Advertisement
E-Paper

সে বার লড়াই হল ব্রাউনিং বনাম শেলি

এক বার বিপরীতে জবরদস্ত কমিউনিস্ট নেতা। এক পূজাপ্রাঙ্গণে দেখা হল। এগিয়ে এসে বললেন, ‘‘দিদি, আপনার কাছে হেরে গিয়েছি।’’ আমি বললাম, ‘‘ছোট ভাই জিতলে দিদি খুশিই হত।’’ রামায়ণের যুগের কথা তো নয়। স্বাধীনতার পর প্রথম সাধারণ নির্বাচন হল ১৯৫২ সালে। তখন ২১ বছর বয়স না হলে ভোটার হওয়া যেত না। আমি সবে সেই বয়সে পৌঁছেছি, কিন্তু ভোটার লিস্টে নাম তখনও ওঠেনি। অতএব ভোট দিতে পারিনি। মাসতুতো, পিসতুতো দাদা-দিদিরা দুষ্টুমি করে পিছনে লাগল, বলতে লাগল— অর্বাচীনদের ভোট থাকে না। কী আর করব!

কৃষ্ণা বসু

শেষ আপডেট: ১২ মে ২০১৬ ০০:০০
ঘুঁটি পালটাল। প্রথম যুক্তফ্রন্ট, শপথ নিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়। ১৯৬৭

ঘুঁটি পালটাল। প্রথম যুক্তফ্রন্ট, শপথ নিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়। ১৯৬৭

স্বাধীনতার পর প্রথম সাধারণ নির্বাচন হল ১৯৫২ সালে। তখন ২১ বছর বয়স না হলে ভোটার হওয়া যেত না। আমি সবে সেই বয়সে পৌঁছেছি, কিন্তু ভোটার লিস্টে নাম তখনও ওঠেনি। অতএব ভোট দিতে পারিনি। মাসতুতো, পিসতুতো দাদা-দিদিরা দুষ্টুমি করে পিছনে লাগল, বলতে লাগল— অর্বাচীনদের ভোট থাকে না। কী আর করব!

পাঁচ বছর অপেক্ষার পর পরবর্তী নির্বাচন এল ১৯৫৭ সালে। সেই প্রথম ভোট দিলাম। তত দিনে বিবাহ হয়ে গিয়েছে। ১ নং উডবার্ন পার্কে শ্বশুরগৃহে থাকি। ভোটার লিস্টে নাম বাপের বাড়ির পাড়ায়, বালিগঞ্জে। সেখানে গিয়ে ভোট দিয়ে এলাম। অবশ্য আমাদের এলগিন রোড এলাকায় ভোটটা বেশি উত্তেজনার ছিল। সেখানে কংগ্রেস প্রার্থী মানুদা, অর্থাৎ সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়।

এর মধ্যে হঠাৎ চারি দিকে হইচই ফেলে দিয়ে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় কংগ্রেস ছেড়ে দিয়ে বামপন্থীদের প্রার্থী হয়ে পুনরায় উপনির্বাচনে দাঁড়িয়ে গেলেন। ১৯৫৮ সালের অগস্ট মাস। আমি উডবার্ন পার্কের বাড়িতে টাইফয়েডে শয্যাশায়ী। মানুদা ও মায়াবউদি প্রচারে বেরিয়ে আমাকে দেখতে এলেন। মানুদা বললেন, ‘তুমি সাবধানে ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে আমাকে ভোট দিয়ে এসো’, আমি তত দিনে ওই এলাকার ভোটার। মায়াবউদি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, একদম কোথাও যাবে না। ওঁর নিজস্ব ইংরেজি ঢঙে দৃঢ় ভাবে বললেন, ‘গেটিং ওয়েল ইজ মাচ মোর ইম্পর্ট্যান্ট!’ আমার ভোট ছাড়াই সিদ্ধার্থশঙ্কর খুব ভাল ভাবে জিতলেন। পরবর্তী কালে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় বামপন্থীদের পরিত্যাগ করে পুরনো দল কংগ্রেসে ফিরে গিয়েছিলেন।

Advertisement

কোথায় সেই ১৯৫৭-৫৮ সালের নির্বাচন! এখন আমি ভোট দিতে গেলাম ২০১৬ সালের পশ্চিমবাংলার রাজ্য নির্বাচনে। মাঝখানে পার হয়ে গিয়েছে ছ’টি দশক। সে দিনের তরুণী আমি আজ চলেছি হুইলচেয়ারে বাহিত হয়ে বাড়ির কাছেই ভোটকেন্দ্রে। পথঘাট বেশ শুনশান। শুনলাম, নির্বাচন কমিশন এ বছর খুব কড়া। পথে দাঁড়িয়ে জটলা করা, আড্ডা দেওয়া চলবে না। অতি উত্তম প্রস্তাব। আমি নিজে চারটি পার্লামেন্টারি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। তখনকার নির্বাচন কমিশন ছিল দুর্বল। কেন্দ্র থেকে রাজ্যে অবজার্ভার পাঠানো হত। তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই শুধু অবজার্ভ করতেন, অসহায় ভাবে চেয়ে থাকতেন। শাসক দলের প্রচণ্ড দাপটের কাছে নিরুপায়। ২০০৪ সালের পার্লামেন্টারি নির্বাচন পশ্চিমবাংলায় বেশ প্রহসনে পরিণত হয়েছিল। তখনকার নির্বাচন কমিশনের হয়ে রাজ্যে যিনি নির্বাচন দেখভাল করতে এসেছিলেন, সেই চিফ অবজার্ভার আফজল আমানুল্লা রিপোর্ট দিয়েছিলেন— পশ্চিমবাংলার ৪২টি নির্বাচন কেন্দ্রেই পুনর্নির্বাচন হওয়া উচিত। সেই রিপোর্ট অনুসারে পুনর্নির্বাচন অবশ্য করে উঠতে পারা যায়নি, কিন্তু তখন থেকে ধীরে ধীরে নির্বাচন কমিশনকে আরও ক্ষমতাশালী করে তোলার চেষ্টা চলতে থাকে। ২০০৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে প্রথম আমরা নির্বাচন কমিশনকে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখি। গণতন্ত্রের পক্ষে এক নিরপেক্ষ, ক্ষমতাবান নির্বাচন কমিশন যে একান্ত জরুরি, এ বিষয়ে কোনও সংশয় নেই।

আমার লাউগড়গড় হুইলচেয়ার বড় রাস্তায় পড়তে দু’একটি গাড়ি চোখে পড়ল। হুইলচেয়ারে আসীন আমাকে দেখে কোনও কোনও গাড়ি গতি কমিয়ে পাশ দিয়ে গেল। এক জন হাত তুলে বললেন বন্দে মাতরম্। ভোট দিয়ে মোটরবাইকে চড়ে ফিরছেন দম্পতি, আমাকে দেখে বাইক থেকে নেমে পড়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পাড়ার ইস্তিরিওয়ালা আমাকে বলল, আজ তার রুজি-রোজগার বন্ধ। কেন্দ্রীয় বাহিনী বলে দিয়েছে কয়লার উনুন জ্বালানো চলবে না। কিন্তু সে তার নিজের ভোট নির্ভয়ে দিতে পারার গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে পারছে, তার জন্য কষ্ট হলেও এটুকু ত্যাগ স্বীকারে তার আপত্তি আছে মনে হল না। মানুষ বুঝে গেছে, গণতন্ত্র তার হাতে তুলে দিয়েছে এক মস্ত বড় হাতিয়ার। যত দীন-হীন হোক না কেন, শাসক বদলের ক্ষমতা তার হাতে। তার এই সচেতন অহংকারই গণতন্ত্রের ভিত্তি। সব রাজনৈতিক দল— কী শাসক, কী বিরোধী— সকলেরই এই অহংকারকে মান্য করে চলতে হয়।

ছয় দশক ধরে দেখা বিভিন্ন নির্বাচনের মধ্যে একটি আমার মনে বিশেষ ভাবে গেঁথে আছে। এই নির্বাচনটি ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসের, বলা যায়, মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতার কুড়ি বছর পরে ১৯৬৭ সালের নির্বাচন।

আমি এই নির্বাচন— পার্লামেন্টের এবং রাজ্যের— খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম হুগলির আরামবাগ এলাকায়। সেখানে অজয় মুখোপাধ্যায় লড়ছেন। সে বারই ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন পরাজিত হলেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, এ কথা অনস্বীকার্য। আমাদের সৌভাগ্য যে তার নেতৃত্বে ছিলেন মহাত্মা গাঁধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র (১৯৩৯ সালে গাঁধী-সুভাষ মতভেদ পর্যন্ত), জওহরলাল নেহরু, সর্দার পটেল, মৌলানা আজাদ। বলা যায় নক্ষত্রসমাবেশ।

দেশভাগে দীর্ণ ভারতে স্বাধীনতা যখন এল, তখন ক্ষমতা হস্তান্তর হল কংগ্রেস দলের হাতে। পরবর্তী কুড়ি বছর কেন্দ্র ও রাজ্যে কংগ্রেসেরই একদলীয় শাসন। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে প্রথম দেখা গেল মানুষের মনে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। ভোটের দিন হরিপালের এক দরিদ্র, সংখ্যালঘু গ্রামে ঘুরছিলাম, একটি কুটিরে বাড়ির মেয়েরা ডেকে নিলেন, দাওয়ায় মাদুর পেতে বসতে দিলেন। পরিবারের সবাই ভোট দিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। বাড়ির এক কর্তাব্যক্তি আমাকে বললেন, ‘‘এত কাল একটি দলকে ভোট দিয়েছি, এ বার ঘুঁটি পালটি দিব।’’ এই ‘ঘুঁটি পালটি দিব’ সংলাপটি ২০১১ সালের পশ্চিমবাংলার নির্বাচনে একটু অন্য ভাষায় আবার শোনা গিয়েছিল। মানুষ বাংলার চৌত্রিশ বছরের কমিউনিস্ট শাসন থেকে অব্যাহতি চাইছে। অনেক লেখক-শিল্পী, জ্ঞানীগুণী মানুষ আন্দোলনের শরিক হওয়ায় ফলে পরিশীলিত ভাষায় সংলাপটি দাঁড়াল ‘পরিবর্তন চাই’। এবং পরিবর্তন এল ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে।

১৯৬৭ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে কুড়ি বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেসের হাত থেকে ক্ষমতা স্খলিত হল। অজয় মুখোপাধ্যায়ের নির্বাচন অফিসে আরামবাগে বসে আছি, সঙ্গে আছেন শিশিরকুমার বসু ও আমাদের বালক-পুত্র সুগত। বাইরে বাজি ফাটার আওয়াজ, উল্লিসিত জনতার কোলাহল। অজয়বাবু আমাকে বললেন, তোমরা সন্ধ্যার অন্ধকার নামার আগে কলকাতা ফিরে যাও, কী জানি, যদি গণ্ডগোল হয়! সঙ্গে ছোট ছেলে রয়েছে। কলকাতায় ফিরে দেখলাম সারা শহরে লাল টুনি জ্বলছে আর ল্যামপোস্ট থেকে ঝুলছে বেগুন। কানা বেগুন তখনকার কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষের প্রতি এক অশোভন ইঙ্গিত।

পর দিন খবরকাগজে এক হাস্য ও করুণ রস মিশ্রিত খবর পড়লাম। চৌরঙ্গির কংগ্রেস অফিসে বিষাদের ছায়া। সবাই নতমস্তকে বসে আছেন। এমন সময় সিদ্ধার্থ রায়ের প্রবেশ। হাতে বিরাট কেকের বাক্স, ‘আমি জিতেছি’ ঘোষণা। কয়েক মুহূর্তের অপ্রস্তুত নীরবতা ভাঙলেন পরাজিত মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন। শান্ত ভাবে বললেন, সবাইকে কেক কেটে দাও।

১৯৭৭ সালের ইমার্জেন্সি-পরবর্তী নির্বাচনের কথা আমরা ভুলে যেতে পারি না। মানুষ গণতন্ত্রের মধ্য দিয়েই বিপুল, বিস্ময়কর পরিবর্তন এনেছিল। আবার যখন মনে হল, যাঁদের ক্ষমতায় আনা হয়েছে, তাঁরা তত দায়িত্বশীল নন, তখন পুরনো জমানাকে ফিরিয়ে আনতে দ্বিধা করেনি মানুষ। ১৯৫২ সাল থেকে ২০১৬ কত বিচিত্র নির্বাচন দেখলাম। এ বারের নির্বাচন-পূর্ববর্তী পরিবেশ আমাকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছে। ভারতীয় রাজনীতিতে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন বেশ কিছু দিন ধরেই প্রবেশ করেছে। ব্যাপারটা কেমন যেন গা-সহা হয়ে গিয়েছে। মানুষ যেন ধরে নিয়েছে যে, এই দু’টি কুপ্রথার সঙ্গে সহাবস্থান করা ছাড়া গতি নেই। এ বার নতুন করে যুক্ত হল প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি প্রবল ঘৃণা আর অশ্রাব্য ভাষার প্রয়োগ। কথায় বলে, দর্পহারী মধুসূদন। বাংলার বড় গর্ব ছিল যে এখানকার মানুষ সংস্কৃতিমনস্ক, বিদগ্ধ। সে দর্প চূর্ণ হয়ে গেছে।

গণতন্ত্রে ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক দল পরস্পরের শত্রু নন, বিকল্প। আমার চারটি পার্লামেন্টারি নির্বাচনে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে একটি বাক্যও উচ্চারণ করিনি। প্রথম বার আমার বিরুদ্ধে ছিলেন কমিউনিস্ট নেত্রী, আমার মতোই ইংরেজির অধ্যাপিকা। সাংবাদিকেরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন প্রিয় কবি কে? আমি বলেছিলাম ব্রাউনিং। তিনি বলেছিলেন শেলি। আমি জয়ী হয়ে পার্লামেন্টে যাওয়ার পর পঞ্জাবের সাংসদ আর এক ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী হেসে বলেছিলেন— তা হলে ব্রাউনিং-এর জয় হল। অপর এক বার বিপরীতে জবরদস্ত কমিউনিস্ট নেতা। পূর্বপরিচয় ছিল না। আমি জয়ী হওয়ার পর এক পূজাপ্রাঙ্গণে দেখা হল। তিনি এগিয়ে এসে বললেন, ‘‘দিদি, আমি আপনার ছোট ভাই। আপনার কাছে হেরে গিয়েছি।’’ আমি বললাম, ‘‘ছোট ভাই জিতলে দিদি খুশিই হত।’’

ভোট কেন্দ্রে যেতে যেতে ভাবলাম, গণতন্ত্র ব্যর্থ হলে সামনে থাকে অরাজকতা বা সামরিক একনায়কতন্ত্র। বিপন্ন গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে আগামী দিনের নির্বাচন হতে হবে দুর্নীতিমুক্ত, দুর্বৃত্ত থেকে সুরক্ষিত আর পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ নয়, সামান্য সৌজন্যবোধ। আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা দায়বদ্ধ।

ভূতপূর্ব লোকসভা সদস্য

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy