Advertisement
E-Paper

পলাশির প্রান্তরে মমতা-মডেল

মহাজন যে পথে যান, সেটাই পথ। অতএব মুখ্যমন্ত্রীর দেখানো রাস্তাই অনুসরণ করতে শুরু করেছে নদিয়া জেলা প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক দল অফিসার সঙ্গে নিয়ে রাজ্যের নানা জেলায় প্রশাসনিক সভা করে বেড়ান। ছোট আকারে সেই মডেলই অনুসরণ করছে জেলা প্রশাসন। ব্লক ধরে-ধরে সভা করা হচ্ছে খোদ সেই ব্লকে গিয়ে। কিন্তু ব্লক অফিসে নয়। বরং সেখান থেকে দূরে কোনও আনাচে-কানাচে হচ্ছে সারা দিনের আয়োজন।

সামসুদ্দিন বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ ০২:২৮
বাঁ দিকে, সেই স্মৃতিসৌধ। ডান দিকে, তখন চলছে বৈঠক।— নিজস্ব চিত্র

বাঁ দিকে, সেই স্মৃতিসৌধ। ডান দিকে, তখন চলছে বৈঠক।— নিজস্ব চিত্র

মহাজন যে পথে যান, সেটাই পথ।

অতএব মুখ্যমন্ত্রীর দেখানো রাস্তাই অনুসরণ করতে শুরু করেছে নদিয়া জেলা প্রশাসন।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক দল অফিসার সঙ্গে নিয়ে রাজ্যের নানা জেলায় প্রশাসনিক সভা করে বেড়ান। ছোট আকারে সেই মডেলই অনুসরণ করছে জেলা প্রশাসন। ব্লক ধরে-ধরে সভা করা হচ্ছে খোদ সেই ব্লকে গিয়ে। কিন্তু ব্লক অফিসে নয়। বরং সেখান থেকে দূরে কোনও আনাচে-কানাচে হচ্ছে সারা দিনের আয়োজন।

প্রথম সভাটি হয়েছিল ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে, রানাঘাট ১ ব্লকের পায়রাডাঙা স্টেশন থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ভাগীরথী আর চূর্ণি নদীর মাঝে জেগে ওঠা চর— যার পোশাকি নাম ‘মঙ্গলদ্বীপ’। নদীর পাড়ে গাড়ি রেখে নৌকায় চেপে যেতে হয়েছিল কর্তাদের।

বুধবার দ্বিতীয় সভা হল কালীগঞ্জ ব্লকে। কিন্তু এ বারও ব্লক সদরে নয়, বরং কিলোমিটার পনেরো‌ উজিয়ে পলাশিতে। সেই পলাশি, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন যেখানে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন নবাব সিরাউদ্দৌলা। সূচনা হয়েছিল দুই শতাব্দীর পরাধীনতার। সেই পলাশি, যেখানে দু’টি বিবর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ ছাড়া আর কিছুই আজও নেই।

হর্তাকর্তারা আসায় এ দিনই বরং কিছুটা দর্শনীয় হয়ে উঠেছিল পূর্ত দফতরের পরিদর্শন বাংলো। পলাশির আমবাগানের চেয়ে বেশি তো বটেই। ধুলো উড়িয়ে একের পর এক গাড়ি। জেলার মোট ১৭টি ব্লকের বিডিও, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, জেলা পরিষদের সভাধিপতি ও কর্মাধক্ষ্যরা, জেলাশাসক এবং তাঁর প্রশাসনিক বাহিনী। বাংলোর সামনে বাঁধা ম্যারাপে দিনভর কথা চালাচালি। মাঝে এক বার পাশের ম্যারাপে গিয়ে ফ্রায়েড রাইস, পোনা মাছ, খাসির মাংসে মধ্যাহ্নভোজ সেরে নেওয়া।

দেশের-দশের মঙ্গলচিন্তা করতে হঠাৎ এত দূরে সভা করতে হল কেন? জেলাসদরে বসেই তো দিব্যি বৈঠক করা যেত, বা অন্তত ব্লক সদরে। খরচ লাফিয়ে বাড়ল না এতে?

জেলাশাসক বিজয় ভারতী অবশ্য দাবি করছেন, ব্লক সদর থেকে সরে আসায় খরচ বিশেষ বাড়েনি। নানা জায়গা থেকে এসে জড়ো হতে গাড়ির তেল সেই যা পোড়ার পুড়তই। দুপুরে খাওয়া থেকে মণ্ডপ বাঁধার খরচও এড়ানো যেত না।

জেলাসদরে বসে বৈঠক করলে কী ক্ষতি ছিল?

জেলাশাসকের ব্যাখ্যা, শহরে বসে থাকার চেয়ে অফিসারেরা বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে সভা করলে উন্নয়নে বেশি গতি আসে। প্রশাসনের স্থানীয় কর্মীদের উপরেও চাপ বাড়ে। তাই মুখ্যমন্ত্রীদের নির্দেশে সব প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে বৈঠক করা হচ্ছে।

পলাশি বেছে নেওয়া কেন? বৈঠক করাও হবে, আবার বেড়ানোর পড়ে পাওয়া সুযোগও পাওয়া যাবে— এক ঢিলে দুই পাখি মারার জন্যই তো?

কিছুটা ঝাঁঝের সঙ্গেই জেলাশাসক বলেন, ‘‘সকলে সেই সকালে বৈঠকে বসেছেন, বেরিয়েছেন দিন পার করে। ঘুরে বেড়াবেন কখন?’’ তাঁর দাবি, আসলে পলাশির পর্যটন সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই এই জায়গাকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। বছর কয়েক আগে পলাশিতে পুরোদস্তুর পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার যে সরকারি চেষ্টা শুরু হয়েও থমকে গিয়েছিল, তা ফের চালু করাই তাঁদের উদ্দেশ্য।

একটা কথা অবশ্য সত্যিই। নামে পর্যটন কেন্দ্র হলেও পলাশিতে দেখার সত্যিই কি কিছু আছে যে প্রশাসনের কর্তারা তেল পুড়িয়ে সেখানে ঘুরতে আসবেন? পলাশি বাজার থেকে পাঁচ কিলোমিটার মতো এগোলে সেই প্রান্তর, যেখানে রবার্ট ক্লাইভের গোরা বাহিনী পরাস্ত করেছিল সিরাজের সেনাকে। তার স্মারক বলতে শুধু পূর্ত দফতরের বাংলোর সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। মেঠো পথে মিনিট পাঁচেক এগোলে মাঠের মধ্যে বসানো আর একটি স্মৃতিসৌধ। না কোম্পানির কামান, না নবাবি তরবারি— কিচ্ছু রাখা নেই। পর্যটকদের থাকার জায়গা বলতে পূর্ত দফতরের ওই বাংলো। কিন্তু সেখানে ঘর পেতে এত কাঠখড় পোড়াতে হয় যে তা প্রায় না থাকারই সামিল। এ ছাড়া আর কোথাও থাকা দূরস্থান, খাওয়ার ব্যবস্থাটুকুও নেই।

বাম আমলে এক বার ওই পূর্ত দফতরের বাংলো চত্বরে প্রদর্শনী কক্ষ ও কটেজ তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছিল রাজ্যের পর্যটন দফতর। কিছুটা কাজ এগোলেও তা বন্ধ হয়ে যায়। এ বার তাঁরা সেই কাজ সম্পূর্ণ করবেন বলে আশ্বাস জেলাশাসকের। তিনি জানান, প্রথম দফায় প্রদর্শনী কক্ষ এবং কটেজ তৈরির জন্য ২ কোটি ১৬ লক্ষ টাকার খসড়া প্রকল্প পর্যটন দফতরে পাঠানো হয়েছে। পরে ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ মারফত ইতিহাসের গল্প বলার ব্যবস্থা করা হতে পারে। এ ছা়ড়া বাংলো চত্বরে থাকা পুকুর সংস্কার, আধুনিক শৌচালয় ও রাস্তা তৈরি, জাতীয় সড়কের ধারে ‘পলাশি গেট’ গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

পর্যটন কেন্দ্র ও তাকে ঘিরে গোটা এলাকার উন্নয়নের দাবি পলাশিতে অনেক দিনের। স্থানীয় বাসিন্দা অশোক রাজোয়াড়, মোস্তফা মুন্সীরা বলেন, ‘‘বছরভর দূর-দূরান্ত থেকে বহু পর্যটক আসেন। এসে হতাশ হন। আমাদেরও খুব খারাপ লাগে। আমরা চাই, দ্রুত এই পরিস্থিতি বদলাক।’’ এ দিন প্রশাসনের কর্তারা বৈঠক করতে আসায় তাঁরা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখেছেন। জেলা পরিষদের সভাধিপতি বাণীকুমার রায় জানান, শুধু প্রশাসন নয়, পলাশির উন্নয়নের জন্য তাঁরা কী কী করতে পারেন তা নিয়েও এ দিন আলোচনা হয়েছে।

প্রশাসন সূত্রের খবর, এর পরে তেহট্টে বৈঠক হওয়ার কথা। যদিও জায়গা ঠিক হয়নি। এ ভাবে আনাচে-কানাচে ঘুরে সভা করার সত্যি কোনও সুফল আছে কি না, তার হেস্তনেস্ত কিন্তু হয়ে যাবে পলাশির প্রান্তরেই।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy