Advertisement
E-Paper

নদী গিলবেই, আতঙ্কের প্রহর গোনে ঘোড়ামারা

ছলাৎ ছলাৎ শুনলেই ভয় হয়। ভীষণ ভয়। কবিতায়, গল্পে যতই ব্যঞ্জনা থাকুক, ওই শব্দে ভয় পায় গোটা দ্বীপের আট থেকে আশি। ছোটরা খেলতে খেলতে দেখে নেয় কতটা এগিয়ে এল। আর বড়রা ঠিক করে নেয়, কাকে কতটা পিছোতে হবে। জল এগোচ্ছে, মানুষ পিছোচ্ছে! সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপে এ ভাবেই বৃত্তটা ছোট হচ্ছে রোজ।

সুকান্ত সরকার

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০১৬ ০২:৫৮
সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপ। সুব্রত চক্রবর্তীর তোলা ছবি।

সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপ। সুব্রত চক্রবর্তীর তোলা ছবি।

ছলাৎ ছলাৎ শুনলেই ভয় হয়। ভীষণ ভয়। কবিতায়, গল্পে যতই ব্যঞ্জনা থাকুক, ওই শব্দে ভয় পায় গোটা দ্বীপের আট থেকে আশি।

ছোটরা খেলতে খেলতে দেখে নেয় কতটা এগিয়ে এল। আর বড়রা ঠিক করে নেয়, কাকে কতটা পিছোতে হবে। জল এগোচ্ছে, মানুষ পিছোচ্ছে! সুন্দরবনের ঘোড়ামারা দ্বীপে এ ভাবেই বৃত্তটা ছোট হচ্ছে রোজ।

ধান আর পান। দুইয়ের জন্যই বিখ্যাত এই দ্বীপ। ‘‘দুধের সর চাল ও মিঠেপাতি পান চাষের জন্য গোটা সুন্দরবনে এই দ্বীপের নামডাক,’’ বেশ গর্বের সঙ্গেই বললেন বছর তিপ্পান্নর অজয় পাত্র। নিজে দশ বছর এই ঘোড়ামারার পঞ্চায়েত-প্রধান ছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু নিয়ে আমাদের দ্বীপ বেশ সম্পন্ন। কিন্তু আর কত দিন? তার পর লোহাচরার দশাই হবে।’’ ঘোড়ামারার দক্ষিণে ছিল লোহাচরা। নদী গিলে খেয়েছে। একটু একটু করে পুরো দ্বীপটা জলের তলায় চলে গিয়েছে। এখন কাকদ্বীপের ৮ নম্বর লটের ৪ নম্বর ঘাট থেকে লঞ্চে করে সাগরদ্বীপ যাওয়া-আসার পথে অনেকেই সাগর আর ঘোড়ামারার মাঝে বিস্তীর্ণ জলের দিকে হাত দেখিয়ে বলে ওঠেন, ‘ওই যে ওই-ওইখানটায় আমাদের ঘর ছিল।’

লোহাচরার নিয়তি ডাকছে ঘোড়ামারাকে। হা হা করে ছুটে আসছে জল। সাফ হয়ে গিয়েছে দ্বীপের নব্বই ভাগ। অজয় বললেন, ‘‘ভূমি দফতরের রেকর্ড বলছে, দ্বীপের আয়তন ছিল ২৯ হাজার বিঘে। এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ হাজার বিঘেতে।’’

বছরভর পাড় ভাঙছে। বর্ষার তিন মাস তো বাঁধ ভেঙে জল ঢুকে পড়ে দ্বীপের একেবারে মধ্যিখানে। আগে ঢুকে পড়া জল স্লুইস গেট দিয়ে বার করে দেওয়া হতো। স্লুইস গেট ছিল মাইতিপাড়ায়, চুনপুড়িতে। বছর তিনেক আগে জলের তোড়ে স্লুইস গেট-ই ভেঙে গিয়েছে। এখন জল বার করা যায় না। গিরিপাড়া, রায়পাড়া, বৈষ্ণবপাড়া, পাত্রপাড়া, খাসিমারার বেশির ভাগটা জলের তলায়। চুনপুড়ির পূর্বপাড়া, হাটখোলা জলের তলায় গেল বলে!

মুক্তারুন বিবির বাড়ির উপর দিয়ে এখন জাহাজ যায়। সেই জাহাজের তলায় গিয়েছে মুক্তারুন, শেখ আবদুল বারেক, কোহিনুর বিবি, আবদুল রোপদের ঘর-বাড়ি, জমি-জিরেত। বাঁধের পাশে দাঁড়িয়ে মুড়িগঙ্গার দিকে আঙুল তুলে মুক্তারুন বলেন, ‘‘বাড়ি ছাড়া ৬ বিঘে জমি, ৩টে পুকুর, ফলের বাগান ছিল। সব নদীতে গিয়েছে।’’ ১৫ বিঘে জমি নদীতে যাওয়ার পরে ৫ কাঠা জমি কিনে ঘর বেঁধেছেন আবদুল রোপ। কিন্তু নদী এতটাই এগিয়ে এসেছে যে এখন ঘরের পাশে বাঁধ দিতে হয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবদুল বলেন, ‘‘বড় জোর দু’বছর। তার পর আর এ দ্বীপের চিহ্ন থাকবে না।’’

গ্রামে রয়েছে বারোশো পরিবার। সব মিলিয়ে হাজার পাঁচেক মানুষের বাস। ভোটার সাড়ে তিন হাজার। কত লোক দ্বীপ ছেড়ে গিয়েছেন? কেউ বলছেন, ৩০ হাজার, কেউ বা বলছেন ১০-১৫ হাজার তো হবেই। মাস্টারমশাই বললেন, ‘‘বেশ কয়েক হাজার মানুষ সব খুইয়ে চলে গিয়েছে কলকাতা, দিল্লি। দেশের ছোট বড় নানা শহরে।’’ সরকার কী করছে? অজয় বললেন, ‘‘কয়েক বছরে কয়েকশো পরিবারকে সাগরদ্বীপে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে।’’ তবে যাঁরা দ্বীপ ছেড়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগ পুনর্বাসন না-নিয়েই অন্যত্র চলে গিয়েছেন বলে জানাচ্ছেন দ্বীপবাসীরা।

যারা বাস্তু হারিয়ে চলে গিয়েছেন তাঁরা উদ্বাস্তু। আর এখনও যারা আছেন, তাঁরা হবু-উদ্বাস্তু। ২০০১ সালে তৎকালীন বাম সরকার ঘোড়ামারাকে ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’ বলে ঘোষণা করেছিল, জানালেন কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়। কান্তিবাবু দীর্ঘদিন সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী ছিলেন। আজও তিনি সুন্দরবনের ভাল-মন্দের অংশীদার। ঘোড়ামারা সম্পর্কে কান্তিবাবু বলেন, ‘‘ওই দ্বীপকে বাঁচানো যাবে না। তাই সাগরদ্বীপে ওই দ্বীপবাসীদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবু এখনও বহু মানুষ রয়েছেন।’’ বর্তমানে সাগরের বিধায়ক এবং সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান বঙ্কিম হাজরাও কান্তিবাবুর সুরে সুর মিলিয়ে বললেন, ‘‘কয়েক হাজার মানুষ বাস করছে ওই দ্বীপে। নদী ভাঙন ঠেকাতে কিছুটা অংশে খাঁচা বসানোর কাজ শুরু করা

হয়েছে। এ ভাবে কত দিন আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে!’’

নদীর পাড়ে বাস। জলের শব্দে যে কোনও দিন ভয় লাগতে পারে, ভাবেননি বাহাত্তর বছরের মাস্টারমশাই সতীশচন্দ্র জানা। কিন্তু ইদানীং ভয় হয়। মাস্টারমশাই বললেন, ‘‘ক’দিনই বা আর আছি! কিন্তু যারা থাকবে, তাদের কোথায় রেখে যাচ্ছি?’’

দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন পরিবেশ কর্মী সৌমিত্র ঘোষ। দ্বীপবাসীদের অসহায়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘‘যুদ্ধ, দেশভাগ, দাঙ্গা, মহামারীর জন্য মানুষ উদ্বাস্তু হয়। কিন্তু ঘোড়ামারার মানুষ জলবায়ু-উদ্বাস্তু!’’ জলবায়ু পরিবর্তনে ভূখণ্ডের মানচিত্র থেকে অনেক দ্বীপ মুছে যাচ্ছে। আর সেখানকার বাসিন্দারা সব কিছু হারিয়ে হয়ে যাচ্ছেন উদ্বাস্তু। মাস্টারমশাই, অজয়, জয়দেব, কোহিনুর বেওয়া, সোলেমান, সজল, অভিমন্যুরা হবু উদ্বাস্তু! জল নাকি জীবন। ঘোড়ামারায় জলই জীবনকে ছারখার করে দিচ্ছে!

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy