শনিবার সকাল থেকে ইরানের উপর শুরু হওয়া ইজ়রায়েলি এবং মার্কিন হামলার জেরে অশান্তি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পশ্চিম এশিয়ায়। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর গত দু’দিনে ইজ়রায়েল, কুয়েত, বাহরিন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সাইপ্রাস এবং জর্ডনে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমানহানা চালিয়েছে তেহরান। সোমবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের নাম। রাস টানুরা শহরে সৌদির সরকারি তেল পরিশোধন সংস্থা আরামকোয় ইরানি হামলার পরে সরাসরি পাল্টা হামলার ঘোষণা করেছে রিয়াধ।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে ইরানের উপর ইজ়রায়েল ও আমেরিকার বিমান হামলার (যার পোশাকি নাম যথাক্রমে ‘অপারেশন লায়নস রোর’ এবং ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’) জবাবে পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিতে আগেই হামলা চালিয়েছিল ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’। সোমবার বাহরিনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহর ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের নিশানা হয়েছে। পাশাপাশি সাইপ্রাসে মোতায়েন ব্রিটিশ বাহিনীর উপরেও ইরান ফৌজের হামলার খবর মিলেছে।
শনিবার আমেরিকার বিমান হামলায় হামলায় মৃত্যু হয়েছিল ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের। সেই সময়ই জখম হন তাঁর স্ত্রী খোজাস্তেহ বাঘেরজ়াদেহ। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সোমবার তাঁর মৃত্যু হয়েছে। খোজাস্তেহের বয়স ৭৮। ১৯৬৪ সালে খামেনেইয়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। খামেনেই তখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে ওঠেননি। বাঘেরজ়াদেহের বাবা ছিলেন খামেনেইয়ের পূর্বসূরি আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনির ছায়াসঙ্গী। খোমেনেইয়ের হাত ধরেই সত্তরের দশকের শেষে ইরানে ইসলামিক বিপ্লব হয়। পতন হয় শাহ রাজবংশের।
ইরানের হামলার নিন্দায় মোদী
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে ইরানের উপর ইজ়রায়েল ও আমেরিকার বিমান হামলার (যার পোশাকি নাম যথাক্রমে ‘অপারেশন লায়নস রোর’ এবং ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’) জবাবে , সোমবারও পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার মিত্রদেশগুলিকে নিশানা করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। পাশাপাশি ইজ়রায়েলি ও মার্কিন বাহিনীর যৌথ হামলায় মুহুর্মুহু ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছে রাজধানী তেহরান-সহ ইরানের বড় শহরগুলিতে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে ওই অঞ্চলে কর্মরত কয়েক লক্ষ ভারতীয় নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে রবিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টেলিফোনে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জ়ায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সোমবার সৌদি আরবের যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন এবং বাহারিনের রাজা হামাদ বিন ইসা আল খলিফার সঙ্গে কথা বললেন তিনি। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ওই তিন দেশে ইরানের হামলার পরেই আলোচনা হল তাঁর।
মোদী সমাজমাধ্যমে সলমনের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে সোমবার লিখেছেন, ‘‘পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে সৌদি আরবের যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের সঙ্গে আলোচনা করেছি। ভারতের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করে সাম্প্রতিক হামলাগুলির নিন্দা জানানো হচ্ছে। আমরা একমত হয়েছি যে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার দ্রুততম পুনঃপ্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কঠিন সময়ে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণের খোঁজখবর রাখার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি।’’
প্রসঙ্গত, রবিবার সমাজমাধ্যম পোস্টে মোদী লিখেছিলেন, ‘‘সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট, আমার ভাই শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছি। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির উপর হামলার তীব্র নিন্দা জানাই এবং এই হামলায় প্রাণহানির জন্য সমবেদনা জানাই। এই কঠিন সময়ে ভারত সর্বোত ভাবে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির পাশে রয়েছে। বাহারিনের রাজা হামাদের সঙ্গে আলোচনাতেও মোদী সে দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিন্দা করেছেন। পাশাপাশি, ইরানি হামলায় মৃত্যু নিয়েও সমবেদনা জানিয়েছেন। এখনও পর্যন্ত নয়াদিল্লির তরফে ইরানের উপর ইজ়রায়েল-আমেরিকার হামলার কোনও নিন্দা করা হয়নি। শোকপ্রকাশ করা হয়নি মার্কিন হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু নিয়েও। কিন্তু তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ওয়াশিংটনের সহযোগী তিন দেশের রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে আলোচনা এবং ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা করে মোদী জোটবদ্ধ আরব দুনিয়ার পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিলেন বলে মনে করছেন অনেকে।
বিপর্যস্ত বিমান পরিষেবা
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বহির্বিশ্বের সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। হানাদারি-পাল্টা হানাদারি শুরুর পরেই ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, বাহরিন, কাতার ও জর্ডন সাময়িক ভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলে। পশ্চিম এশিয়ার কারণে লক্ষাধিক যাত্রী বিমানবন্দর ও হোটেলে আটকে পড়েছেন বলে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কবে আবার বিমান পরিষেবা স্বাভাবিক হবে সে সম্পর্কে কোনও নির্দিষ্ট ঘোষণা নেই সোমবার পর্যন্ত। তবে সোমবার রাতে দুবাই বিমানবন্দর থেকে কয়েকটি বিমান চলাচল করেছে বলে জানা গিয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার আকাশপথ বন্ধ থাকায়, একাধিক আন্তর্জাতিক বিমানসংস্থা অনির্দিষ্টকালের জন্য অঞ্চলটির ভিতরে ও উপর দিয়ে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইট অ্যাওয়ার’-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ার এমিরেটস, ইতিহাদ এয়ারওয়েজ়, ফ্লাই দুবাই এবং কাতার এয়ারওয়েজ় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট ৬,০০০-এরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এমিরেটস সর্বাধিক ৪৮৫টি ফ্লাইট বাতিল করেছে, আর ইতিহাদ এয়ারওয়েজ়, ফ্লাই দুবাই এবং কাতার এয়ারওয়েজ় যথাক্রমে ১৯০, ১৮১ এবং ১০৬টি ফ্লাইট বাতিল করেছে, ভারতীয় সময় (আইএসটি) দুপুর ১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত। দোহা, দুবাই এবং আবুধাবির মতো গন্তব্যে যাত্রী পরিবহণকারী স্বল্পমূল্যের ভারতীয় বিমান সংস্থা ‘ইন্ডিগো’ পশ্চিম এশিয়ার বাইরের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সংস্থা, যার এখন পর্যন্ত ১২৯টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর পরেই রয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া, যারা ২৮টি ফ্লাইট বাতিল করেছে।
আমেরিকা-ইজ়রায়েলের হামলার জবাবে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে হামলা চালানোর পর বন্ধ হয়ে যাওয়া দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। সোমবার দুপুর পর্যন্ত ওই বিমানবন্দরের ৪৩৫টি উড়ান এবং ৩৯৫টি অবতরণ বাতিল করা হয়েছে। একই ভাবে, আবুধাবি বিমানবন্দরে ১২১টি উড়ান এবং গন্তব্য হিসাবে ১২৩টি অবতরণ বাতিল হয়েছে। যাতায়াতকারী অধিকাংশ উড়ান ও অবতরণ বাতিল হওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সরকার আটকে পড়া নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পরামর্শ দিয়েছে। দুবাই কর্তৃপক্ষ হোটেলগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন বিমান ভ্রমণে বাতিল বা বিলম্বের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সব সহায়তা প্রদান করা হয়।
ভারতীয় অসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রক পশ্চিম এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়া হয়ে পরবর্তী সম্ভাব্য ফ্লাইট সংক্রান্ত তথ্যের জন্য হিমশিম খাওয়া যাত্রীদের সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। মন্ত্রকের প্যাসেঞ্জার অ্যাসিস্ট্যান্স কন্ট্রোল রুম (পিএসিআর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম, ‘এয়ারসেবা পোর্টাল’ এবং নির্ধারিত হেল্পলাইনের মাধ্যমে প্রাপ্ত যাত্রীদের প্রশ্ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ায় বিমান চলাচল সংক্রান্ত সংক্রান্ত তথ্যের জন্য যাত্রী এবং আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের পরিজনদের হেল্পলাইন নম্বর ০১১-২৪৬০৪২৮৩ / ০১১-২৪৬৩২৯৮৭-এ যোগাযোগ করতে বলেছে মন্ত্রক।
আরও পড়ুন:
মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস, আক্রান্ত ব্রিটিশ ঘাঁটি
ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে অংশ নিয়ে ফিরে আসার সময় সোমবার ভোরে পেন্টাগনের ‘স্ট্রাইক ঈগল’ স্কোয়াড্রনের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়। কুয়েত সিটির ৩২ কিলোমিটার পশ্চিমে অল-জ়াহরা শহরে ওই ঘটনার পরে প্রাথমিক ভাবে ইরানের সংবাদমাধ্যমের একাংশ দাবি করেছিল, তাদের ড্রোন মার্কিন যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপতিত করেছে। কিন্তু এর পরে উপসাগরীয় অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সূত্র উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমের দাবি, আমেরিকার ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আঘাতেই ওই যুদ্ধবিমানটি ভেঙে পড়েছে। ওই প্রতিবেদনগুলির দাবি, শত্রুদেশের বিমান মনে করে ওই ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। আর তাতেই কুয়েতের শহরে ভেঙে পড়েছে যুদ্ধবিমানটি।
এর পরে পশ্চিম এশিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, মোট তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান কুয়েতে মোতায়েন মিত্রবাহিনীর ‘বন্ধুত্বপূর্ণ গোলাবর্ষণের’ নিশানা হয়েছিল। তার মধ্যে একটিতে আগুন ধরে যায়। তবে পাইলট নিরাপদে প্যারাস্যুটের সাহায্যে অবতরণ করেন। কিন্তু কেন এমন সমন্বয়ের অভাব হল, তার কোনও ব্যাখ্যায় দেয়নি পেন্টাগন। সোমবার কুয়েতে মার্কিন দূতাবাস এবং লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। সংবাদসংস্থা এপি-র প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের হামলার পরেই দূতাবাস চত্বরে আগুন এবং ধোঁয়া দেখতে পাওয়া গিয়েছে। অন্য দিকে, সোমবার সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে ব্রিটিশ বায়ুসেনার ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয়। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স সূত্রে জানা যাচ্ছে, দু’টি ড্রোন হামলা চালিয়েছিল ইরান। তার মধ্যে একটি ধ্বংস করা গিয়েছে। অন্যটি রানওয়েতে আছড়ে পড়েছে। তবে সামরিক ঘাঁটিতে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি নেটোর সহযোগী ব্রিটেন।
আবার মার্কিন নিশানায় পরমাণুকেন্দ্র
ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজ়া নাজাফি সোমবার সকালে দাবি করেন, রবিবার রাতে ইজ়রায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলায় ক্ষতি হয়েছে তাঁদের নাতান্জ় পরমাণুকেন্দ্রের। যদিও রাষ্ট্রপুঞ্জ নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) অন্য কথা বলেছে। আইএইএ-র প্রধান রাফায়েল গ্রোসি সংস্থার বোর্ড অফ গভর্নরকে জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত ইরানের কোনও পরমাণুকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিহ্ন মেলেনি। তবে এ-ও স্পষ্ট করেছেন, বিষয়টি তাঁরা হালকা ভাবে নিচ্ছেন না। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
সোমবার রাতে সংবাদমাধ্যম আল জাজ়িরা জানায়, ইরানের ইশফাহান পরমাণুকেন্দ্রের আশপাশ এলাকায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। মনে করা হচ্ছে, ওই পরমাণুকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে এই হামলায় পরমাণুকেন্দ্রের কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ঘটনাচক্রে, গত বছরের ২২ জুন ইরানের ওই দুই পরমাণুকেন্দ্র মার্কিন হামলার নিশানা হয়েছিল। নাজান্জ়, ইশফাহানের পাশাপাশি ইরানের আর এক পরমাণুকেন্দ্র ফোরডোকেও নিশানা করেছিল মার্কিন বি২ বম্বার ফেলে ফেলা বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমা। সেই হামলার বিষয় নিশ্চিত করেছিল আইএইএ। তবে সে সময় হামলার বিষয় প্রথমে অস্বীকার করেছিল ইরান। যদিও বিভিন্ন উপগ্রহচিত্র থেকে স্পষ্ট হয়েছিল হামলার বিষয়টি।
ট্রাম্পের যুদ্ধে সায় নেই আমেরিকার
ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দোসর হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে সায় নেই আমেরিকার অধিকাংশ নাগরিকেরই। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের সমীক্ষা বলছে, প্রতি চার জন আমেরিকানের মধ্যে মাত্র এক জন মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা সঠিক। অর্থাৎ, চার জনের মধ্যে বাকি তিন জন আমেরিকানই সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে।
সমীক্ষায় যোগদানকারী অধিকাংশ এও মনে করেন যে, ট্রাম্প যুদ্ধে অতি আগ্রহী। তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক হামলার নির্দেশ দিয়ে চলেছেন। পেন্টাগনের অভিযান হয়েছে ভেনিজ়ুয়েলার মতো দেশে। আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তের ১,২৮২ জন অনলাইনে সমীক্ষায় যোগ দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, এঁদের মধ্যে ২৭ শতাংশ ইরান আক্রমণের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রিপাবলিকানের সংখ্যা ৫৫ শতাংশ। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে রয়েছেন ৪৩ শতাংশ মানুষ এবং এই তালিকায় ৭৪ শতাংশ ডেমোক্র্যাটের পাশাপাশি ১৩ শতাংশ রিপাবলিকানও রয়েছেন। বাকি ৩০ শতাংশ আমেরিকান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।
সমীক্ষায় যোগদানকারীদের ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। গত কয়েক মাসে ভেনেজ়ুয়েলা, সিরিয়া, নাইজ়েরিয়ায় পর পর আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। গত বছর হামলা চালানো হয়েছিল ইরানেও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে অতি আগ্রহী? সমীক্ষায় ৫৬ শতাংশ আমেরিকান এই প্রশ্নের উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। তাঁদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটের সংখ্যাই ৮৭ শতাংশ। ২৩ শতাংশ রিপাবলিকানও এই মত সমর্থন করেছেন। তাঁরা মনে করেন, ট্রাম্প যুদ্ধে অতি আগ্রহী। অন্যদিকে, এবিসি নিউজ়ের সাংবাদিক জোনাথন কার্লকেম সোমবার ট্রাম্পের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরে এক্সে লিখেছেন, ‘‘আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের মৃত্যু নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমায় এই কথা বলেছেন— ‘ও আমাকে পাওয়ার আগে আমিই ওকে পেয়ে গিয়েছি। ওরা দু’বার চেষ্টা করেছিল। আমিই প্রথমে পেয়ে গেলাম’।’’ ওই সংবাদিক জানিয়েছেন, আমেরিকার গোয়েন্দাদের একটি সূত্র মনে করে, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন খামেনেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই প্রসঙ্গই তুলে ধরেছেন।
ইরানে হামলায় তিন মার্কিন সেনা জওয়ানের মৃত্যু হয়েছে বলে রবিবার স্বীকার করেছে আমেরিকা। এই স্বীকারোক্তির আগেই অবশ্য রয়টার্সের সমীক্ষা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ট্রাম্প দাবি করেছেন, আরও মার্কিন সেনার মৃত্যু হতে পারে। তাঁর দলেরই ৪২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, মার্কিন সেনার ক্ষতি হলে তাঁরা ইরানে হামলাকে সমর্থন করবেন না। এ ছাড়া, যুদ্ধের কারণে তেলের দামও চড়তে শুরু করেছে। তা নিয়ে পৃথক উদ্বেগ রয়েছে আমেরিকানদের মধ্যে। ইরানে আমেরিকার হামলা নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষিপ্ত ভাবে বিক্ষোভ হয়েছে রবিবারই। হোয়াইট হাউসের বাইরে এবং টাইম্স স্কোয়ারে কিছু মানুষ বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। দাবি, মার্কিন কংগ্রেসকে অন্ধকারে রেখে ট্রাম্প ইজ়রায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন এবং ইরান আক্রমণ করেছেন। যদিও খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর আমেরিকার ইরানি নাগরিকদের মধ্যে উল্লাস দেখা গিয়েছে।