E-Paper

৫০ দিন আগে হামলা করলে ৩৫ হাজার মানুষ বেঁচে যেত

আধঘণ্টা বাদে আমার বাড়িই প্রবল বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। জানলার বাইরে তাকাই। ধোঁয়া বার হচ্ছে একটু দূরের একটা বাড়ি থেকে।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ২০ মার্চ ২০২৬ ০৫:৩০
ধ্বংস্তূপ।

ধ্বংস্তূপ। ছবি: রয়টার্স।

“ঘুম ভেঙে গেল ফোনের শব্দে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, ৬টা, আলোও ফোটেনি ভাল করে। কয়েক ঘণ্টা আগেই ঘুমোতে গিয়েছিলাম, ভয় আর আতঙ্কে ভরা একটি দিন শেষ করে।

ক্লান্ত গলায় ফোনটা ধরি। ও-পাশে ছোট বোন। কান্নাভেজা গলা, ভাল করে কথা বলতে পারছে না। কয়েকটা শব্দ কানে এল— ‘পাশের বাড়িতেই ড্রোন পড়েছে... ভদ্রলোক বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন... দেহ টুকরো টুকরো।’

পলকে আমার হৃদয়ও যেন হাজার টুকরো হয়ে গেল। বোনের সেই প্রতিবেশীর কথা কল্পনা করি। কেন বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন তিনি? হয়তো অনেকের মতোই বেরিয়েছিলেন ড্রোনগুলি দেখার জন্য— কোন দিকে উড়ে যাচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করতে। হয়তো গিয়েছিলেন একটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেশ ও মানুষের জন্য কাঁদতে। হয়তো ভাবছিলেন, কোথা থেকে পেট্রল জোগাড় করবেন, যাতে তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে একটি নিরাপদ শহরে চলে যেতে পারেন।

আধঘণ্টা বাদে আমার বাড়িই প্রবল বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। জানলার বাইরে তাকাই। ধোঁয়া বার হচ্ছে একটু দূরের একটা বাড়ি থেকে। আর সরকারের কিছু সমর্থক গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমেছে, শোকের গান গাইছে তারা। বলছে, “দেশবাসী, আমরা সবাই একসঙ্গে আছি।”

দেশবাসী? আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে— তোমাদের নির্বুদ্ধিতাই এই মাতৃভূমিকে ধ্বংস করেছে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম। লড়াই করেছিলাম, যাতে এই দিনগুলো কখনও না আসে। আমাদের কারাবন্দি করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে। তবু আমাদের থামানো যায়নি। আমি চাই, যদি কোনও মরুভূমিতে থাকতে পারতাম— যেখানে আমি চিৎকার করে কাঁদতে পারতাম, যত ইচ্ছে তত জোরে। শেষবার কেঁদেছিলাম জানুয়ারিতে প্রতিবাদকারীদের হত্যাকাণ্ডের পরে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা ভাবি। তিনি যদি দিন পঞ্চাশেক আগে পদক্ষেপ করতেন, তাহলে হয়তো ৩৫ হাজার মানুষ এখনও বেঁচে থাকত। এখন আমাদের ভয় হচ্ছে, ইরান ধ্বংস হয়ে যাবে— তবু ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে থাকবে।”

কথাগুলি ইলাহি-র। একটি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তেহরানের এই তরুণীর সাক্ষাৎকার। সংবাদমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে বরাবরই প্রবল নিষেধজ্ঞা ইরানে। আমেরিকা-ইজ়রায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পরে বিপর্যস্ত সে দেশের টেলি ও ইন্টারনেট পরিষেবাও। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলির পক্ষে বোঝা মুশকিল, ঠিক কী পরিস্থিতিতে রয়েছেন তেহরান-সহ বিভিন্ন শহরের সাধারণ মানুষ। ইলাহির মতো কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলে বোঝা যাচ্ছে, কী অপরিসীম কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা।

যেমন, বছর কুড়ির তরুণী সেহর। একটি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, কী ভাবে যুদ্ধ চলতে থাকলেও জীবন থেমে থাকে না। সেহরের কথা, “প্রায় প্রতিদিনই ঘুম ভাঙে বিস্ফোরণের শব্দে। খুব কফি খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কফি এখন খুবই দামি, তাই কেনা হয় না। তার থেকে বরং, টাকা বাঁচিয়ে ইনহেলার কিনি। জ্বালানি ঘাঁটিগুলিতে বোমা পড়ার পর থেকে বুক জ্বলছে, ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছি না। হাতে থাকা টাকা প্রায় শেষ। শুধু আমি নয়, চারপাশে সকলেরই নগদের ভাঁড়ারে টান। জানি না, কোনও দিন আমাদের কাছে এই ধ্বংসস্তূপ পুনর্গঠনের মতো পর্যাপ্ত অর্থ হবে কি না!”

তেহরানেরই বাসিন্দা, তরুণ নজিবের কথায়, “সকালে বেরোলে দেখি, মেট্রো একেবারে ফাঁকা। রাস্তা খুবই নির্জন… এতটাই শান্ত যে রাস্তার মাঝখানে ফুটবল খেলা যায়। চোখে পড়ে ক্লান্ত ও হতাশ দিনমজুরেরা শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু কাজ কই!”

বছর কুড়ির আর এক তরুণী মিনার পরিবার দিন কয়েক আগেই তেহরান থেকে পালিয়ে বন্দর শহর রাশতে চলে এসেছেন। বললেন, “যে রাতে তেলের ডিপোগুলিতে হামলা হয়েছিল, আমাদের ফ্ল্যাটের সব জানলা-দরজা কেঁপে কেঁপে উঠছিল। আলোর ঝলকানিতে চোখ যেন ঝলসে যাচ্ছিল। শুরু হল কালো বৃষ্টি। তার পরেই আমরা শহর ছেড়ে পালিয়ে আসি।” তবে তেহরান থেকে দূরে চলে গিয়েও নিজের শহরের মায়া কাটাতে পারেন না মিনা— “আমার সব থেকে প্রিয় বন্ধু তেহরানেই রয়ে গিয়েছে। সুযোগ পেলেই ফোন করি। আলোচনা করি, যুদ্ধ থেমে গেলে কী করব আমরা। চুলে একটা অন্য ধরনের রং করব, ঠিক করে ফেলেছি দু’বন্ধু।”

এ ভাবেই জীবন চলতে থাকে ইলাহিদের। অন্ধকার ও আশঙ্কায় ভরা, দিশাহীন, রিক্ত।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Iran israel america

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy