Advertisement
E-Paper

‘আমরা-ওরা’র বিভেদ মোছাল ত্রাণ শিবির

দু’দিন আগেই তাঁরা কপাল চাপড়ে বলছিলেন, সিপিএমের লোক এসে সব্বোনাশ করে গিয়েছে। শুক্রবার সিপিএমের উদ্যোগে খোলা ত্রাণ শিবিরে গিয়ে অবশ্য দেখা গেল, তাঁরাই পাত পেড়ে খিচুড়ি, লাবড়া খাচ্ছেন। আর বলছেন, ‘‘আমরা কেউ সরাসরি রাজনীতি করি না। ভেদাভেদ নেই গ্রামে। বাইরের কিছু লোক এসে তাণ্ডব করে গেল। এখন সকলেই ঘরহারা।’’

নির্মল বসু

শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০১৬ ০৪:১৯
দু’বেলা পাত পেড়ে চলছে খাওয়া-দাওয়া। পরিবেশনের কাজে হাত লাগিয়েছেন বাদুড়িয়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তথা সিপিএম নেত্রী সোমা আড়তদারও।—নিজস্ব চিত্র।

দু’বেলা পাত পেড়ে চলছে খাওয়া-দাওয়া। পরিবেশনের কাজে হাত লাগিয়েছেন বাদুড়িয়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তথা সিপিএম নেত্রী সোমা আড়তদারও।—নিজস্ব চিত্র।

দু’দিন আগেই তাঁরা কপাল চাপড়ে বলছিলেন, সিপিএমের লোক এসে সব্বোনাশ করে গিয়েছে। শুক্রবার সিপিএমের উদ্যোগে খোলা ত্রাণ শিবিরে গিয়ে অবশ্য দেখা গেল, তাঁরাই পাত পেড়ে খিচুড়ি, লাবড়া খাচ্ছেন। আর বলছেন, ‘‘আমরা কেউ সরাসরি রাজনীতি করি না। ভেদাভেদ নেই গ্রামে। বাইরের কিছু লোক এসে তাণ্ডব করে গেল। এখন সকলেই ঘরহারা।’’

ভোটের ফল বেরনোর পরে যাতে হিংসা না ছড়ায়, সে জন্য হাওড়ার কুমারিয়া গ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের মানুষ একজোট হয়েছিলেন। সন্ত্রাস এড়ানোও গিয়েছে। কিন্তু শান্তি বজায় রাখার সেই বার্তা রাজ্য জুড়ে ভোট পরবর্তী হিংসায় রেশ টেনেছে, এমন বলা চলে না। ঘরবাড়ি পোড়ানো, বোমা-গুলি, মারধরের সাক্ষী থেকেছে রাজ্যের নানা প্রান্ত। তারই মধ্যে ভিন্ন বার্তাও মিলছে কিছু কিছু।

যেমন বসিরহাট। এখানে রাজনৈতিক হিংসা রোখা না গেলেও ঘরহারা সিপিএম-তৃণমূলের লোকজন ঠাঁই নিয়েছেন একই ত্রাণ শিবিরে। সিপিএমের স্থানীয় নেতৃত্বের উদ্যোগে যেখানে পাত পেড়ে দু’বেলা খাওয়া-দাওয়া করছেন তৃণমূল সমর্থকেরাও।

Advertisement

বুধবার দুপুরে বসিরহাট ২ ব্লকের পানিগোবরা গ্রামে সিপিএম-তৃণমূল সংঘর্ষের জেরে খান তিরিশ ঘর পুড়েছে। ভাঙচুর চলেছে আরও বেশ কিছু বাড়িতে। ঘরছাড়া দু’দলের কয়েকশো মানুষ। মহকুমা প্রশাসনের তরফে চাল, ত্রিপল, জামাকাপড়, শিশুখাদ্য, শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের তরফে। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ উঠছে।

এই পরিস্থিতিতে পাশের বাদুড়িয়া ব্লকের রাজবে়ড়িয়ায় সিপিএমের উদ্যোগে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে খোলা হয়েছে ত্রাণ শিবির। ঘরহারা মানুষজনের বক্তব্য, ‘‘প্রশাসন ত্রিপল দিয়েছে। কিন্তু সে সব টাঙান হবে কী করে? ঘরদোর সব পুড়ে খাক।’’ চাল দিলেও রেঁধে খাওয়ার মতো বাসনকোসন অবশিষ্ট নেই বলে জানালেন সাবিনা বিবি, তুহিনা বিবিরা। সে জন্যই বাধ্য হয়ে তাঁরা বাদুড়িয়া এসে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানালেন। এসমাতারা খাতুন দশম শ্রেণিতে পড়ে। আশ্রয় নিয়েছে ত্রাণ শিবিরে। চোখের জল মুছে ওই কিশোরী বলে, ‘‘রাজনীতি বুঝি না। গাঁয়ে সকলে এক সঙ্গে মিলেমিশে থাকতাম। হঠাৎ কী ঘটে গেল। বাইরের দুষ্কৃতীরা এসে আগুন ধরিয়ে দিল বাড়িতে। বইখাতা, সাইকেল— সব পুড়ে গিয়েছে।’’

ত্রাণ শিবিরের মূল উদ্যোক্তা বাদুড়িয়া পঞ্চায়েত সমিতির শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ আবদুল খালেক। সমিতির সভাপতি তথা সিপিএম নেত্রী সোমা আড়তদার জানালেন, বুধবারের ঘটনার পর থেকেই বহু মানুষ তাঁদের এলাকায় আসতে শুরু করেন। এখানে সকলকে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করা হয় পঞ্চায়েত সমিতির উদ্যোগে। যাঁরা এসেছেন, তাঁদের মধ্যে সব দলের লোক আছেন। সকলেই দুর্গত। ত্রাণ শিবিরে রাজনীতির রঙ দেখা হচ্ছে না। স্থানীয় সিপিএমের দাবি, ত্রাণশিবিরের খরচ দিচ্ছেন গ্রামের মানুষই।

পানিগোবরায় একটি পুলিশ ক্যাম্প খোলা হলেও সরকারি তরফে শুক্রবার পর্যন্ত কোনও ত্রাণশিবির খোলা হয়নি। সোমাদেবী বলেন, ‘‘ব্লক বা মহকুমা প্রশাসনের তরফে পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা না হওয়ার ফলেই অনেকে আশ্রয় নিচ্ছেন তাঁদের এলাকায়। সোমাদেবীর দাবি, শুরুতে আরও বেশি লোক এলেও এখন অন্তত শ’খানেক লোক স্থানীয় অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়ে তাঁদের কাছে খাওয়া-দাওয়া সারছেন। শিশুখাদ্যেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাদুড়িয়ার বিডিও এবং ওসি এ দিনই ত্রাণ শিবির ঘুরে দেখেন।

সিপিএমের উদ্যোগে ত্রাণ শিবির খোলার ব্যাপারটা অবশ্য ভাল চোখে দেখছে না শাসক দল। তৃণমূলের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, ‘‘কোনও দলের পক্ষ থেকে ত্রাণ শিবির খোলা হলে সরকার সাহায্য করতে বাধ্য নয়। প্রশাসনের তরফে এলাকায় ত্রাণের সব রকম ব্যবস্থা করা হয়েছে।’’ সিপিএম এক গ্রামের ঘটনা অন্য গ্রামে টেনে নিয়ে গিয়ে যদি গণ্ডগোল বাধিয়ে ‘মাতব্বরি’ করতে চায়, তবে তা সহ্য করা হবে না বলেও মন্তব্য তাঁর।

তৃণমূলের আক্রমণে বসিরহাটের পানিগোবরায় তাঁদের দলের প্রায় শ’তিনেক কর্মী-সমর্থক গৃহহারা হয়েছেন বলে এ দিনই দাবি করেছেন সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য নেপালদেব ভট্টাচার্য। বারাসতে জেলা পার্টি অফিসে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে তিনি জানান, দুর্গতদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য ২ কোটি টাকা দরকার। ১২ জুন উত্তর ২৪ পরগনায় ত্রাণ সংগ্রহ কর্মসূচিতে নামছেন তাঁরা। কংগ্রেসকে আহ্বান জানানো হবে সেই কর্মসূচিতে সামিল হওয়ার জন্য।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy