Advertisement
E-Paper

ছিলেন ‘বাংলার মেয়ে’, হলেন ‘ঘরের মেয়ে’! সংখ্যার সমুদ্রে মন্থন করে ‘ডেটা আহরণ’ এবং কর্পোরেট রাজনীতির অআকখ

আই-প্যাকের কাজ কি প্রথাগত রাজনৈতিক সংগঠন করতে পারত না? প্রশান্ত কিশোরেরা মনে করেন, পারত না। কারণ, নেতারা নির্মোহ নন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকেই বড় সত্য হিসাবে মনে করেন।

স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৫৬
খোদ দলনেত্রী নিজের গায়ে আই-প্যাক মামলা টেনে এনে বুঝিয়ে দিয়েছেন দলে তাদের কী গুরুত্ব।

খোদ দলনেত্রী নিজের গায়ে আই-প্যাক মামলা টেনে এনে বুঝিয়ে দিয়েছেন দলে তাদের কী গুরুত্ব। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

প্রাচীন গ্রিকেরা বলেছিলেন, সব কিছুই সংখ্যা। এমনকি, শুভেন্দু অধিকারীও।

সংখ্যার সমুদ্র মন্থন করে আসে ‘ডেটা’। সেই ডেটা ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজন পেশাদারি নৈপুণ্য। পরামর্শদাতা সংস্থারা, তা সে শপিংমল ব্যবসা হোক বা ভোটে জেতার লড়াই, ডেটা বিশ্লেষণ করে গরল ও অমৃত পৃথক করে তুলে আনেন সাফল্যের কৌশল রচনার উপাদান।

ভবানীপুরে এ বার সংখ্যার সমুদ্রে ডুবেছেন তৃণমূলের রাজনৈতিক পরামর্শদাতারা।

Advertisement

শুভেন্দু তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই আগ্রাসী নেতা। মমতার যখন উত্থান হয়েছিল, সিপিএমের সামনে প্রায় সব কংগ্রেস নেতাই খানিক মিনমিন করতেন। ব্যতিক্রম মমতা। তিনি নিয়ে এসেছিলেন নতুন, তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষা। একই পরিস্থিতি এখন মমতা বিরোধী-শিবিরে। অনেকেই শিক্ষিত, ঘরে বসে রাজনীতি করতে পারেন। কিন্তু সামনে গিয়ে মিনমিন করেন। শুভেন্দু তার বিরল ব্যতিক্রম। গত বার নন্দীগ্রামে মমতার পরাজয়ের পরে ভবানীপুর অনেকটা টেস্ট ক্রিকেটের দ্বিতীয় ইনিংসের মতো। বাংলা সাংবাদিকতার ভাষায়, উত্তেজনা টানটান।

পরামর্শদাতাদের কাজ নানাবিধ। প্রথমত, সম্ভাব্য প্রতিকূলতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বরূপ আগাম আন্দাজ করা। ভবানীপুরের ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’। শুভেন্দু যে দাঁড়াবেন, এটা অমিত শাহ ঘোষণা করার আগেই স্পষ্ট ছিল। তাই প্রথাগত ঘোষণার আগেই তৃণমূলের পরামর্শদাতারাও দলের ‘দুর্গ’ মজবুত করার কাজ শুরু করেছিলেন। পাশাপাশি, ভোটার তালিকা নিয়ে যে সমস্যা হতে পারে, সেটাও আগাম আঁচ করে কাজ গোছাতে শুরু করেছিলেন তাঁরা। ভবানীপুরে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গিয়েছে প্রচুর। ৪৯,৪৩৫ জন বা প্রায় ২৪% বাদ পড়েছেন খসড়া এবং চূড়ান্ত তালিকা মিলিয়ে। ১,৫৯,২০১ জনের তালিকায় আরও ১৪,১৫৪ জন বিচারাধীন। এই পরিস্থিতিতে প্রতি বুথে কার নাম উঠছে, কার নাম বাদ যাচ্ছে, তা নিয়ে দৈনিক নজরদারি ও আইনি সহায়তা তাঁদের বড় কাজ। এক আই-প্যাক কর্মীর কথায়, ভোটার তালিকা ছোট হয়ে ভবানীপুরের লড়াই অনেকটাই ‘মাইক্রো ম্যানেজমেন্টের ব্যাপার’ হয়ে গিয়েছে।

পরামর্শদাতাদের এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল ‘মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট’। অর্থাৎ, পাড়া ও গোষ্ঠীভিত্তিক ভোটারদের পছন্দ-অপছন্দ বিশ্লেষণ। কোন বিষয় কার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কী ভাবে প্রত্যেক ভোটারের বাড়ি দলের প্রচার পৌঁছোনো যায়, তাঁদের প্রভাবিত করা যায়, ভোটদানের হার বাড়ানো যায়। ভবানীপুর বিধানসভার অন্তর্গত সাতটি পুর ওয়ার্ডেরই প্রতিনিধি তৃণমূলের। তাঁদের মাধ্যমে নানা ভাষা, ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছোট ছোট বৈঠক। সেই ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ।

দ্বিতীয়ত, ‘অর্গানাইজ়েশনাল অ্যাসেসমেন্ট’। সাংগঠনিক শক্তি ও দুর্বলতার পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন। কোন পাড়ায় কাকে দায়িত্ব দিলে কাজ হাসিলের সম্ভাবনা বেশি। কোথায় সব ভোটারের কাছে পৌঁছোতে গেলে লোক বেশি লাগবে সেই ভিত্তিতে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। ভবানীপুরে যেমন প্রথমে সাংগঠনিক দায়িত্ব ছিল সুব্রত বক্সী ও ফিরহাদ হাকিমের। নির্বাচনী প্রচারের মাঝে হঠাৎ ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হল মন্ত্রী জাভেদ খানকে। কারণ, সমীক্ষায় মনে হল ওই ওয়ার্ডে দলের ভোট বাড়াতে উনিই আদর্শ।

তৃতীয়ত, ‘হাইপারলোকাল স্ট্র্যাটেজি’। ২০২১ সালের নির্বাচনে মমতা ছিলেন ‘বাংলার নিজের মেয়ে’। মোদী-শাহ এবং বিজেপি নেতারা ‘বহিরাগত’। এ বার ভবানীপুরে মমতা হয়ে গিয়েছেন ‘ঘরের মেয়ে’। এটা বিধায়ক মমতার প্রচার। বিধায়ক, তদুপরি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভবানীপুরে কী কী কাজ করেছেন, সেই তথ্য যেন সব ভোটারের কাছে পৌঁছোয়, তা নিশ্চিত করা। উনি যে ওই কেন্দ্রের বাসিন্দা, সম্বৎসর থাকেন, এটাই প্রচারের মুখ্য বার্তা। এখানে শুভেন্দু ‘বহিরাগত’।

চতুর্থত, ‘টার্গেটেড ভোটার ম্যানেজমেন্ট’। সম্ভাব্য ভোটার চিহ্নিত করে ‘ফোকাস’ নির্ধারণ করা। ভবানীপুর ‘কসমোপলিটান কেন্দ্র’। বাঙালি যেমন আছেন, তেমনই আছেন গুজরাতি, পঞ্জাবিরা। বুথভিত্তিক তথ্যে দেখা গেল, গুজরাতিদের ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু পঞ্জাবিরা? এত দিন দলের পাশেই ছিলেন। এ বার? ওই এলাকায় পঞ্জাবিদের প্রভাবশালী নেতা অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের শ্বশুর। সম্ভবত সেই কারণেই মল্লিক বাড়ির মেয়েকে রাজ্যসভায় সদস্য করেছে তৃণমূল।

পঞ্চমত, তাৎক্ষণিক ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’। কোনও নেতার কোনও ভূমিকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা। গুজরাতি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে তো সেটা পুরো ছেড়ে দেওয়া যায় না! স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালিদের তুলনায় গুজরাতিদের বিশেষ অবদান নেই, ফস করে এমন মন্তব্য করে বসেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। বিজেপি তৎক্ষণাৎ সেই মন্তব্য পৌঁছে দেয় ভবানীপুরের গুজরাতি ভোটারদের কাছে। তাঁদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার খবর আসে বুথ স্তর থেকে। তৃণমূলে ইদানীং এমন ‘ক্ষত’ মেরামতে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা থাকে আই-প্যাকের। এ বারও দ্রুত মাঠে নামে তারা। ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর অসীম বসু সমাজমাধ্যমে মহুয়ার মন্তব্যের নিন্দা করেন ও স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর একটি বার্তা পড়ে শোনান। সেখানে মহুয়ার মন্তব্যের জন্য মমতা ক্ষমা চেয়েছেন। সেই বক্তব্য দ্রুত ভবানীপুরের গুজরাতি ভোটারদের কাছে ফেসবুক, হোয়াট্‌সঅ্যাপে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব অনেকটাই আই-প্যাকের।

একই ভাবে মহুয়া-মন্তব্যের পরে পরেই শিখদের ‘খলিস্তানি’ বলে অভিহিত করা শুভেন্দুর মন্তব্যের ভিডিয়ো পৌঁছে যায় ভবানীপুরের সব পঞ্জাবি মহল্লায়। পঞ্জাবি পাড়ায় প্রচার করতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েন শুভেন্দু।

বিরোধীদের অভিযোগের খণ্ডন তাৎক্ষণিক ভাবে ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ বা শুভেন্দুর অভিযোগের বিরুদ্ধে বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সমন্বয় চলে দলের আইটি সেলের সঙ্গে। কলকাতায় কেন্দ্রীয় অফিস ছাড়াও প্রতি বিধানসভায় আছে ‘ওয়াররুম।’ ভবানীপুরেও। সেখান থেকেই চলে সব ‘লোকাল ম্যানেজমেন্ট’।

এই কাজ কি প্রথাগত রাজনৈতিক সংগঠন করতে পারত না? প্রশান্ত কিশোররা মনে করেন, পারত না। কারণ, নেতারা নির্মোহ নন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকেই বড় সত্য হিসাবে মনে করেন। মমতার কেন্দ্রে না-হয় প্রার্থী বাছাই সংক্রান্ত কোনও সমীক্ষার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু বাকি আসনগুলির জন্য সেরা প্রার্থী বাছাইয়ের কাজে আই-প্যাকের সমীক্ষার একটা ভূমিকা থাকে। কোচবিহারের এক স্কুলশিক্ষক যেমন বলছিলেন, একদিন হঠাৎ তাঁর বাড়িতে আই-প্যাক পরিচয়ে এক তরুণ আসেন। সেই শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তবে নানা সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকেন। তাঁর কাছে স্থানীয় নাগরিক পরিষেবাগত সমস্যা, নেতাদের ভাবমুর্তি, পরামর্শ ইত্যাদি জানতে চান সেই আই-প্যাক কর্মী। নিয়মিত ব্যবধানে ফোন করেন সেই তরুণ। শিক্ষকের কথায়, “ওরা মতামত জানতে চায়। আমি বলি। যদি সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হয় মন্দ কী?” তবে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক তিনি। কারণ, তাঁর কথায়, একবার যদি জানাজানি হয়ে যায় যে, তাঁর সঙ্গে আই-প্যাকের যোগাযোগ আছে, তা হলেই তাঁর ঘাড়ে অনুরোধ-উপরোধের বোঝা চাপবে।

আই-প্যাকের এই সব সমীক্ষার সৌজন্যেই প্রার্থিতালিকায় স্থান পেয়েছেন আরামবাগের মিতালি বাগ। তিনি একেবারেই সাধারণ তৃণমূলকর্মী। স্বামী টোটোচালক। মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি কেন্দ্রে টিকিট পেয়েছেন ‘সর্বকনিষ্ঠ প্রধানশিক্ষক’ হিসাবে পরিচিত বাবর আলি। কুলপিতে মনোনয়ন পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক বর্ণালী ধাড়া।

তবে দলীয় কাজে আই-প্যাকের বাড়ন্ত প্রভাব তৃণমূলে কিছু অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। জেলার নেতারা টিকিট বা পদ হারালেই দোষ দেন আই-প্যাককে। পূর্বস্থলী উত্তরের তৃণমূল বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায় টিকিট না পেয়ে সরাসরি অভিযোগ করেন, আই-প্যাক তাঁর কাছ থেকে ২০ লক্ষ টাকা চেয়েছিল! টিকিট-খোয়ানো আর এক প্রাক্তন মন্ত্রী ফোনে আই-প্যাকের নাম শুনেই অশ্রাব্য গালি দিয়ে বলেন, “আমার টিকিট খেয়ে নিল!”

এক প্রবীণ সাংসদ বলছিলেন, আগে দলের যে আনুগত্য-ভিত্তিক কাঠামো ছিল, সেটা প্রায় পুরোই পাল্টে গিয়েছে। আনুগত্য-ভিত্তিক কাঠামো বলতে বোঝায় ব্লক স্তরের নেতারা কোনও না কোনও জেলা স্তরের নেতার অনুগামী। আবার জেলা স্তরের নেতারা দলনেত্রীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা কলকাতার নেতা। যথা মুকুল রায়, সুব্রত বক্সী, পার্থ চট্টোপাধ্যায় বা ফিরহাদ হাকিমদের অনুগামী। অবশ্য কিছু ব্যতিক্রমও ছিল। শিশির অধিকারী বা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের মতো জেলার বড় নেতারা সরাসরি নেত্রীরই অনুগামীই ছিলেন। এই পদ্ধতি আর চলে না। জ্যোতিপ্রিয়ের মতো সরাসরি নেত্রীর অনুগামী না হলে এখন আর আনুগত্যে পদ বা টিকিট আসে না। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী হতে পারলেও টিকিট মেলে। তবে মূলত প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য সম্ভাব্য সেরা প্রার্থীদের একটা তালিকা আই-প্যাকের তরফ থেকে যায় দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেকের দফতরে। পাশাপাশি থাকে দলের অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট ও গুরুত্বপুর্ণ নেতাদের পরামর্শ। দলনেত্রীর নিজস্ব নেটওয়ার্ক তো আছেই। এই সব থেকে ঝাড়াই-বাছাই হয়ে শেষমেশ দলনেত্রীর সিলমোহর পড়ে প্রার্থিতালিকায়।

উত্তরবঙ্গের এক প্রাক্তন বিধায়কের মতে নতুন কর্মপদ্ধতিতে তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের ডানা ছাঁটা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “নেতাদের নিজস্ব ক্যারিশ্মা, স্বতঃস্ফূর্ততার একটা ভূমিকা থাকে তাঁদের জনপ্রিয়তায়। কিন্তু এখন সবই শুধু নির্দেশ পালন। এক এক সময় মনে হয়, আমরাও বিনা মাইনের কর্মচারী হয়ে গিয়েছি।” হুগলির এক বিধায়কও এ বিষয়ে খানিক সহমত। তাঁর মতে, বর্তমান রাজনীতিতে নিশ্চয়ই পেশাদারিত্বের ছোঁয়া প্রয়োজন। কোথায় ঘাটতি, এসব বুঝতে বা মানুষের কাছে ঠিক ভাবে পৌঁছোতে এই ধরণের পেশাদারদের প্রয়োজন। কিন্তু তৃণমূলে আরও এক ধাপ এগিয়ে এই ব্যবস্থাটি ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের জন্য। তাঁর মতে, স্থানীয় নেতৃত্ব নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে শুধু কেন্দ্রীয় নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে দল দীর্ঘমেয়াদি ভাবে পেশাদার কর্মচারী-নির্ভর হয়ে উঠবে। তাঁর প্রশ্ন, “কত দিন আর কত লোককে মাইনে দিয়ে পুষবে দল চালানোর জন্য?” হাওড়া জেলার এক নেতার বক্তব্য, বাইরে থেকে চাকরিজীবী এনে নজরদারি বাড়িয়ে না হয় স্থানীয় নেতাদের চাপে রেখে দুর্নীতিতে লাগাম টানা গেল। কিন্তু এত চাকরিজীবীর মাইনে, যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার খরচ যোগাতে তো তা হলে শীর্ষনেতৃত্বকেও কোথাও না কোথাও হাত পাততেই হবে। তাঁর বক্তব্য, আগে তৃণমূল স্থানীয় ব্যবসায়ীদের থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করত। এখন ক্রমশ বড় শিল্পপতিদের উপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ছে।

ঘটনাচক্রে, নির্বাচনী বন্ড চালুর পরে দেশে সবচেয়ে বেশি ‘কর্পোরেট ফান্ডিং’ পাওয়া আঞ্চলিক দল হল তৃণমূল। ওই বন্ডের মাধ্যমে দলের মোট ১,৭০৫ কোটি টাকা আয়ের মধ্যে ১,৪২০ কোটি টাকা বা ৮৩ শতাংশই এসেছে ২০২১ সালের মে মাসে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে। তৃণমূল অবশ্য বলেছিল, তারা কারও কাছে হাত পাতেনি। তাদের কাজ যাঁদের ভাল লাগে, যাঁদের মনে হয়েছে তাদের দলের উত্থান রাজ্য তথা দেশের জন্য ভাল, তাঁরাই নিজেদের মতো করে দলের অজান্তেই দলকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে অনুদান দিয়েছেন। প্রসঙ্গত, ওই বন্ডে আগে দাতার নাম থাকত না। পরে অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সব দাতা-গ্রহীতার নামই প্রকাশিত হয়। দেখা যায়, দক্ষিণ ভারতের এক লটারি সংস্থা ও কলকাতার সঞ্জীব গোয়েন্‌কা গোষ্ঠী তৃণমূলকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা করেছে।

আই-প্যাকের ভালমন্দ প্রশ্নে অবশ্য প্রকাশ্যে সকলের মুখেই কুলুপ। খোদ দলনেত্রী নিজের গায়ে আই-প্যাক মামলা টেনে এনে বুঝিয়ে দিয়েছেন দলে তাদের কী গুরুত্ব। তাদের নিয়ে কোনও বক্তব্য পেশ করার এক্তিয়ার দলনেত্রী ও অভিষেক ছাড়া কারও নেই। তৃণমূল-আইপ্যাক সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন খাতে বইবে, তা কিন্তু অনেকটাই নির্ভর করছে ভবানীপুরের লড়াইয়ের ফলাফলের ওপর।

এ ছাড়াও আছে আরেকটি প্রশ্ন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার করা সত্ত্বেও বিজেপি কিন্তু বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্ভর নয়। তারা মনে করে, ‘রাশ’ থাকবে রাজনীতির হাতে। আদর্শে উদ্বুদ্ধ ক্যাডাররাই তাদের মূল ভরসা। তৃণমূল নেতারাও মুখে বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সকলকে নিয়ে চলার আদর্শই দলের মূল শক্তি। কাজে কিন্তু ততটা নয়। এসআইআর নিয়ে বিজেপি যতটা তীব্র একমুখী আদর্শগত প্রচার চালাচ্ছে, তার তুলনায় তৃণমূলের বেশ কিছু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। যেমন, কালিয়াচকে বিক্ষোভ নিয়ে মমতার মন্তব্য মালদহ-মুর্শিদাবাদে এসআইআরে ভুক্তভোগী মানুষের একাংশকে ক্ষুব্ধ করেছে। অনেকে মনে করছেন, এটা আদর্শগত অবস্থানে দৃঢ়তার অভাবের কারণেই।

ফলে তৃণমূলের রাশ দৃশ্যত, অনেকটাই চলে গেছে পরামর্শদাতাদের হাতে। যেন সরকারি পরিষেবার উপভোক্তা-ভিত্তিক মাইক্রো ম্যানেজমেন্টেই দলের ভরসা বেশি। রাজনীতি কি সংখ্যার দাস? না কি সংখ্যা রাজনীতির? এই বৃহত্তর প্রশ্নের উত্তরও কি ভবানীপুরে পাওয়া যাবে?

আই-প্যাক ঈশ্বর নয়। নিন্দকেরা বলেন, জিততে পারে, এমন ঘোড়ার ওপরই তারা বাজি ধরে। গাধা পিটিয়ে ঘোড়া তারা করতে পারে না। ঘোড়া যেন তার সক্ষমতার তুঙ্গে থাকে, সেটা নিশ্চিত করাই তাদের কাজ। শক্তিশালী শাসকদলে আত্মতুষ্টির প্রভাব পড়ে। সহজে জেতার অভ্যাস হয়ে গেলে সংগ্রামের তাগিদ চলে যায়। জনগণের ভাষায়, নেতাদের চর্বি বেড়ে যায়। কিন্তু মেশিনারিতে জং পড়ে গেলে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া সামলানো মুশকিল হতে পারে। তেল দিয়ে মরচে পরিষ্কার, জং সারানো ও পুরনো আগাছা উৎপাটন করাটাই আই-প্যাকের কাজ। পরিচর্যা না পেলে তো জেতার যোগ্য ঘোড়াও ঢিমে তালে ধুঁকতে পারে।

(শেষ)

I-Pac
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy