Advertisement
E-Paper

হরমুজ় নিয়ে ইরানকে চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধেও পিছু হটলেন ট্রাম্প! প্রত্যাঘাতের আশঙ্কা, না কি রণকৌশল বদলের ইঙ্গিত

ঘটনাচক্রে, ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা এবং হুমকিতে দমেনি ইরান। রবিবার তারাও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছিল আমেরিকাকে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৬ ২২:৪২
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

হরমুজ় প্রণালীতে ইরানের ‘বাধা’ নির্মূল করতে বড় পদক্ষেপের ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে ৪৮ ঘণ্টা সময়সীমা বেঁধে দিয়ে শনিবার জানিয়েছিলেন, যদি তারা হরমুজ় প্রণালী খুলে না দেয়, তবে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। কিন্তু সোমবার সেই ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগেই ট্রাম্প জানালেন, ইরানের কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগামী পাঁচ দিন হামলা হবে না! পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা চলছে বলেও দাবি করলেন তিনি।

ঘটনাচক্রে, ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা এবং হুমকিতে দমেনি ইরান। রবিবার তারাও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছিল আমেরিকাকে। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে আমেরিকা পরিচালিত বহু তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা, তৈল শোধনাগার এবং পানীয় জল পরিশোধন সংস্থাও রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে সেগুলিকেও নিশানা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল মোজ়তবা খামেনেই-মাসুদ পেজ়েশকিয়ানের দেশ। তেহরানের কথায়, ‘‘আমেরিকা যদি ইরানের শক্তি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে হামলা চালায়, আমরাও চুপ করে বসে থাকব না। পশ্চিম এশিয়ায় ওদের যত তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র, শক্তিকেন্দ্র, পানীয় জল শোধনকেন্দ্র আছে সেগুলিকে নিশ্চিহ্ন করা হবে।’’

চাপানউতরের এই আবহে ট্রাম্পের পিছু হটার নেপথ্যে ‘গোপন রণকৌশল’ রয়েছে কি না, তা নিয়ে সোমবার থেকেই নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। কারণ, কয়েকটি পশ্চিমী সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ‘ইরানের তেল সাম্রাজ্যের রাজধানী’ খার্গ দ্বীপ দখলের উদ্দেশ্যে ৫ হাজারেরও বেশি বিশেষ প্রশিক্ষিত সেনা পাঠিয়েছে পেন্টাগন। ইতিমধ্যেই রওনা হয়ে গিয়েছে ওই বাহিনী। শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে আরও এফ-৩৫ লাইটিং-২ যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছেন ট্রাম্প। ফলে আদৌ তেহরানের আস্ফালনে ওয়াশিংটন কর্ণপাত করেছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

দাম কমল অপরিশোধিত তেলের

ট্রাম্পের ঘোষণার পরেই সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে কমল তেলের দাম। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম হল ৯৬ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮,৯০০ টাকা। দিনের শুরুতে এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ১১৪ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১০,৬০০ টাকা। অর্থাৎ ট্রাম্পের ঘোষণার পরে এক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে ১৫ শতাংশ। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আবহে আন্তর্জাতিক বাজারে অনেকটাই বেড়েছিল অপরিশোধিত তেলের দাম।

মিষ্টি অশোধিত তেলের মূল্য নির্ধারণের সূচক হল ব্রেন্ট। সারা বিশ্বে যত অশোধিত তেল আমদানি-রফতানি হয়, তার ৮০ শতাংশের মূল্য নির্ধারণের জন্য এই সূচক ব্যবহার করা হয়। এই ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম সোমবার কমেছে অনেকটাই। অন্য দিকে, ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মূল্য কমেছে প্রায় ১৩.৫ শতাংশ। এক ব্যারেল তেলের দাম হয়েছে ৮৫.২৮ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭,৯০০ টাকা। আমেরিকায় তেলের মূল্য নির্ধারণের জন্য এই সূচক ব্যবহার করা হয়।

হুমকি এবং ‘পশ্চাদপসরণ’

শনিবার সকালে (ভারতীয় সময়) তেহরানকে চরম সময়সীমা দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আরও সুর চড়িয়েছিলেন ট্রাম্প। রবিবার নিজের সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট লেখেন, ‘‘সহজ কথায় বলতে গেলে শক্তির মাধ্যমে শান্তি!’’ অর্থাৎ, ট্রাম্প বুঝিয়েছেন, শান্তি ফেরাতে আরও শক্তিপ্রয়োগ করতে চান। উল্লেখ্য, ঠান্ডা যুদ্ধের সময় প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগন এই নীতি অবলম্বনের কথা বলেছিলেন। রেগনের উক্তিরই প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল ট্রাম্পের পোস্টে।

এর পর সোমবার বিকেলে (ভারতীয় সময়) তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে পর পর দু’টি পোস্ট করেন। প্রথম পোস্টে জানান, ইরান-আমেরিকার আলোচনার কথা। তিনি লেখেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে গত দু’দিন ধরে আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে ভাল এবং ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে’। সেই সঙ্গেই তিনি জানান, এই আলোচনা সপ্তাহ জুড়ে চলতে পারে। ট্রাম্পের মতে, দুই দেশের মধ্যে গভীর, বিস্তারিত এবং গঠনমূলক আলোচনা হচ্ছে। তার পরেই ট্রাম্প জানান, তিনি আগামী পাঁচ দিন হামলা স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন আমেরিকার প্রতিরক্ষা দফতরকে (বর্তমানে এই দফতরকে যুদ্ধ দফতর নামে পরিচিত)। তবে শেষে ট্রাম্প এ-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই বিরতি সাময়িক। আলোচনার টেবিলে অগ্রগতির উপর নির্ভরশীল।

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি

ট্রাম্প সুর নরম করলেও তা নিয়ে সরাসরি কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি তেহরান। বরং হুঁশিয়ারি দিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাব দিতে পারস্য উপসাগর জুড়ে মাইন পাতা হবে। তার মধ্যে থাকবে নৌ-মাইনও। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে সোমবার সে দেশের প্রতিরক্ষা পরিষদ জানিয়েছে, যে কোনও হামলার জবাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথগুলি ‘অবরুদ্ধ’ করে দেওয়া হবে। পাতা হবে মাইন। এই পদক্ষেপকে ‘প্রতিষ্ঠিত সামরিক নীতি’ বলে উল্লেখ করেছে তেহরান।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এমনিতেই আংশিক ‘অবরুদ্ধ’ হরমুজ় প্রণালী। ফলে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়েছে। অনেক দেশেরই পণ্যবাহী জাহাজ আটকে রয়েছে সমুদ্রপথে। বাকিদের জন্য জলপথ খুলে দিতে আগ্রহী হলেও আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলকে এই ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান। হরমুজ় প্রণালীর পর এ বার ইরান পারস্য উপসাগরও ‘বন্ধ’ করার হুঁশিয়ারি দেওয়ায় নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে ইরানের প্রতিরক্ষা পরিষদ সতর্ক করেছে, পারস্য উপসাগর বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। সেই করিডরে মাইন পাতা হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হবে। ইরান আরও জানিয়েছে, এ ধরনের মাইন সহজে অপসারণ করা সম্ভব হবে না। তাদের কথায়, ‘‘১৯৮০-র দশকে পাতা সামুদ্রিক মাইন অপসারণের ব্যর্থতার কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।’’ আফগানিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত একটি পোস্টে দাবি করেছেন, ইরানের পাল্টা হামলার হুমকিতে ভয় পেয়েছে আমেরিকা। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের দেশের জ্বালানিকেন্দ্র ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে মার্কিন হামলা হলে, গোটা পশ্চিম এশিয়ার জ্বালানিকেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে— এই হুঁশিয়ারির পরেই ট্রাম্প পিছু হটেন এবং মার্কিন সেনাকে হামলাটি স্থগিত করার আদেশ দেন’।

সংসদে আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপর আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের হামলা এবং তার জেরে ২ মার্চ থেকে তেহরানের তরফে হরমুজ় আটকে রাখার কারণে তা পেরিয়ে পূর্ব এশিয়ায় আসতে পারেনি তেল, রান্নার গ্যাস বোঝাই জাহাজ। একই ভাবে পশ্চিমে যেতে পারেনি জাহাজ। তার পরে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ে অপরিশোধিত তেলের। এর ফলে বিভিন্ন দেশে জ্বালানির সঙ্কট তৈরি হয়। ভারতেও এলপিজি, তেল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। সোমবার যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লোকসভায় দেশবাসীকে জ্বালানি, সারের জোগান নিয়ে আশ্বস্ত করেন। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি যে উদ্বেগজনক, বক্তৃতার শুরুতেই তা স্বীকার করে নেন প্রধানমন্ত্রী। ভারতে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ় প্রণালীর গুরুত্ব যে অপরিসীম, সে কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর কথায়, “হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে রাখা কিংবা পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালানো গ্রহণযোগ্য নয়।’’ এই সূত্রেই তিনি আশ্বাসের সুরে জানান, দেশে পেট্রল, ডিজ়েল এবং গ্যাসের জোগান সুনিশ্চিত রাখতে সব ধরনের চেষ্টা করছে কেন্দ্র।

Donald Trump Strait of Hormuz Iran israel america
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy