এমনই এক সেপ্টেম্বরে ঘটেছিল ঘটনাটা। টাটার কারখানার জন্য অধিগৃহীত জমির ক্ষতিপূরণের চেক বিলির প্রতিবাদ করতে সিঙ্গুরে বিডিও দফতরে হাজির হয়ে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্না তুলতে পুলিশ দিয়ে টেনেহিঁচড়ে বার করে দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন বিরোধী নেত্রীকে। সিঙ্গুরে হেনস্থার শিকার হয়ে রাতেই কলকাতা ময়দানে গাঁধীমূর্তির নীচে বসে পড়েছিলেন তিনি। রাতেই একে একে হাজির হয়েছিলেন মানস ভুঁইয়া, প্রদীপ ভট্টাচার্য, সোমেন মিত্র, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিরা। প্রথম পৌঁছনো তদানীন্তন কংগ্রেস পরিষদীয় দলের নেতা মানসবাবুর হাত ধরে হাপুস নয়নে কেঁদে তৃণমূল নেত্রীকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘‘এই বাংলায় আর থাকব না মানসদা!’’
নয় নয় করে ৯টি শরৎ পেরিয়ে সেই বাংলারই মসনদে এখন তৃণমূল নেত্রী। আর সেই গাঁধীমূর্তির নীচে অনশনে বসে আছেন মানসবাবু! অদৃষ্টের এমনই পরিহাস, মমতার পুলিশ-প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব ও রাজ্য জুড়ে নৈরাজ্যের প্রতিবাদে সত্যাগ্রহের পথ বেছে নিতে হয়েছে বর্ষীয়ান বিধায়ক মানসবাবুকে। কিন্তু তাঁর অনশন পঞ্চম দিনে পড়ার পরেও মমতা সরকারের তরফে কোনও হেলদোল নেই! কোনও মন্ত্রী দূরে থাক, প্রশাসনের শীর্ষ স্থানীয় আমলারাও কেউ খোঁজ নেননি। এই অবস্থায় রবিবার অনশনরত বিধায়কের কাছে চেন্নাই থেকে ফোন এসেছিল রাজ্যের প্রাক্তন রাজ্যপাল এবং গাঁধীজির দৌহিত্র গোপালকৃষ্ণ গাঁধীর। তাঁর দাবি নিয়ে জনমানসে সচেতনতা তৈরি করা গিয়েছে এবং প্রতিবাদও নথিভুক্ত হয়েছে— এই যুক্তি দেখিয়ে অনশন তুলে নেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন গোপালকৃষ্ণ। আর সুযোগ পেয়ে মানসবাবু প্রাক্তন রাজ্যপালকে শুনিয়ে দিয়েছেন, ‘‘আপনি যে মমতাকে চিনতেন, সেই মমতা আর নেই! নিজেদের এই হাতে ধরে তাঁকে রাজ্যে ক্ষমতায় এনেছিলাম ভাবতে এখন লজ্জা হয়!’’
ধর্মতলায় সিঙ্গুর-প্রশ্নেই মমতার ২৬ দিন অনশনের সময়ে রাজভবন থেকে সক্রিয় হয়েছিলেন গোপালকৃষ্ণ। মানবিক কারণে আবার তাঁকে তৎপর হতে হয়েছে ৯ বছর পরে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মানসবাবু কি অনশন প্রত্যাহার করে নেবেন? তিনি নিজে বলছেন, ‘‘এই অন্যায়ের শেষ দেখে ছাড়ব!’’ কিন্তু তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে কংগ্রেস নেতারা উদ্বিগ্ন। অনশন-মঞ্চে বসেই দিনভর প্রদীপবাবু, আব্দুল মান্নান, অমিতাভ চক্রবর্তী, অজয় ঘোষ, খালেদ এবাদুল্লারা তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়েই আলোচনা চালিয়েছেন। বিধানসভা খুললে আজ, সোমবার দলের বিধায়কেরা সেখানে সরব হবেন। যুব কংগ্রেসের ‘ধর্মতলা চলো’র পরে তাদের মিছিলও গাঁধীমূর্তিতে আসতে পারে সংহতি জানাতে। কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধীর তরফেও দূত মারফত বার্তা এসে পৌঁছতে পারে মানসবাবুর মঞ্চে। এমন ঘটনাবহুল দিনের জন্য সবং থেকে আজ ময়দানে হাজির থাকার কথা নিহত কৃষ্ণপ্রসাদ জানা ও ধৃত সৌমেন গঙ্গোপাধ্যায়-সহ অন্যান্য ছাত্র পরিষদের কর্মীদের বাবা ও পরিজনেদের।
মানসবাবুর মঞ্চ থেকে অল্প দূরে ধর্মতলায় অনশনরত ‘বিদ্যুতের মাসুল বৃদ্ধি বিরোধী গণ-আন্দোলনে’র প্রতিও একই রকম নির্লিপ্তি দেখিয়েছে রাজ্য সরকার। প্রসেনজিৎ বসুরা তাই ঠিক করেছেন, অনশন চালিয়ে আর লাভ নেই। বদলে অ্যাম্বুল্যান্সে চেপেই তাঁরা আজ যাবেন বিদ্যুৎমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। পুলিশ বাধা দিলে যা হবে, দেখা যাবে! দুই অনশন কর্মসূচি ঘিরে আজ সরগরম হবে রাজনীতি!
ভ্রম সংশোধন: রবিবার আটের পাতায় ‘অবিচল মানস, অনশন তুলতে আর্জি অধীরের’ শীর্ষক প্রতিবেদনের ছবিতে রাষ্ট্রপতি-পুত্রের নাম অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের পরিবর্তে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় লেখা হয়েছে। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।