সরকার বদলেছে। এ বার রাজ্যে ভয়মুক্ত শিল্পের পরিবেশ তৈরি হবে! রাজ্য তথা দেশের শিল্পপতিদের পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের আহ্বান জানালেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে এ-ও জানান,পশ্চিমবঙ্গে শিল্প করতে গেলে কোনও রাজনৈতিক দলকে টাকা দিতে হবে না। তাঁর বক্তৃতায় উঠে এসেছে টলিউডের ‘অচলাবস্থার’ কথা। পাশাপাশি, নাম না-করে ‘শিল্পপতি’ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কেও খোঁচা দিয়েছেন শমীক।
মঙ্গলবার একটি বণিকসভার (বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি) অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন শমীক। সেই অনুষ্ঠানে যেমন ছিলেন শিল্পপতিরা, তেমন ছিলেন টলিউডের কলাকুশলীরাও। সেই সভায় শমীকের বক্তৃতায় উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের ‘দুরবস্থার’ কথা। রাজ্য বিজেপির সভাপতির মতে, ‘‘এখানে মেধার বিকাশের কোনও সুযোগ নেই।’’ পূর্বতন সরকারের আমলে রাজ্যে শিল্পের কী অবস্থা হয়েছে, তার উদাহরণ তুলে ধরেন শমীক। তৃণমূল সরকারের আমলে ফি বছরই পশ্চিমবঙ্গে ‘গ্লোবাল বিজ়নেস সামিট’-এর আয়োজন করা হত। সেই অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের পাশাপাশি রাজ্যের অনেক শিল্পপতিও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মঞ্চে থাকতেন। সেই প্রসঙ্গে টেনে শমীক বলেন, ‘‘যাঁরা বিবৃতি দিতেন, তাঁদের ১০ বছরের ব্যালেন্স সিটগুলি খুলে দেখুন। প্রায় সকলেই তাঁদের মূলধন অন্য রাজ্যে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পপতিদের জন্য নতুন গন্তব্য হয়ে গিয়েছে উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ।’’
পূর্বতন সরকারে জমিনীতিরও সমালোচনা করেছেন শমীক। জমি অধিগ্রহণের নীতি বদলের পক্ষেও সওয়াল করেন তিনি। আশ্বস্ত করেন, নতুন সরকার নতুন ভাবে সব কিছু ভাবছে। রাজ্যে শিল্প আসার পথে যে যে বাধা, প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর হবে। জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে পঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানায় যে পন্থা নেওয়া হয়, পশ্চিমবঙ্গে তা চালু হবে। তার পরেই শিল্পপতিদের বার্তা, ‘‘আপনারা এখানে নির্ভয়ে বিনিয়োগ করুন। কোম্পানি তৈরি করুন। পশ্চিমবঙ্গে বড় শিল্প আনতে হবে। আমরা নতুন জমি নীতি নিয়ে আসব। আগামী দিনে কেউ এখানে কোনও ফ্যাক্টরি করতে গেলে কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মী আপনাদের কাছে টাকা চাইতে আসবে না।’’ শমীক আরও বলেন, ‘‘ভারতের বহু বিনিয়োগকারী পশ্চিমবঙ্গে আসছেন। কোনও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না।’’ শিল্প নিয়ে বিজেপির যে ‘সংকল্প’ ছিল, তা পূরণ হবে বলেও আশ্বাস দেন শমীক। তাঁর বার্তা, শিল্প বা কারখানা তৈরি করতে কেউ যদি কোনও বাধার সৃষ্টি করেন, তবে সরাসরি পুলিশকে জানান।
তবে শমীক এ-ও মনে করিয়ে দেন, এই রাজ্যে যে সরকার তৈরি হয়েছে, সেটা পশ্চিমবঙ্গের সরকার হবে, বিজেপির নয়। রাজনৈতিক দল এবং সরকারে মধ্যে ফারাক স্পষ্ট করতে হবে বলেও দাবি রাজ্য বিজেপি সভাপতির। তাঁর কথায়, ‘‘অতীতে দল এবং সরকারের মধ্যে যে সূক্ষ্ম বিভাজন রেখাটা ছিল, সেটা মুছে গিয়েছে। তবে ওই রেখাটা আমরা আরও চওড়া করার চেষ্টা করছি।’’
আরও পড়ুন:
শমীকের স্পষ্ট বার্তা, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে দাঁড়িয়ে এ রাজ্যের জন্য বিনিয়োগ হোক। কোনও বিনিয়োগের ঘোষণার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে ২০২৩ সালে মমতার স্পেন সফরকে খোঁচা দিয়েছেন শমীক। তাঁর খোঁচা, ‘‘আমি চাই না, স্পেনে দাঁড়িয়ে কেউ পশ্চিমবঙ্গে শিল্প কারখানা তৈরি করুক। পশ্চিমবঙ্গে দাঁড়িয়ে এখানকার মাটিতে বিনিয়োগ হোক।’’
শমীকের নিশানায় সৌরভও। তবে ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটারের নাম নেননি রাজ্য বিজেপির সভাপতি। তাঁর কথায়, ‘‘আমি এক ভদ্রলোককে চিনতাম। আমরা জানতাম উনি স্টেপ আউট মেরে ওভার বাউন্ডারি মারতেন। তার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। আমরা দেখলাম তিনি বাউন্ডারির বাইরে থেকে বল থ্রো করছেন। স্পেন থেকে ঘোষণা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের। কোনও মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না।’’
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে মমতার স্পেন সফরে সঙ্গী ছিলেন সৌরভও। মাদ্রিদের বাণিজ্য সম্মেলনের মঞ্চ থেকে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, শালবনিতে নতুন করে ইস্পাত কারখানা গড়ে উঠবে। অনেকের মতে, শমীক সেই ঘোষণাকেই কটাক্ষ করেছেন। তিনিও এ-ও জানান, চলচ্চিত্র জগতে রাজনীতির ‘দখলদারি’ বন্ধ হবে। সিনেমা তৈরি বা তার প্রদর্শনে কোনও বাধা থাকবে না বলেই আশ্বাস শমীকের। শিল্পপতিদের উদ্দেশে শমীকের আহ্বান, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ান। কেন্দ্রীয় সরকার আপনাদের পাশে আছে। আপনারা স্বাধীন। স্বাধীন ভাবে ব্যবসা করুন।’’