ঘটনা ১: ৩ মে দফায় দফায় টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় ধর্না। অভিযোগ, সকালে সহকারী পরিচালক গিল্ডের জনাকয়েক সদস্য এবং রাতে মেকআপ আর্টিস্ট গিল্ডের কিছু সদস্য বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের নিশানায় প্রোডাকশন গিল্ডের সভাপতি মহম্মদ হাসান, সম্পাদক নিরুপম দে-সহ কয়েকজন। ধর্নায় সভাপতিকে ‘জঙ্গি’, ‘হার্মাদ’ আখ্যা দেন বিক্ষুব্ধ সদস্যেরা। পাশাপাশি, নিজেদের পরিচয় দেন বিজেপি সমর্থক বলে!
ঘটনা ২: ৪ মে বিকেলে প্রতিবাদী সভার আয়োজন করেন প্রোডাকশন ম্যানেজার গিল্ডের সদস্যেরা। তাঁদের পাল্টা অভিযোগ, “ওঁরা ‘তৎকাল বিজেপি’। ওই দিনই বেলা ১২টার পর জামার রং, পতাকা বদলে, কপালে গেরুয়া তিলক কেটে দল বদলেছেন। গতকাল তাঁরা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে স্টুডিয়ো চত্বরে পা রেখেছেন। এঁরা আসলে স্বরূপ বিশ্বাসের লোক, সমাজবিরোধী। নানা কারণে একাধিক বার পুলিশ আটক করেছে এঁদের। ইন্ডাস্ট্রিতে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন এঁরা। বিভেদ আনার চেষ্টা করছেন আমাদের মধ্যে।” আগের দিন রাতেই তাঁরা স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
ঘটনা ৩: ২৮ মে এনটি১ স্টুডিয়োয় বহিরাগতদের হাতে মারধর খেয়ে গুরুতর আহত হন ম্যানেজার সনৎ চট্টোপাধ্যায়। প্রোডাকশন ম্যানেজার গিল্ডের পক্ষের অভিযোগ, বাইরে থেকে গুন্ডা আনিয়ে তাঁদের সহকর্মীর গায়ে হাত তোলা হয়েছে। তাও আবার স্টুডিয়ো চত্বরের ভিতরে।
পর পর তিনটি ঘটনা তাতিয়ে দিয়েছে গিল্ডের সদস্যদের। আনন্দবাজার ডট কম-কে গিল্ডের সম্পাদক এবং অন্যতম অভিযুক্ত নিরুপম দে বলেছেন, “একের পর এক ঘটনায় আমরা বিপর্যস্ত। থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার পরেও মার খেতে হল সদস্যকর্মীকে। আমরা এ বার আইনি পথে প্রতিবাদ জানাব।” সেই অনুযায়ী আলিপুর আদালতে মামলা দায়ের করেছেন গিল্ডের সদস্যেরা। নিরুপম জানিয়েছেন, আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শীঘ্রই আদালতে মামলা উঠবে।
রাজ্য রাজনীতির পালাবদলে ‘শান্ত’ হবে টলিউড। এমনই আশা ছিল ইন্ডাস্ট্রির সকলের। ঘটনার পরম্পরা কি আদৌ সেই দিকে যাচ্ছে? প্রশ্ন করা হয় ম্যানেজার গিল্ডের সম্পাদককে। তাঁর একাধিক অভিযোগ। সে প্রসঙ্গ তুলে নিরুপম বললেন, “নিত্য দিনের অশান্তিতে জেরবার। রোজই কিছু না কিছু ঘটছে। দোষারোপ, পাল্টা দোষারোপে আমরা ক্লান্ত।” সম্পাদক এবং সভাপতি আদতে প্রাক্তন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের লোক। আর্থিক তছরুপ, কাটমানি খাওয়ার পাশাপাশি নারীঘটিত কেলেঙ্কারির অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে। নিরুপমের কথায়, “২০১৮-য় আমরা দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে শিক্ষিত কলাকুশলীদের দায়িত্ব দিতে চেয়েছি। কার্ড দিয়েছি, যাতে প্রয়োজনে চিঠি লেখা, কম্পিউটারের কাজ তাঁরা করতে পারেন। ওঁদের চাহিদা, সবাইকে কার্ড দিতে হবে। একই সঙ্গে স্বরূপবাবুর ইশারায় ওঁরা কমিটির মাথা হয়ে বসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভোটে হেরে যাওয়ায় সেই স্বপ্নপূরণ হয়নি। এখন সরকার বদলাতেই ওঁরা চাইছেন, ‘ইলেকশন নয়, সিলেকশন ভোট’ হোক। ওঁরা গদি দখল করবেন।”
আরও পড়ুন:
প্রোডাকশন ম্যানেজার গিল্ড-এর উভয় সদস্যই জানান, ২০২২ থেকে দু’টি বিষয়ে তাঁরা ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপের বিরোধিতা করে আসছেন। এক, একনায়কতন্ত্র চলবে না। দুই, সদস্যদের উপার্জনের ৭. ৫ শতাংশ ফেডারেশনকে কেন দেওয়া হবে। তাঁরা আরও বলেন, “এ রকম বহু আর্থিক তছরুপ করেছেন স্বরূপবাবু। আমরা দফায় দফায় মেল পাঠিয়ে ওঁকে প্রশ্ন করেছি। ফেডারেশন সভাপতি উত্তর দিতে পারেননি।”
ম্যানেজার গিল্ডের সম্পাদক যোগ করেছেন, তাঁদেরও অভিযোগ বিস্তর। তাঁদের অভিযোগ সঞ্জয় গুহ, তাপস খাঁ, পূর্ণেন্দুশেখর মল্লিক, বাপি সান্যাল, সঞ্জীব বণিক, সুব্রত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। দাবি, কিছু ‘বহিরাগত’ সংগঠনের নিয়ম ভেঙে লেবার ইউনিয়ন কমিশনে ম্যানেজার গিল্ডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন। সেই মামলা গিল্ড জিতেছে। তবু অশান্তি থামেনি। ম্যানেজার গিল্ডের তরফে আরও অভিযোগ, ওই মামলায় হেরেও চুপ করে বসে থাকেনি বিরোধীপক্ষ। সমাজমাধ্যমে সভাপতি হাসান এবং সম্পাদক নিরুপমের বিরুদ্ধে নামবিহীন খোলা চিঠি লেখা হয়। নিজেদের সম্মান বাঁচাতে এর পরেই তাঁরা পুলিশ কোর্ট এবং সিভিল কোর্টে মোট ৩২ লক্ষ টাকার মানহানির মামলা করেন বলে জানিয়েছেন নিরুপম। জুলাইয়ে সেই মামলার শুনানি হওয়ার কথা। নিরুপমের আশা, ওই মামলাতেও জিতবে গিল্ড।