Advertisement
E-Paper

দীপালি-ঐতিহ্য দেখছে সোনামুখী

অন্তঃসত্ত্বা বধূর পেটে লাথি মারায় অভিযুক্ত তৃণমূল নেত্রী পুতুল গড়াইকে পুলিশ শুক্রবারেও ধরতে পারল না। অথচ, হামলার পরে কেটে গেল ছ’টা দিন।

রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০১৬ ০২:৪৬
(বাঁ দিক থেকে) তৃণমূল নেত্রী পুতুল গড়াইয়ের খোঁজে যাওয়া হয়েছিলে তাঁর নীলবাড়ি ও লালবাজারের বাড়িতে। কিন্তু কোথাও তাঁর হদিস দিতে পারেননি কেউ। শুক্রবার শুভ্র মিত্রের তোলা ছবি।

(বাঁ দিক থেকে) তৃণমূল নেত্রী পুতুল গড়াইয়ের খোঁজে যাওয়া হয়েছিলে তাঁর নীলবাড়ি ও লালবাজারের বাড়িতে। কিন্তু কোথাও তাঁর হদিস দিতে পারেননি কেউ। শুক্রবার শুভ্র মিত্রের তোলা ছবি।

অন্তঃসত্ত্বা বধূর পেটে লাথি মারায় অভিযুক্ত তৃণমূল নেত্রী পুতুল গড়াইকে পুলিশ শুক্রবারেও ধরতে পারল না। অথচ, হামলার পরে কেটে গেল ছ’টা দিন। ঘটনাক্রম সোনামুখীর বাসিন্দাদের একটা বড় অংশকে মনে করিয়ে দিচ্ছে পুতুলের ‘নেত্রী’ তথা সোনামুখীর তৃণমূল বিধায়ক দীপালি সাহার ‘কাণ্ডে’র কথা।

বছর দেড়েক আগে সোনামুখীতে লোকসভা ভোট চলাকালীন বুথে ঢুকে ভোট-কর্মীদের মারধরে অভিযুক্ত বিধায়ক দীপালি সাহাকেও পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশ তাঁকে ‘পলাতক’ বলে দিনের পর দিন জানিয়ে গেলেও তিনি এলাকাতেই ছিলেন বলে দলেরই একাংশ দাবি করে আসছিল। এ ক্ষেত্রে তেমনটাই হচ্ছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের একাংশ।

শুক্রবার সোনামুখীর নীলবাড়ি এলাকায় পুতুলদেবীর নাম করে তাঁর বাড়িতে ডাকাডাকি করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। লালবাজারে তাঁর আর এক বাড়ির দরজায় বাইরে থেকে শিকল তোলা ছিল। পুলিশ দাবি করে, ঘটনার পর থেকেই তিনি এলাকায় নেই। যদিও ঘটনার (রবিবার) দু’দিন পরে বুধবার ‘আনন্দবাজার’কে তিনি ফোনে জানিয়েছিলেন, অসুস্থতার জন্য বাড়িতেই রয়েছেন।

Advertisement

এলাকায় দীপালিদেবীর বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর নেতা হিসেবে পরিচিত সোনামুখীর তৃণমূল পুরপ্রধান সুরজিৎ মুখোপাধ্যায়ের অনুগামীদের একাংশ পুতুলের গ্রেফতার না হওয়ার পিছনে দলেরই কিছু নেতার মদত দেখতে পাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, দলেরই একাংশের চাপে পুলিশ হাত গুটিয়ে বসে আছে। যদিও সুরজিৎবাবু নিজে দাবি করছেন, “আমাদের দলের মহিলা নেত্রীরা এই ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত হওয়ায় বিষয়টিকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচারের হাতিয়ার বানিয়েছে সিপিএম। অভিযুক্তেরা গ্রেফতার হলে সরকার নিরপেক্ষ বলে প্রমাণিত হবে। তাই সিপিএম পুলিশকে প্ররোচনা দিয়ে পুতুলের গ্রেফতারি আটকে রেখেছে।”

ঘটনা হল, বৃহস্পতিবার বাঁকুড়া জেলা মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী শম্পা দরিপা জানিয়েছিলেন, এলাকার মানুষ থেকে সংগঠনের নেতৃত্ব— সবার সঙ্গে আলোচনা করে পুতুলকে সোনামুখী শহর মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে কথা মনে করিয়ে শাসক দলকে বিঁধতে ছাড়েননি বিরোধীরা।

সিপিএমের জেলা সম্পাদক অজিত পতির দাবি, ‘‘পুতুল দীপালিদেবীর লেঠেল-বাহিনীর অন্যতম সদস্য। সামনেই বিধানসভা ভোট। এলাকায় সন্ত্রাস করবে শাসকদল। তাই ভোটের আগে কোনও ভাবেই তৃণমূল পুতুলকে গ্রেফতার করতে দেবে না। এটা সবার কাছেই পরিষ্কার।’’ পুলিশের অবশ্য দাবি, পুতুল এলাকায় নেই। জেলার পুলিশ সুপার নীলকান্ত সুধীর কুমার জানান, অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর থেকেই তাঁর খোঁজ চলছে।

পুতুল গড়াইকে অবশ্য বৃহস্পতিবার থেকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। লালবাজারে তাঁর বাড়িতে খোঁজ করতে এক জন নিজেকে আত্মীয় বলে দাবি করে জানান পুতুল বাড়িতে নেই। নীলবাড়ি বাইপাস এলাকায় ওই তৃণমূল নেত্রীর আর এক বাড়িতে ডাকাডাকি করে কারও সাড়া পাওয়া যায়নি।

রবিবার সুরজিৎবাবুর ঘনিষ্ঠ সোনামুখী পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নিসার আলম আনসারির বাড়িতে জনা ৩৫ মহিলা নিয়ে গিয়ে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে পুতুলের বিরুদ্ধে। বছর খানেক আগে স্থানীয় রুকসানা খাতুনের সঙ্গে বিয়ে হয় নিসারের। বিয়ের কয়েক মাস পরেই নিসারের বিরুদ্ধে বধূ নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। সেই মামলায় জেল খেটে সম্প্রতি মুক্ত হন নিসার। রবিবার বিয়েতে পাওয়া যৌতুক ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতেই রুকসানার আত্মীয়দের হয়ে পুতুল নিসারের বাড়িতে চড়াও হন বলে অভিযোগ।

সেই সময় বারিতে নিসারের মা সাবিনা বেগম, দিদি সাহানা বেগম ও বৌদি নাজিয়া বেগম উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের দাবি, পুতুলের নেতৃত্বে মহিলারা বাড়িতে ঢুকেই জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। বাধা দিতে গেলে সাবিনা বেগমকে মারধর করা হয়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাত চিরে দেওয়া হয়। নিসারের অন্তঃসত্ত্বা দিদি সাহানা বেগমের পেটে লাথি মারা হয়। অস্ত্রের কোপ মারা হয় তাঁর হাতেও। এরপর সাবিনাকে বাড়ি থেকে টানতে টানতে রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়।

দাম্পত্য সমস্যা মেটাতে তাঁরা খোদ বিধায়ক দীপালিদেবীর দ্বারস্থ হয়েছিলেন বলে মেনে নিচ্ছেন রুকসানার দাদা সাদ্দাম হোসেন। সাদ্দাম এ দিন নিসারের বিরুদ্ধে তাঁর বোনকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, “জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে নিসার রাস্তাঘাটে অপদস্থ করছিল আমার বোনকে। তাকে ভয় দেখাত। সে সব যাতে বন্ধ হয়, তাই বিধায়ককে বলেছিলাম।”

পুলিশের কাছে কেন গেলেন না? সাদ্দামের জবাব, “হয়রান হতে হবে ভেবেই যাইনি।” দীপালিদেবী অবশ্য পুরো ঘটনায় পুতুলের পক্ষে সওয়াল করে বলেন, “শান্তিপূর্ণ আলোচনা করতেই পুতুল ওখানে গিয়েছিল। হামলা চালানোর মতো মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হল ওকে।” যদিও বুধবার পুতুল নিজে দাবি করেছিলেন, তিনি অসুস্থ হওয়ায় বাড়ির বাইরেই বেরোতে পারছেন না।

তাঁর সঙ্গে পুতুলের অধরা থাকার সাদৃশ্য প্রসঙ্গেও মুখ খুলেছেন বিধায়ক। দীপালিদেবীর কথায়, ‘‘আমাদের দু’জনের বিরুদ্ধেই মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে। সাদৃশ্য এখানেই। আর ফারাকটা হল, ভোট-পর্বের ঘটনায় আমি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছি। পুতুল কী করবে বলতে পারব না।’’

তবে বিধায়ক পুতুলের হয়ে সওয়াল করলেও ওই ঘটনায় সাধারণ মানুষের সহানুভূতি যে সাবিনারাই পেয়েছেন, সে ইঙ্গিত এ দিন এলাকায় গিয়ে পাওয়া গিয়েছে। সাবিনা বেগমের পড়শিদের ক্ষোভ, ‘‘বাড়িতে ঢুকে রাজনৈতিক দলের হামলা এই শহরে আগে ঘটেনি। এই ঘটনায় আমরা সবাই আতঙ্কিত।”

বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, রাজনৈতিক গোলমালের জেরে সোনামুখী শহরে মারধর মাঝেমধ্যেই হয়। অনেক বছর আগে রাজনৈতিক খুনও হয়েছে। কিন্তু কখনও সাধারণ গৃহস্থের বাড়িতে ঢুকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অন্তঃসত্ত্বা মহিলার পেটে লাথি মারার মতো অভিযোগ এ শহর শোনেনি। এলাকার প্রবীণ সিপিএম নেতা তথা সোনামুখীর প্রাক্তন পুরপ্রধান কুশল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “এই সংস্কৃতি সোনামুখীতে ছিল না।”

খোদ সাহানার কথায়, ‘‘দরজায় কেউ টোকা দিলেও এখন বুকটা কেঁপে উঠছে!’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy