ছোট মেয়ের বয়স তখন আট কিংবা দশ। স্বামী মারা যাওয়ায় ওই বয়সে বিধবা হয়ে বাপেরবাড়িতে চলে আসতে হয়েছিল তাঁকে। পুজোর এই সময়টা চারপাশে তাঁর বয়সের ছেলেমেয়েরা নতুন নতুন জামাকাপড় পরে যখন ছুটে বেড়াচ্ছে, তখন ঘরের কোণে বসে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। কারণ, উৎসব-অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর উপর নিষেধ রয়েছে। সেই সময় মেয়ের এই দুঃখ ঘোচাতে বাড়িতেই পুজো শুরু করলেন সাঁইথিয়ার প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী রামেশ্বর মণ্ডল। এই পুজো গুটি গুটি পায়ে দেড়শো বছরে পড়ল।
তবে মণ্ডলবাড়ির এই পুজো বর্তমানে সাঁইথিয়ার মনসাতলা পাড়ার ঘোষ বাড়ির পুজো হিসেবে বেশি পরিচিত। দেড়শো বছর উপলক্ষে এ বছর আলোকসজ্জা থেকে সাধারনের জন্য থাকছে বিশেষ ভুরিভোজের ব্যবস্থা রয়েছে।
ঘোষ পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, রামেশ্বরবাবুর দুই মেয়ে। কোনও পুত্র সন্তান ছিল না। বড় মেয়ে ভব সুন্দরী ও ছোট মেয়ে সর্ব সুন্দরী। ঘটা করে দুই মেয়েরই বিয়ে দিয়েছিলেন রামেশ্বরবাবু। কিন্তু বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই ছোট জামাই মারা যায়। তখন রামেশ্বরবাবু ছোট মেয়েকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। মেয়েকে বাড়ি তো আনলেন। কিন্তু বিধির গেরোয় পড়ে পাড়ায় উৎসব-অনুষ্ঠানে ছোট্ট মেয়েটি যোগ দিতে পারছিলেন না। মেয়ের সেই কষ্ট কুরে কুরে খাচ্ছিল রামেশ্বরবাবুকে। তাই অনেক ভাবনা চিন্তা করে ১২৭২ সালে বাড়িতে দুর্গা পুজোর প্রচলন করেন তিনি। পুজোর সমস্ত দায় দায়িত্ব দেওয়া হয় ছোট মেয়ে সর্ব সুন্দরীকেই। সেই পুজোর শুরু। নিজের কোনও পুত্র সন্তান না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও জমি যায়গা দেখভাল করার জন্য বড় মেয়ে ভব সুন্দরী ও জামাই জহুরীলাল ঘোষকেও নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন তিনি। রামেশ্বরবাবু ও সর্ব্ব সুন্দরী দেবীর মৃত্যুর পর পুজোর দায়িত্ব এসে পরে বড় মেয়ে ভব সুন্দরী ও একমাত্র ছেলে শ্যামাপদ ঘোষের উপর।
শ্যামাপদবাবুর জমানায় ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। তাঁর প্রতিপত্তিতে পুজো আরও জাঁকজমক হয়। কার্যত তখন থেকেই ঘোষ পরিবারের পুজোতে পরিণত হয় মণ্ডল বাড়ির পুজো। তাঁর ছোট ছেলে তথা পরিবারের প্রবীণ সদস্য বই ব্যবসায়ী অজয় ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা সাধনাদেবীরা পুজো প্রতিষ্ঠার এই ইতিকথা শোনান। অজয়বাবু বলেন, ‘‘আমরা দুই ভাই। কিছুদিন হল দাদা মারা গিয়েছেন। দাদার ছেলে জয়ন্ত, মা, সপরিবারে মুম্বইয়ে থাকে। তবে পুজোর সময় দাদা ও তিন দিদির পরিবারের সকলে এই বাড়িতে হাজির হয়। পুজোর কটাদিন বেশ আনন্দে কাটে।’’
সাধনাদেবীর কথায়, ‘‘সেই কবে বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এসেছি। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত পুজোতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাইতেই পারি না।’’ তিনি জানান, এ বার পুজো তিনদিন হলেও বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে তাঁদের পুজো চার দিন হবে।