Advertisement
E-Paper

ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কে উষ্ণতার ইঙ্গিত চিনের! দর কষাকষি হতে পারে বাণিজ্য ও বিরল খনিজ নিয়ে, নজরে ইরানের পরিস্থিতিও

তিন দিনের সফরে চিনে গিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে বুধবার বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন চিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যান জ়েং। গত বছর ট্রাম্পের শপথ সমারোহতেও উপস্থিত ছিলেন তিনি।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ ২২:০২
(বাঁ দিকে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

কথা ছিল মার্চে যাবেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের মাঝে তা হয়ে ওঠেনি। দু’মাস পিছিয়ে দিতে হয়েছিল সফর। শেষে বুধবার বেজিঙে পৌঁছোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট চিনে সরকারি সফরে গেলেন। এর আগেরটা ছিল ট্রাম্পেরই প্রথম জমানায়। প্রায় ৯ বছরের ব্যবধানে ফের বেজিঙে পা রাখলেন তিনি।

ট্রাম্পের এই তিন দিনের সফর ওয়াশিংটন এবং বেজিং উভয়ের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দু’পক্ষই চাইবে নিজের জন্য সেরাটুকু আদায় করে নিতে। তবে ৯ বছর আগে পরিস্থিতি যেমন ছিল, এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। আগের তুলনায় এখন ট্রাম্প প্রসঙ্গে দৃশ্যত কিছুটা ‘নমনীয়’ চিন। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে বুধবার বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন চিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যান জ়েং। গত বছর ট্রাম্পের শপথ সমারোহতেও উপস্থিত ছিলেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের গত বারের সফরে এতটা উচ্চপদের কোনও চিনা নেতাকে বিমানবন্দরে গিয়ে স্বাগত জানাতে দেখা যায়নি। সেই সময়ে ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে পাঠানো হয়েছিল স্টেট কাউন্সিলর ইয়াং জেইচিকে।

শুল্ক সংঘাত পরবর্তী পর্যায়ে ট্রাম্পের এই সফরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকে বাণিজ্যের কথা যে উঠবেই, তা প্রত্যাশিত। পাশাপাশি, বিরল খনিজের সরবরাহ, কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজার এবং তাইওয়ান প্রসঙ্গও উঠে আসতে পারে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে। পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার মাঝে ইরান সংঘাত এবং হরমুজ় প্রণালীর প্রসঙ্গও উঠে আসতে পারে দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠকে।

দুই প্রধান শক্তিধর দেশের রাষ্ট্রনেতাদের বৈঠকে যে বাণিজ্য বিশেষ গুরুত্ব পাবে, সেই আভাস ইতিমধ্যেই দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। বেজিং সফরের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির জন্য চিনের দরজা খুলে দেওয়ার জন্য জিনপিংকে অনুরোধ করবেন তিনি। অন্য দিকে, ইরান পরিস্থিতি নিয়েও চিনের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, ইরান পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য তাঁর চিনের কাছ থেকে কোনও সাহায্যের প্রয়োজন নেই।

বাণিজ্যে স্থায়ী সমাধানের খোঁজ

গত বছরে ট্রাম্পের শুল্কনীতির জেরে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। উভয়েই একে অপরের উপর শুল্ক এবং পাল্টা শুল্ক চাপিয়ে গিয়েছিল। তবে সেই উত্তেজনা এখন অনেকটাই কেটেছে। কিন্তু বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে কোনও স্থায়ী সমাধানসূত্র বার করতে পারেনি দুই দেশ। এই অবস্থায় ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকে সেই সমাধানসূত্রের খোঁজ চালাতে পারে দুই দেশ। সয়াবিন, বিমানের যন্ত্রাংশ এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পসামগ্রী আরও বেশি পরিমাণে চিনের বাজারে প্রবেশ করানোর জন্য দর কষাকষি করতে পারেন ট্রাম্প। অন্য দিকে, গত মার্চেই ১৬টি দেশের উপরে বাণিজ্যে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা। সেই তালিকায় চিনও রয়েছে। এই দেশগুলির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে নেমেছে মার্কিন প্রশাসন। ওই বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি বোঝাপড়ায় আসার চেষ্টা করতে পারেন জিনপিংও।

বিরল খনিজ নিয়ে দর কষাকষি

ট্রাম্পের এই সফরে গুরুত্ব পেতে পারে বিরল খনিজের প্রসঙ্গও। নিওডিমিয়াম বা সামারিয়ামের মতো বিরল খনিজগুলি দিয়ে শক্তিশালী স্থায়ী চৌম্বক পদার্থ তৈরি করা যায়। বর্তমানে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই বিরল খনিজগুলির গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। ইলেকট্রিক মোটর, ড্রোন, স্মার্টফোন-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরিতে এগুলির প্রয়োজন হয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি, পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি তৈরি, বিমান পরিবহণ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও এ ধরনের চৌম্বক পদার্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই বিরল খনিজের দুনিয়ায় চিনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে বরাবর। আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশ চিন থেকে এই পণ্য কিনে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিরল খনিজ রফতানির উপর কিছু ক্ষেত্রে কড়াকড়ি শুরু করেছে চিন। যার প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন দেশে বিরল খনিজ সরবরাহের উপর। চিনের অভিযোগ, তাদের পণ্য বিভিন্ন দেশ সামরিক খাতে কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্ব শান্তির কথা ভেবে তাই তারা বিরল খনিজের রফতানিতে কিছু বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই কড়াকড়ি শিথিল করার চেষ্টা করতে পারে আমেরিকা।

ইরান-পরিস্থিতি

পশ্চিম এশিয়ার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে যে দু’দেশের মধ্যে আলোচনা হবে, সে কথা ইতিমধ্যে জানিয়েছেন ট্রাম্প। আমেরিকা-ইরান উত্তেজনার জেরে হরমুজ় প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দু’দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত বন্ধ থাকলেও অস্থিরতা কাটেনি। এই অবস্থায় আমেরিকা চাইছে ইরান-চুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটনকে সাহায্য করুক বেজিং। আবার বেজিঙের বিরুদ্ধে আঙুলও তুলেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, তেহরানের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি কিনে পরোক্ষে ইরানকে মদত দিচ্ছে চিন। মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসান্ত সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরানের রফতানি করা জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশ কিনছে চিন। ‘সন্ত্রাসে মদত দেওয়া একটি দেশকে’ বেজিং আর্থিক মদত জোগাচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। এ অবস্থায় ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকে ইরান প্রসঙ্গে কী কী বিষয় উঠে আসে, তা নিয়ে কৌতূহল দানা বেঁধেছে কূটনৈতিক মহলে।

তাইওয়ান প্রসঙ্গ

ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকে অন্যতম সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠতে পারে তাইওয়ান প্রসঙ্গ। চিন দাবি করে, তাইওয়ান তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্য দিকে, স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি না-দিলেও তাইওয়ানের স্বশাসনকে স্বীকৃতি দেয় আমেরিকা। গত বছরের শেষের দিকে তাইওয়ানকে ১১১০ কোটি ডলারের (প্রায় ১ লক্ষ ২৬৩ কোটি টাকা) অস্ত্র সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন প্রশাসন। ওয়াশিংটনের ওই পদক্ষেপ ভাল ভাবে নেয়নি বেজিং। তাইওয়ানকে অস্ত্র বিক্রি করাকে চিনের বিরুদ্ধে ‘উস্কানি’ বলেই মনে করে জিনপিং প্রশাসন। ফলে দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠকে তাইওয়ানের প্রসঙ্গও উঠে আসার সম্ভাবনা প্রবল। মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও নিজেও স্বীকার করেছেন, আলোচনায় তাইওয়ানের প্রসঙ্গ উঠে আসতে পারে।

কৃত্রিম মেধার বাজার

আমেরিকা এবং চিন দুই প্রধান শক্তিধর দেশই নিজেদের প্রযুক্তিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি করে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কৃত্রিম মেধার বাজারে বর্তমানে আমেরিকার আধিপত্য রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দাবি করা হয়, আমেরিকার তুলনায় এ বিষয়ে প্রায় ছয়-আট মাস পিছিয়ে রয়েছে চিন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চিনও বার বার কৃত্রিম মেধার ক্ষেত্রে নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট করেছে। নিজেদের সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেও কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি নিয়ে কাজে গতি আনছে বেজিং। এই অবস্থায় কৃত্রিম মেধার বাজার নিয়েও দু’দেশের মধ্যে দর কষাকষি হতে পারে।

Donald Trump Xi Jinping China US-China
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy