Advertisement
E-Paper

স্টকের লাভে কুঠারের আঘাত! নির্মলার এসটিটি-বাণে কাহিল শেয়ার বাজার, লগ্নিকারী থেকে মধ্যবিত্তকে হতাশ করার বাজেট

বাজেটে শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা কর বৃদ্ধি করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। তাঁর ওই ঘোষণার পরেই খাদের অতলে তলিয়ে যায় সেনসেক্স এবং নিফটির সূচক। যার ফলে স্টক থেকে আগামী দিনে লগ্নিকারীদের লাভের অঙ্ক কমবে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:২৯
Representative Picture

ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত

আয়কর ছাড়ের কোনও ঘোষণা নেই। মধ্যবিত্তদের জন্য আশার কথা নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা অবশ্য বলেছেন, এই বাজেট দেশের যুবশক্তির জন্য। ন্যাড়ম্যাড়ে বাজেটে তেমন কোনও চমকও নেই।

অবশ্য চমক একেবারেই যে ছিল না, তা নয়। তবে তা ‘নেতিবাচক’ চমক! যে চমকের ধাক্কায় শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে। রবিবার নির্মলা সীতারমণের বাজেটের আসল মূল্যায়ন হয়ে গিয়েছে সেখানেই।

তাঁর বাজেটের দিনেই রক্তাক্ত হয়েছে শেয়ার বাজার। হুড়মুড়িয়ে পড়েছে সেনসেক্স এবং নিফটি। লোকসভায় নির্মলা তাঁর বাজেট ভাষণে ‘নিরাপত্তা লেনদেন কর’ বা এসটিটি (সিকিউরিটি ট্রানজ়াকশন ট্যাক্স) বৃদ্ধি করতে না করতেই লগ্নিকারীদের মধ্যে স্টক বিক্রি নিয়ে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে থাকে শেয়ার সূচক। দালাল স্ট্রিটের এই ‘রক্তক্ষরণ’ আশু বন্ধ হবে না বলেই আশঙ্কা দেশের তাবড় ব্রোকারেজ সংস্থাগুলির।

বাজেট পেশের পরে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্রীয় বাজেট বণিকমহলকে হতাশ করেছে। তাঁর কথায়, “শেয়ারবাজারে বড় ধস নেমেছে। সেনসেক্স প্রায় ১০০০ পয়েন্ট পড়েছে।” পাশাপাশিই মমতা বলেন, ‘‘এই বাজেট হচ্ছে গার্বেজ অফ লাই (মিথ্যার জঞ্জাল)। গোটা দেশে এখন একটাই করকাঠামো এবং জিএসটি। বাংলা থেকে সব টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। একটা টাকাও রাজ্যকে দিচ্ছে না। যে টাকার কথা বলা হয়েছে, সব আমাদের টাকা।” কেন্দ্রীয় বাজেটকে ‘হাম্পটি ডাম্পটি’ বলে কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সংযোজন, “বাজেটে শুধু কথার ফুলঝুরি। বাংলার ২ লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।”

মধ্যবিত্তের জন্য তাঁর বাজেটে কী সংস্থান রাখা হয়েছে, সংসদে বাজেট পেশের পরে নির্মলাকে তাঁর সাংবাদিক বৈঠকে সে প্রশ্ন করা হয়েছিল। পাশাপাশিই প্রশ্ন করা হয়েছিল শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর বাজেটে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া নিয়েও। মধ্যবিত্ত সংক্রান্ত প্রশ্নটি শুনে দৃশ্যতই খেই হারিয়ে ফেলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। তার পরে সেই বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে শিক্ষা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দিতে শুরু করেন। যা থেকে স্পষ্ট যে, মধ্যবিত্তের জন্য তাঁর বাজেটে তেমন কোনও সংস্থান না থাকায় (বিশেষত আয়কর ছাড় সংক্রান্ত) প্রশ্নের মুখে পড়ে তিনি খানিক বিড়ম্বিত।

সর্বসমক্ষে বাজেট পেশের পর তাঁর অর্থমন্ত্রীকে যে খানিক বিড়ম্বনায় পড়তে হতে পারে, তা সম্ভবত অনুমান করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নির্মলা বাজেট পেশ করার অব্যবহিত পরেই সমাজমাধ্যমে মোদী লেখেন, ‘১৪০ কোটি ভারতবাসীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এই বাজেট। দেশের সংস্কারযাত্রা এতে আরও শক্তিশালী হল। বিকশিত ভারতের রোডম্যাপ আরও স্পষ্ট হল।’ বস্তুত, মোদী নিজেই জনগণের উদ্দেশে ভাষণে বাজেটের ‘উন্নয়নমূলক’ দিকগুলি ব্যাখ্যা করে দেন। তিনি বলেন, ‘‘সেমিকন্ডাক্টর, বায়োফার্মার মতো নতুন নতুন শিল্পকে এই বাজেট যে ভাবে সমর্থন করেছে, তা অভূতপূর্ব। দেশের যুবসমাজ যাতে ভারতের বাণিজ্যচুক্তির সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করেছে বাজেট। নির্মলাজিকে ধন্যবাদ।’’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‘বাজেট আমাদের শিল্পকে লোকাল (স্থানীয়) থেকে গ্লোবাল (বৈশ্বিক) হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এতে বিকাশের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বাজেটের সমস্ত পদক্ষেপ আসলে বিকশিত ভারতের গতিকেই আরও বাড়িয়ে দেবে। যে কোনও দেশের সবচেয়ে বড় পুঁজি তার নাগরিকেরা। আমাদের এই সরকার সবসময় নাগরিকদের সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগী হয়েছে। এটা যুবশক্তির বাজেট। এখানে যুবদের স্বপ্ন, সঙ্কল্প এবং গতি রয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা নেতৃত্ব, আলাদা আলাদা সৃষ্টি গড়ে উঠবে। দেশের যুব সম্প্রদায়কে আমার অভিনন্দন। এই বাজেটে বেকারত্ব ঘুচবে।’’

রবিবার নিয়ে টানা নবম বার জন্য সংসদে বাজেট পেশ করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা। বাজেট বক্তৃতা শুরু হয়েছিল বেলা ১১টা নাগাদ। দেড়ঘন্টা পর, বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ এসটিটি বৃদ্ধির ঘোষণা করে তিনি। নির্মলার বাজেট ভাষণ শেষের আগেই ২,৩০০ পয়েন্টের বেশি পড়ে যায় সেনসেক্স। নিফটি-৫০ সূচক নেমে যায় ২৪,৫৭১.৭৫ পয়েন্টে। পরে অবশ্য কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় বম্বে ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ। তাতে লোকসান কিছুটা কমলেও লগ্নিকারীদের মুখের হাসি ফেরেনি। উল্টে আগামী কয়েক দিন পতনের আশঙ্কায় মাথায় হাত পড়েছে তাঁদের।

শেয়ার বাজারের নিয়ম অনুযায়ী, যে কোনও লেনদেনে লগ্নিকারীদের দিতে হয় এসটিটি। এ বারের বাজেটে তা আড়াই গুণ বৃদ্ধি করেছেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা। এত দিন স্টক কেনাবেচার ক্ষেত্রে ফিউচারের উপর করের মাত্রা ছিল ০.০২ শতাংশ। সেটাই এ বার বাড়িয়ে ০.০৫ শতাংশ করেছেন তিনি। অন্য দিকে, অপশন লেনদেনের ক্ষেত্রে ০.০১ শতাংশ থেকে এসটিটি বাড়িয়ে ০.১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, বাজেটে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর এ-হেন ঘোষণাই শেয়ার বাজারকে ‘অস্থির’ করে তুলেছে। ‘ম্যাকার্টিক ওয়ান’-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তথা বিজ়নেস পার্টনার হেড কুণাল আচার্যের কথায়, ‘‘ফিউচার ও অপশন দু’টি ক্ষেত্রেই যে ভাবে কর বেড়েছে, তাতে লগ্নিকারী ও ব্রোকারেজ ফার্ম, উভয় পক্ষেরই লাভের অঙ্ক কমবে। সেই কারণেই তাঁদের মধ্যে শেয়ার ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গিয়েছে। ফলে দ্রুত পড়েছে সূচক।’’

বম্বে ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ ক্ষতবিক্ষত হওয়ার নেপথ্যে দ্বিতীয় কারণ হিসাবে বাজেটের মূলধনী ব্যয়ের ঘোষণাকেও দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। আসন্ন আর্থিক বছরে (২০২৬-’২৭) ওই ব্যয় ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা ধার্য করেছেন মোদী সরকারের অর্থমন্ত্রী। চলতি অর্থবর্ষের (২০২৫-’২৬) নিরিখে অবশ্য তা কিছুটা বেশিই। গত বছরের বাজেটে মূলধনী ব্যয়ের অঙ্ক ১১.২ লক্ষ কোটি টাকা রেখেছিলেন নির্মলা। সেই প্রসঙ্গে কুণালের বক্তব্য, ‘‘মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধি হলেও বাজেটে কোনও সুনির্দিষ্ট খাতে খরচের কথা বলা হয়নি। ফলে টাকা কোথায়, কী ভাবে ব্যয় হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকছেই। এর প্রভাবই বাজারে দেখা গিয়েছে।’’

এ বারের বাজেটে আমজনতাকে স্বস্তি দিতে আয়কর ছাড়ের কোনও ঘোষণা করা হয়নি। গত কয়েক বছরে ব্যাঙ্ক এবং ডাকঘরের প্রথাগত বিনিয়োগে সুদের হার হ্রাস পাওয়ায় কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই মিউচুয়াল ফান্ডের দিকে মুখ ঘুরিয়েছিলেন মধ্যবিত্তদের একাংশ। ফলে বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পমেয়াদি মূলধনী লাভে কর ছাড়ের ঘোষণার ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন তাঁরা। তাঁদের হতাশই করেছেন নির্মলা।

বাজেটের দিন শেয়ার বাজারে সর্বাধিক লোকসানের তালিকায় উপরের দিকে থেকেছে ব্যাঙ্কিংয়ের স্টক। উদাহরণ হিসাবে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (এসবিআই) কথা বলা যেতে পারে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতা শেষ করার কিছু ক্ষণের মধ্যেই রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ পড়়ে যায়। দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাঙ্ক এইচডিএফসি-র সূচকে প্রায় দেড় শতাংশ পতন লক্ষ করা গিয়েছে।

ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রের উন্নতির জন্য বাজেটে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি তৈরির কথা ঘোষণা করেন নির্মলা। যদিও তা লগ্নিকারীদের খুশি করতে পারেনি। কোনও রকমের করছাড় বা আর্থিক সুযোগ-সুবিধার কথা না থাকায় ভোগ্যপণ্যের সংস্থাগুলির শেয়ারের দরও ঊর্ধ্বমুখী হয়নি।

এত দিন পর্যন্ত বিদেশি লগ্নিকারীরা কেবলমাত্র এফপিআই বা এআরআই চ্যানেলের মাধ্যমে ভারতের শেয়ার বাজারে লগ্নি করতে পারতেন। এ বারের বাজেটে সেই নিয়ম বদলেছে কেন্দ্র। ফলে আগামী দিনে সরাসরি বিনিয়োগ করতে পারবেন তাঁরা। তবে ডলারের নিরিখে যে ভাবে টাকার দাম পড়ছে, তাতে বম্বে বা ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে লগ্নি তাঁদের জন্য লাভজনক নয়। ফলে নির্মলার নিয়ম বদলের ঘোষণা বিদেশি লগ্নি কতটা টানতে পারবে, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। টাকার দামে পতন রুখতেও কোনও ঘোষণা করেননি নির্মলা।

সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক কারণে আবার শক্তিশালী হয়েছে ডলার। ফলে দাম কমেছে সোনা এবং রুপোর। নির্মলার বাজেট বক্তৃতার দিনেও দুই ধাতুর দামের পতন অব্যাহত ছিল। রবিবার প্রায় নয় শতাংশ হ্রাস পায় হলুদ ধাতুর দাম। রুপোর ক্ষেত্রে ২.৪৩ শতাংশের পতন লক্ষ করা গিয়েছে। নিফটিতে ধাতু ও ধাতু সংকরের সংস্থাগুলির শেয়ারের দর পড়েছে প্রায় সাড়ে চার শতাংশ।

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা সদ্যপ্রাক্তন বিজেপি সভাপতি জেপি ন়ড্ডা বলেন, ‘‘এই বাজেট দূরদৃষ্টির বাজেট। যা ভারতকে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে মাথা তোলার লক্ষ্যে কয়েক কদম এগিয়ে দেবে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা ঐতিহাসিক। যুব সমাজের সামনে নতুন দিশার সঞ্চার ঘটিয়েছে এই বাজেট।’’

লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী প্রত্যাশিত ভাবেই বাজেটের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করেছেন, ‘এই বাজেট ভারতের প্রকৃত সংকটের বিষয়ে পুরোপুরি অন্ধের ভূমিকা পালন করেছে। বেকারদের কাজ নেই, উৎপাদন কমছে, বিনিয়োগকারীরা তাঁদের পুঁজি তুলে নিচ্ছেন, কৃষকেরা হতাশায়— এই সব কিছুকেই উপেক্ষা করা হয়েছে।’ পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী তথা বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অমিত মিত্রের বক্তব্য, ‘‘মানুষের স্বার্থের কোনও কথা ভাবা হয়নি বাজেটে। অভাবনীয় সমস্ত ক্ষেত্রে বরাদ্দ কমেছে। শিক্ষায় বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সারের ভর্তুকিতে কাটছাঁট করা হয়েছে। তফসিলি জাতি, উপজাতিভুক্তদের সামাজিক সুরক্ষা খাতেও বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ, এই সরকার শিক্ষার কথা ভাবছে না, কৃষকের কথা ভাবছে না। এমনকি, অনগ্রসর অংশের সামাজিক সুরক্ষাও বিপন্ন।’

Stock Market News Sensex Nifty Nirmala Sitharaman
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy