Advertisement
E-Paper

বিরোধীরা রাজনীতিটা ধরতে পারেননি

তৃণমূলের সমর্থকদের এক বড় অংশ নিম্নবর্গীয় মানুষ। আর নেতৃত্বে বাম আমলেই উঠে আসা, কিন্তু ‘ভদ্রলোক’-নিয়ন্ত্রিত বাম দলের পিছনের সারিতে থাকা, ছোট-মাঝারি ব্যবসায় যুক্ত, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যহীন উপ-মধ্য শ্রেণি। এটা অন্য রাজনীতির ভিত গড়েছে।ভোটের ফলপ্রকাশের আগের রাত। ‘আমার এক বেহালা-নিবাসী কাঠবাঙাল মামা ফোন করে জানতে চাইলেন, কী ভাইগ্না, আমরা ‘১৫৫’ পামু তো?’ এই মামাটি বাঙাল হিসেবে যেমন ‘কাঠ’, তেমনি ইস্টবেঙ্গল ক্লাব আর সিপিআইএমের নিখাদ ভক্ত। বাঙালত্ব, ইস্টবেঙ্গল আর ‘পার্টি’, এই ত্রিভুজই এই সহজসরল, হাসিখুশি মানুষটির জীবন ও জগৎ।

শিবাজীপ্রতিম বসু

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০১৬ ০০:০০

ভোটের ফলপ্রকাশের আগের রাত। ‘আমার এক বেহালা-নিবাসী কাঠবাঙাল মামা ফোন করে জানতে চাইলেন, কী ভাইগ্না, আমরা ‘১৫৫’ পামু তো?’ এই মামাটি বাঙাল হিসেবে যেমন ‘কাঠ’, তেমনি ইস্টবেঙ্গল ক্লাব আর সিপিআইএমের নিখাদ ভক্ত। বাঙালত্ব, ইস্টবেঙ্গল আর ‘পার্টি’, এই ত্রিভুজই এই সহজসরল, হাসিখুশি মানুষটির জীবন ও জগৎ। আমার জ্ঞানমতো ২০১১ থেকে ২০১৪ অবধি ভোটের ফলাফলের নিরিখে কী কী কারণে তাঁর বা তাঁদের স্বপ্নভঙ্গ হতেও পারে, তার ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেছি, খানিকটা শুনেই অধৈর্য তিনি বললেন, ‘কিন্তু বিবিসি যে কইল!’ খানিক পরে আবার ফোন। দীর্ঘদিন যে কলেজে পড়িয়েছি, তার এক শিক্ষাকর্মী। তৃণমূলের অন্ধ সমর্থক। তাঁর জিজ্ঞাসা, ‘স্যর, মার্জিন কমলেও আমরা সরকার গড়তে পারব তো?’ যত তাঁকে বোঝাই, বড়সড় অঘটন না ঘটলে তাঁদের চিন্তার কারণ নেই, তবু তাঁর উৎকণ্ঠা নাছোড়— ‘কিন্তু সেন্ট্রাল আইবি রিপোর্টে নাকি বলেছে...’

২০১৬-র এই নির্বাচন যখন ইতিহাসভুক্ত হয়ে যাবে, তখনও অনেকে অন্য কিছু উপাদানের সঙ্গে তাকে মনে রাখবেন, ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’ নির্বাচন হিসেবেও। কেবল সরলমতি কর্মী সমর্থকই নয়, খোঁজখবর-রাখা শিক্ষিতজন, এমনকী দুঁদে সাংবাদিক বন্ধুদেরও একটা বড় অংশ এই ধরনের উড়ো খবরে যেমন প্রভাবিত হয়েছেন, তেমনটা আগে দেখিনি। শহুরে শিক্ষিত-সমাজের স্বচ্ছন্দ বিচরণক্ষেত্র, বড় মিডিয়া থেকে সোশ্যাল মিডিয়া— ফেসবুক, ট্যুইটার, হোয়টস্অ্যাপ— উপচে পড়েছে জোটের চমকপ্রদ জয় সম্ভাবনার ‘খবরে’। অস্তিত্বহীন চ্যানেলের অলীক সংখ্যাতত্ত্বের ‘উদাহরণ’ দেখিয়ে দাবি করা হয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস আর ফিরছে না।

রাজনৈতিক ভাবে একই দাবি জোট-সেনাপতি সূর্যকান্ত মিশ্রের গলায়। প্রথম পর্বের ভোট মিটতেই, ‘জঙ্গলমহলের মানুষ তৃণমূলের প্রথম বলেই ছক্কা মেরেছেন’, বা, ‘১৯ তারিখেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী’ হয়ে যাবেন’ ইত্যাকার রণহুংকারের সঙ্গে বাণিজ্যিক এবং সোশ্যাল মিডিয়া মিশে জোটের প্রতি সম্মতি নির্মাণের চেয়েও তৃণমূলের বিরুদ্ধে এত বেশি বিভ্রান্তির ধূম্রজাল রচিত করেছে যে নিজেরা তাতেই বিশ্বাস করেছে, আর তৃণমূলের, তুলনায় কম-এলিট, সাধারণ নেতা-কর্মীদের অনেকের আত্মবিশ্বাসও টলিয়ে দিয়েছে। ফলপ্রকাশের পর যখন দেখা গেল ‘সকলি গরল ভেল’, যখন জোটের কর্মী-সমর্থকদের চরম দিশেহারা অবস্থা, তখন জোট-ভাবনার জনক, শিলিগুড়ির অশোক ভট্টাচার্যের কথা— ‘ফেসবুক, ট্যুইটার, হোয়টস্অ্যাপ-এ রাজনীতি হয় না, তার জন্য পথে নামতে হয়, আন্দোলন করতে হয়, মানুষের পাশে থাকতে হয়’— জোটপন্থীদের কিছুটা সম্বিৎ ফেরায়।

Advertisement

কিন্তু সত্যিই কি এটা ‘জোট’ ছিল? ‘ছিল’ বলছি এই জন্য যে, ইতিমধ্যেই ব্যর্থতার বোঝা একে অপরের কাঁধে চাপানোর খেলা শুরু হয়ে গেছে, এবং কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জানিয়ে দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বামেদের সঙ্গে ‘আসন-সমঝোতা’ ভোট মিটতেই শেষ হয়েছে। এই রাজ্যে বাম-কংগ্রেস বন্ধুত্ব হলে কেরল বা ত্রিপুরায় কী হবে, যেখানে তাদের সম্পর্ক যুযুধান? মতাদর্শেরই বা কী হবে? এক দিকে মার্ক্সবাদী আদর্শ ও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতায় গড়ে তোলা বাম পার্টি কাঠামো, অন্য দিকে মতাদর্শে মধ্যপন্থী ও পরিবারকেন্দ্রিক হলেও মোটের ওপর গণতান্ত্রিক কাঠামোর কংগ্রেস, দুইয়ের মিলমিশ কি অসম্ভব নয়? যদিও বামেরা কেন্দ্রে কংগ্রেসের নেতৃত্বে গড়া প্রথম ইউপিএ সরকারে ‘বাইরে থেকে’ সমর্থন দিয়েছিল, আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসামরিক পরমাণু চুক্তির প্রশ্নে সমর্থন তুলে নিয়ে সরকারকে দারুণ সংকটেও ফেলেছিল। এখন, বাম-কংগ্রেস উভয়েই তৃণমূলের ‘ত্রাসের’ শিকার বটে, কিন্তু বর্তমান বাস্তব কি বামেদের মন থেকে ১৯৭২-৭৭ এর ‘কংগ্রেসি সন্ত্রাস’ আর কংগ্রেসিদের মন থেকে ১৯৭৭ পরবর্তী বাম তথা সিপিএমের ‘লাগামহীন হিংসা’র স্মৃতিকে ছাপিয়ে যাবে?

এই সব বৈরিতার স্মৃতি যে অনেকটাই টাটকা তার প্রমাণ মিলল, যখন দেখা গেল প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর জেলা মুর্শিদাবাদেই ১০টি আসনে জোট-সঙ্গীরা ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’য়ে মাতলেন। ফলপ্রকাশের আগে অধীরবাবু স্বীকার করলেন, যে পরিমাণ সমর্থন বামপন্থীরা তাঁদের জুগিয়েছেন, সেই অনুপাতে সমর্থন কংগ্রেসিদের কাছ থেকে বামেদের ঝুলিতে গেছে কি না তার নিশ্চয়তা নেই! এর নেট ফল, একলা লড়ে, বিজেপি বিধানসভায় তিনটি আসন পেয়েছে। একই সঙ্গে, জোট-নেতারা ভেবেছিলেন, যে, নরেন্দ্র মোদীর উত্থানের সময় লোকসভা ভোটে বিজেপির পাওয়া ১৭% ভোট কমে ৪-৬ শতাংশে নেমে আসবে আর এই অবশিষ্ট ভোট পাবে জোট। যদিও ২০১৪ সালে ১৭%-এর মধ্যে পাহাড়ের ভোট বাদ দিয়ে বাকি ১৪.৫%-এর মধ্যে ১০%-এর বেশি (১০ লাখ ভোট!) বিজেপি ধরে রেখেছে। এই চার-সাড়ে চার শতাংশের অনেকটাই তৃণমূলে গেছে বলে যদি ধরেও নিই, তবু জোটের সঙ্গে তৃণমূলের ভোট-শতাংশের পার্থক্যের (প্রায় ৭%) মধ্যে ১.৫-২% ভোটের হিসেব পাই না! কিছুটা হয়তো কংগ্রেসের থেকে তৃণমূলে গিয়ে থাকতে পারে, বামেদের থেকেও যে যায়নি, তার গ্যারান্টি কী?

তবে বিজেপি বা জোটের প্রতি বিরাগেই নয়, তৃণমূ্লের প্রতি মানুষের সদর্থক ভোট বেড়েছে তার নানা জনমুখী কাজের জন্যও। রাজ্যের নানা অঞ্চলে সড়কপথে ভ্রমণ করলেই বোঝা যাবে রাস্তার (বিশেষত রাজ্য সড়কের) কতটা উন্নতি হয়েছে! এর সঙ্গে গরিব মানুষের জন্য দু’টাকার চাল, মেয়েদের জন্য কন্যাশ্রী, শিক্ষাশ্রী, যুবশ্রী, সবুজ সাথী— নানা জনপ্রিয় কার্যসূচিকে বিরোধীরা ‘অনুদানের রাজনীতি’ বলে নানা প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু এগুলির বদলে তাঁরা কী বিকল্প দেবেন, তা স্পষ্ট করেননি। বরং তাঁরা ব্যস্ত ছিলেন তৃণমূল আমলের ‘সারদা থেকে নারদা’ দুর্নীতি বা উড়ালপুল বিপর্যয় নিয়ে। বুঝতে পারেননি, সাধারণ মানুষের কাছে ‘শাসকের দুর্নীতি’র চেয়ে বড় বিষয় হল প্রাথমিক প্রয়োজনীয় বস্তু বা পরিষেবাগুলি প্রদানের ব্যবস্থা নিয়মিত কাজ করছে কি না, তার বিচার করা। এর পাশাপাশি, গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত কৃষি (বিশেষত, ধানের) বিপণন ও কৃষিপণ্য (বিশেষত, আলু) রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে কৃষক আন্দোলন গড়া। গ্রামের মানুষের সহানুভূতি পাওয়া যেত। সে ব্যাপারেও বিরোধীরা ব্যর্থ। সাংগঠনিক ভিত্তিও হারিয়ে ফেলেছেন তাঁরা, বিশেষত, বামেরা। ফলে, বিরোধী থাকার সময় তৃণমূল বা কংগ্রেস যে উপাদানগুলোর ওপর ভরসা করত— স্বতঃস্ফূর্ত ভোট, আধা-সামরিক বাহিনী, নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ ও মিডিয়ার প্রচ্ছন্ন সমর্থন— এ বার জোট তথা বামেরা তা-ই চেয়েছে। অন্য দিকে ভোটের সব ক’টি পর্যায়েই তৃণমূলের সংগঠন সক্রিয় থেকেছে।

তৃণমূলের নেতৃত্ব ও সমর্থনভিত্তির শ্রেণিচরিত্র ও তাদের জোরের জায়গাও বুঝতেও পারেননি তাঁরা। তৃণমূলের সমর্থকদের একটা বড় অংশ শহর ও গ্রামের নিম্নবর্গীয় মানুষ। আর নেতৃত্বে আছে বামফ্রন্টের সময়েই উদীয়মান (কিন্তু ‘ভদ্রলোক’-নিয়ন্ত্রিত বাম দলের পিছনের সারিতে থাকা) ছোট-মাঝারি ব্যবসা, ট্রেডিং, সাপ্লাই বা প্রোমোটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত (সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যহীন) উপ-মধ্য শ্রেণি, তৃণমূলের শাসনকালে যাদের অনেকেই নেতৃত্বের সামনের সারিতে চলে এসেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকে এদের নিয়ে তত্ত্ব করেন, শহুরে নাগরিক সমাজের বিপরীতে অস্তিত্ব বজায় রাখতে রাজনীতিকে কাজে লাগানো নিম্নবর্গের ‘রাজনৈতিক সমাজ’-এর গুরুত্বের কথা বলেন, অথচ, প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সময় (যেমন, এই ভোটে) পক্ষ নেন শিক্ষিত নাগরিক সমাজেরই!

শেষে বলতেই হয় তৃণমূলের জয়ের কান্ডারি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। তিনিই একাধারে তাঁর দল ও সরকার— অনেকটা (পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বাদ দিয়ে) আঞ্চলিক ইন্দিরা গাঁধীর মতো। জয়ললিতা বা মায়াবতীর মতো নেত্রীরাও অনেকটা তাই। ভারতীয় রাজনীতিতে এঁদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের যথাযথ ব্যাখ্যা না দিতে পেরে কেবল সীমাহীন এলিট তাচ্ছিল্যে ‘ওই মহিলা’ বলা যেতে পারে, কিন্তু তাতে তাত্ত্বিক লাভ তো হয়ই না, উলটে ‘নবান্ন’-এর দুয়ারদেশও ক্রমশ ঝাপসা হতে শুরু করে!

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy