বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল নিয়ে এ বার প্রকাশ্যে মুখ খুললেন সে দেশের রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দাবি, তাঁকে একপ্রকার অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে ফেলারও চেষ্টা করেছিলেন। বাংলাদেশি সংবাদপত্র ‘কালের কণ্ঠ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।
ইউনূসের কার্যপদ্ধতি নিয়ে যে তাঁর অসন্তোষ রয়েছে, তা নিয়ে কোনও রাখঢাক করেননি সাহাবুদ্দিন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনও বিধান মেনে চলেননি। সংবিধানে বলা আছে, উনি যখনই বিদেশ সফরে যাবেন, সেখান থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন এবং আমাকে ওই আউটপুটটা জানাবেন। কী আলোচনা হল, কী হল, কোনও চুক্তি হল কি না, কী ধরনের কথাবার্তা হল— এটা আমাকে লিখিত ভাবে অবহিত করার কথা। উনি তো বোধহয় ১৪-১৫ বার বিদেশ সফরে গিয়েছেন। একবারও আমাকে জানাননি। একবারও আমার কাছে আসেননি।”
এমনকি আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও ইউনূসের তৎকালীন প্রশাসন তাঁকে কিছুই জানায়নি বলে দাবি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “কোনও কিছুই আমি জানি না। এই রকম একটা চুক্তি অবশ্যই আমাকে জানানো দরকার ছিল। এটা ছোটখাটো হোক আর বড় কিছু হোক, অবশ্যই আগের সরকারপ্রধানেরা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন। আর এটি হল সাংবিধানিক একটা বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তিনি তো তা করেননি।” লিখিত বা মৌখিক— কোনও ভাবেই ইউনূস তাঁকে জানাননি বলে দাবি সে দেশের রাষ্ট্রপতির।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পরে ইউনূস তাঁর সঙ্গে আর সে ভাবে যোগাযোগ রাখেননি বলেও সাক্ষাৎকারে জানান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, “তিনি (ইউনূস) একটিবারের জন্যও আমার কাছে আসেননি। আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন।”
সাহাবুদ্দিনের কথায়, ওই দেড় বছর তিনি কোনও আলোচনায় ছিলেন না। অথচ তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন ‘চক্রান্ত’ চলছে। তিনি বলেন, “দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে।” কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকায় কোনও ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি বলে জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। সাহাবুদ্দিন আরও বলেন, “অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেড় বছর বঙ্গভবনের অভিজ্ঞতা যে ভাল, তা বলা যাবে না।”
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দাবি, প্রাথমিক ভাবে গণঅভ্যুত্থানের কয়েক জন নেতার চাপে তাঁকে অপসারণের চেষ্টা হয়েছিল। ওই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রাজনৈতিক দলগুলি চাইলে তবেই তাঁকে অপসারণ করা যাবে। তবে বিএনপি-র এক শীর্ষনেতা ওই সময়ে তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন। যদিও কোনও নেতার নাম ওই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেননি রাষ্ট্রপতি। তিনি জানান, ওই বিএনপি নেতা তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই। কোনও অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে আমরা নই।”
সাহাবুদ্দিন জানান, রাজনৈতিক স্তরে ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পরে অন্তর্বর্তী সরকারই এ বিষয়ে পদক্ষেপ করে। এক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে অসাংবিধানিক উপায়ে তাঁর জায়গায় বসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে এমনটাই অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা ওই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু ওই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমন ‘অসাংবিধানিক কাজে’ রাজি হননি। ফলে সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয় বলে দাবি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির।
অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি ইউনূসের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন সাহাবুদ্দিন। সাক্ষাৎকারে তাঁর দাবি, ওই পরিস্থিতিতে ইউনূসের কাছ থেকে কোনও ফোন পাননি তিনি। ইউনূস তাঁর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও অবস্থানেই ছিলেন না ওই সময়ে। অবশ্য রাষ্ট্রপতি এ-ও স্পষ্ট করে দেন, তিনিও নিজে থেকে ইউনূসের কাছে কোনও সাহায্য চাননি।