জোগান কার্যত নেই বললেই চলে। এখন ভরসা বাঁকুড়া ও ঝাড়খণ্ডের সব্জি।

কিন্তু মাঝখানে রয়ে গিয়েছেন ফড়েরা। ফলে এই পরিস্থিতিতে দাম চড়েই যাচ্ছে। এই অভিযোগের যে সারবত্তা রয়েছে তা বোঝা যায় চাষিদের একাংশের সঙ্গে কথা বলেই। ওন্দা থানার নিকুঞ্জপুর, পিংরুই এলাকার দুই চাষি মিলন লাহা ও সত্য কর্মকাররা জানান, তাঁরা স্থানীয় আড়তে বাঁধাকপি বিক্রি করেছেন ৬ টাকা কেজি দরে, ফুলকপির দাম পেয়েছেন ১২ টাকা প্রতি কেজি। বেগুন বিক্রি করেন ১৫-১৬ টাকা কেজি দরে, মটরশুঁটির দাম পেয়েছেন কেজি প্রতি ৪০ টাকার মতো। অথচ এই সব্জি বাঁকুড়া শহরেরই কোনও কোনও খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে।

ওন্দার স্থানীয় আড়তে গিয়ে চাষিদের কাছ থেকে অনেক কম দামে সরাসরি সব্জি কিনছেন ফড়েরা। আর তাঁদের হাত ঘুরে সব্জি যখন খোলা বাজারে আসছে চড়া দামে। আর বাঁকুড়া থেকে যখন সেই সব্জি আদ্রা, কাশীপুর, হুড়ার বাজারে আসছে স্বভাবতই তখন দাম আরও বাড়ছে। কাশীপুরের সব্জি ব্যবসায়ী মনবোধ টুডু, রঞ্জিত গড়াইদের কথায়, ‘‘স্থানীয় ভাবে সব্জির জোগান নেই। বাঁকুড়া থেকে আসা সব্জির উপরেই ভরসা করতে হচ্ছে। এমনিতেই আড়ত থেকে বেশি দাম দিয়ে সব্জি কিনতে হচ্ছে। ফলে সামান্য লাভ রেখে বাজারে সব্জি বিক্রি করতে গেলেই দাম বাড়ছে।’’

বাঁকুড়া শহরের বাসিন্দা কল্যাণ মুখোপাধ্যায়, অপারাজিত চট্টোপাধ্যায়দের প্রশ্ন, এই জেলাতেই ভাল সব্জি হয়। তাহলে কেন এত দাম, কোনও ব্যাখ্যা তাঁরা পাচ্ছেন না। কাজেই দাম নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ক্রেতারা।

অনাবৃষ্টি ও শীতের চরিত্রগত পরিবর্তনের কারণে সব্জির ফলন কম বলে দাবি করেছেন বাঁকুড়ার উপ কৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) আশিসকুমার বেরা। তিনি দাবি করেছেন, ‘‘প্রয়োজন মতো বৃষ্টি না হওয়ায় এবং এ বছর শীতের চরিত্রগত বদল হওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জেলার শীতকালীন সব্জি চাষে।” অর্থনীতির স্বভাবিক অঙ্ক অনুযায়ী বাজারে চাহিদার তুলনায় জোগান কম হওয়ায় সব্জির এখন উর্ধ্বগামী। কিন্তু রাশ টানবে কেন, প্রশ্ন তা নিয়েই।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy