ষাটের দশক বা সত্তরের দশকের বাংলা ছবিতে একটা দৃশ্য প্রায়ই দেখা যেত। বাড়ির কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তৎক্ষণাৎ ডাক্তারবাবুকে খবর দেওয়া হলে তিনি কিছু ক্ষণের মধ্যে এসে রোগীকে দেখে যেতেন। সঙ্গে থাকত মাঝারি সাইজের একটি ভারী ব্যাগ। তাতে থাকত প্রয়োজনীয় ওষুধপাতি, ইঞ্জেকশন। ব্যাগে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকলে তিনি খসখস করে ওষুধ লিখে দিতেন। তেমন গুরুতর অবস্থা বুঝলে তিনি রোগীকে হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দিতেন। চলে যাওয়ার সময় বাড়ির কেউ তাঁর ব্যাগ বহন করে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। সিরিয়াস কিছু বুঝলে ডাক্তারবাবু রোগীর সামনে না বলে সেই ব্যক্তিকেই বলে যেতেন।

নব্বইয়ের দশকের সিনেমাতেও এই চিত্রের হেরফের হয়নি। তখন ছিল ‘ফ্যামিলি ফিজ়িসিয়ান’। পরিবারের যে কোনও বিপদে আপদে তিনিই একমাত্র সহায়। কিন্তু হালফিলের বাংলা ছবিতে সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না। সাহিত্য বা চলচ্চিত্র, দুটোই তো সমাজের দর্পণ। সমাজ বদলালে শিল্প সাহিত্যে তার প্রভাব তো পড়বেই।

এই চরম সমস্যার সম্মুখীন আমরা কম বেশি সকলেই। কেরিয়ারের স্বার্থে বা কর্মসূত্রে অধিকাংশ বাড়ির ছেলেমেয়েই হয় বিদেশে বা অন্য কোনও দূর শহরে পাড়ি দেয়। বাড়িতে পড়ে থাকেন বৃদ্ধ বাবা-মা। কখনও ছেলেমেয়েরা তাঁদের নিয়ে যেতে চায় না, আবার কখনও তাঁরা নিজেরাই শিকড় ছেড়ে যেতে চান না। বেঁচে থাকেন একে অন্যের সাহচর্যে। একান্নবর্তী পরিবার এখন রূপকথার মতো। খুব কম বাড়িতেই গুটিকয়েক লোকজন থাকে। মফস্সলে যেন ঘরে ঘরে বৃদ্ধাশ্রম। একশো ত্রিশ কোটির ভারতবর্ষ যে কত নির্জন, ভিড়ে ঠাসা মেট্রোপলিটন শহরের বাইরে না গেলে বোঝা যায় না।

হঠাৎ করে যদি কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন আর এক জন কী করবেন, কাকে ডাকবেন, খুঁজে পান না। স্মার্ট ফোন আমাদের জীবনযাত্রাকে অনেকটা স্মার্ট করলেও পুরনো দিনের বাবা-মায়েরা এখনও ততটা দড় হয়ে উঠতে পারেননি। নেট অন করে গুগল থেকে অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবাতে ফোন করে অ্যাম্বুল্যান্স ডাকবেন; আমাদের সনাতন ভারতবর্ষ এখনও অতটা স্মার্ট নয়। ছেলেমেয়ের কাছে ধাতানি খেয়ে নাম্বার দেখে বা নাম্বার টিপে কোনও রকমে ফোন করতে হয়তো তাঁরা শিখেছেন। সেই সঙ্কটজনক মুহূর্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ফোন করেন পরিচিত ডাক্তারবাবুকেই। কারণ সেই মুহূর্তে তিনিই একমাত্র আশা ও ভরসা। সেই ডাক্তারবাবু যদিও বা হাজার ব্যস্ততার মাঝে ফোন রিসিভ করেন; সব শোনার পর কী অবলীলায় বলে দেন, ‘পেশেন্টকে বাড়িতে বা নার্সিংহোমে নিয়ে আসুন।’ কিন্তু বলার সময় তিনি একবারও উল্টো দিকের ছবিটা দেখার চেষ্টা করেন না। যে মানুষটি নিতান্ত অসহায় ও নিরুপায় হয়ে সেই ডাক্তারবাবুকে একবার বাড়িতে আসার জন্য কাতর আবেদন জানাচ্ছেন, তাঁর মানসিকতা বিবেচনা করার প্রয়োজন মনে করেন না। ভাবেন না যে নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকলে অবশ্যই নিয়ে যাওয়া হত। আর যে পেশেন্ট নিজে যেতে সক্ষম, তিনি তো অনায়াসেই ওপিডিতে গিয়ে দেখিয়ে আসতে পারেন। তার জন্য ডাক্তারবাবুকে বাড়িতে ডাকার কী প্রয়োজন! যে অসুস্থ মানুষটি যন্ত্রণায় ছটফট করছেন অথবা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন, তাঁকে কী ভাবে ওই অবস্থায় টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া যায়! মানুষ তো বলে কয়ে অসুস্থ হয় না। হঠাৎ করেই হয়। আমাদের সমাজে যেখানে আধ ঘণ্টার মধ্যে পিৎজ়া ডেলিভারি হয়, দশ মিনিটের মধ্যে সুইগি বা জোম্যাটোর বাইক বিরিয়ানি নিয়ে হাজির হয়ে যায়, সেখানে আধ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাম্বুল্যান্স-ডাক্তার পাওয়া যায় না।

মানছি ডাক্তারবাবুদেরও সারা দিনে প্রচুর পেশেন্ট দেখতে হয়। ওপিডিতে লম্বা লাইন। তাঁরাও অমানুষিক পরিশ্রম করে মানুষকে সুস্থ করে তোলেন। তার পর আর তাঁদের পক্ষে পেশেন্টের বাড়িতে যাওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু মানবিকতার খাতিরে অল্প কিছু ডাক্তারও যদি আমাদের সমাজে থাকেন, যাঁরা চরম বিপদের দিনে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন, তা হলে সাধারণ মানুষ একটু ভরসা পায়। মনে জোর পায়। বিপদের দিনে মনে হবে আর কেউ না থাক, অন্তত এক জন ডাক্তারবাবু আছেন যাঁকে রাত্রি দুটোর সময় খবর দিলেও তিনি আসবেন। এটা হয়তো নিছকই কষ্টকল্পনা।

আজও আমাদের সমাজে ঈশ্বরের পরের স্থান দেওয়া হয় ডাক্তারকে। মরণাপন্ন রোগীকে যখন এক জন ডাক্তার সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দেন, তখন রোগীর পরিবারের কাছে তিনি যেন ঈশ্বরপ্রেরিত দূত হয়ে দেখা দেন। কিন্তু এমন কিছু পরিস্থিতি মানুষের জীবনে আসে, যখন চাইলেও সময়ে ডাক্তার পাওয়া যায় না। এমনকি বাড়তি টাকার বিনিময়েও না। 

কিছু রোগ আছে, যেগুলোতে রাতারাতি নার্সিংহোমে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। হয়তো কারও শুগার হঠাৎ করে কমে গিয়েছে। কারও প্রেশার হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে। বুকের ব্যথা মনে হলেও হয়তো আসলে সেটা গ্যাসের ব্যথা। একটা ছোট্ট ওষুধেই ঠিক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু রোগীর পক্ষে তো বোঝা সম্ভব নয়, অসুখটা কী পর্যায়ের। অনেক সময় রোগী বা তাঁর পরিবার অহেতুক আতঙ্কে ভোগেন। ভাবেন হয়তো বড় কিছু ঘটে গেল। তাই, ঝুঁকি না নিয়ে বাধ্য হয়ে নার্সিংহোমে নিয়ে যান। আর সেখানে গিয়ে পড়লে আর দেখতে হচ্ছে না। মামুলি জিনিসটাকে শুরুতেই ভয় দেখিয়ে বিরাট কাণ্ড বাধিয়ে ফেলা হবে। টেস্টের পর টেস্ট চলতেই থাকে। অকারণে বিলের অঙ্ক বেড়ে চলে। আর মেডিক্লেম থাকলে তো কথাই নেই। অথচ ডাক্তারবাবুর সামান্য চিকিৎসায় যে রোগী ভাল হয়ে উঠতে পারত, তাকে অকারণে অনেকগুলো টাকা গচ্চা দিতে হয়। মুনাফা লোটে নার্সিংহোমগুলো।

বিধানচন্দ্র রায়ের মতো কিংবদন্তি ডাক্তারও সারা দিন রোগী দেখার পর হঠাৎ কল এলে যেতে পিছপা হতেন না। তারাশঙ্করের ‘আরোগ্য নিকেতন’, বা বনফুলের ‘অগ্নীশ্বর’ পড়লেও সেই ছবি দেখতে পাওয়া যায়। তারও আগে ছিল কবিরাজ। সব গ্রামেই এক জন নামজাদা কবিরাজ থাকতেন। জড়িবুটি দিয়েই তিনি মানুষকে সুস্থ করে তুলতেন। তাকেও যে কোনও সময় পাওয়া যেত। হোমিয়োপ্যাথিতেও একই ছবি। কিংবদন্তি ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার কোথায় না ছুটে গিয়েছেন। বেশ কয়েক বছর আগে পর্যন্তও দিন হোক বা রাত, ডাক্তারকে বাড়িতে ডাকলে পাওয়া যেত। আসতে একটু দেরি হলেও মুখের ওপর ‘না’ বলতেন না। ভরসা করা যেত যে তিনি আসবেনই। কিন্তু এখন আর সে দিন নেই। পোস্টমডার্ন যুগে বাস করে মোবাইলের একটি মাত্র ক্লিকে আমরা বাড়িতে বসেই পেয়ে যাই জীবনযাপনের অত্যাধুনিক উপকরণ। হিরের থেকে জিরে সবই পাই। এমনকি প্রেসক্রিপশন আপলোড করলে অনলাইনে ওষুধও বাড়িতে হাজির হয়ে যায়। শহরের বিভিন্ন দেওয়ালে নার্স বা আয়া সেন্টারের বিজ্ঞাপনও চোখে পড়ে। কিন্তু কোনও ক্লিকেই জীবনদায়ী ডাক্তার পাই না। এখন তো সব কিছুতেই অ্যাপ হয়। এমন কোনও অ্যাপ হয় কি, যেখানে দরকারের সময় ডাক্তার পাওয়া যাবে! দেশ এত উন্নত যে চাঁদেও বিক্রম পৌঁছে গেল। কিন্তু প্রদীপের নীচেই যে গাঢ় অন্ধকার।

অথচ সমাধানের রাস্তা কিন্তু সহজেই বার করা যায়। মানছি, ওপিডি ছেড়ে ডাক্তারের পক্ষে রোগীর বাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রাইভেট কল নেবেন, এমন ডাক্তারদের নথিভুক্ত করা যেতেই পারে। যেমন কোনও বড় রেস্তরাঁয় বসেও খাওয়া যায়, আবার সুইগি–জোম্যাটো মারফত অর্ডারও করা যায়। হয়তো সেই ডেলিভারি দেওয়ার জন্য আলাদা লোকের ব্যবস্থা আছে। যিনি শুধু অনলাইন অর্ডার প্যাকিং ও ডেলিভারির ব্যাপারটাই দেখবেন। কোথাও কোথাও অনলাইন ডেলিভারির আলাদা কাউন্টারই করা হয়েছে। রেস্তরাঁগুলি যদি পারে, নার্সিংহোমগুলিই বা পারবে না কেন?‌ তারাও তো ডাক্তারদের একটা আলাদা প্যানেল তৈরি করতে পারে। যাঁরা শুধু বিপন্ন মানুষের বাড়িতে গিয়েই চিকিৎসা করবেন। রোটেশন করে সিনিয়র ডাক্তারদেরও পাঠানো যেতে পারে। ছোট শহরের নার্সিংহোমগুলিও এমন দু’এক জন ডাক্তারকে এই কাজে ব্যবহার করতেই পারে। একটা বিপদের দিকও আছে। নার্সিংহোম থেকে ডাক্তার গেলে তাঁর ওপর নার্সিংহোমের একটা চাপ থাকতেই পারে। তিনিও হয়তো প্রয়োজন না থাকলেও ভর্তি হওয়ার নিদান দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে, অন্য কোনও সংস্থাও এগিয়ে আসতে পারে। কয়েক জন ডাক্তার নিজেদের উদ্যোগেও এ রকম একটা সংস্থা চালু করতে পারেন। সরকারি উদ্যোগেও বিভিন্ন শহরে পরীক্ষামূলক ভাবে এই পরিষেবা শুরু করা যেতে পারে।

একটা ফোনে দশ মিনিটের মধ্যে যদি গাড়ি বা বিরিয়ানি চলে আসে, তা হলে এক জন চিকিৎসককে পাওয়া যাবে না কেন?‌ এত প্রযুক্তির জয়জয়কার, এত ডিজিটালের আস্ফালন, অথচ চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে পরিষেবা ছয়ের দশকে পাওয়া যেত, তা এখন পাওয়া যাবে না কেন?‌ জেলা সদর, ছোট শহরে এই পরিষেবা ছড়িয়ে দেওয়া যাবে না কেন?‌

জানতে ইচ্ছে করে জীবনের দাম না তাঁদের ইগো বা সময়ের দাম— কোনটা বড় এখনকার ডাক্তারদের কাছে!